কীর্তনখোলায় ভয়াবহ ভাঙ্গন নদী গর্ভে বিলীন চরকাউয়ার ২০ প্রতিষ্ঠান

রুবেল খান॥ সদর উপজেলার চর কাউয়ার প্রান্তে আবারো শুরু হয়েছে কীর্তনখোলা নদীর ভয়াবহ ভাঙ্গন। বৃহস্পতিবার সকাল থেকে মাত্র কয়েক ঘন্টার ব্যবধানে নদী ভাঙ্গনে বিলীন হয়েছে চরকাউয়া বাজারের বসত বাড়ি সহ ২০টি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। এখানো হুমকির মধ্যে রয়েছে ইউনিয়ন পরিষদ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, মাদ্রাসা ও বাস টার্মিনাল সহ বহু স্থাপনা। এর ফলে ভাঙ্গন আতংকে নদী সংলগ্ন থেকে ঘর বাড়ি, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও মালামাল নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেয়া হচ্ছে।
এদিকে ভয়াবহ ভাঙ্গনের খবরে চর কাউয়ার নদী ভাঙ্গন এলাকা পরিদর্শন করেছেন বরিশালের নব নিযুক্ত জেলা প্রশাসক ড. গাজী মোঃ সাইফুজ্জামান এবং শীর্ষ স্থানীয় রাজনৈতিক নেতারা। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তার আশ্বাসও দিয়েছেন তারা। তবে ভাঙ্গন রোধে পানি উন্নয়ন বোর্ডের দ্রুত পদক্ষেপ না থাকায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন নদী ভাঙ্গনে ক্ষতিগ্রস্তরা।
কীর্তনখোলা নদী ভাঙ্গনে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ী আব্দুল হান্নান মিয়া পরিবর্তনকে জানান, চরকাউয়া বাজারের ফেরি ঘাটের পাশে তার একটি স্টেশনারী দোকান ছিলো। সকাল ৭টার দিকে খবর পান দোকানটি নদী ভাঙ্গনে বিলীন হয়ে গেছে। খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে এসে দেখি শুধু আমারটিই নয়, নদী থেকে দূরবর্তী যেসব দোকান এবং বসত ঘর ছিলো তাও মুহুর্তের মধ্যে নদী গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। এসব দোকান বা ঘর থেকে একটি কাঠের টুকরোও রক্ষা করতে পারেনি কেউ।
চরকাউয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মনিরুল ইসলাম ছবি পরিবর্তনকে জানান, গতকাল বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ৬টা থেকে ভাঙ্গন শুরু হয়। এতে মুহুর্তের মধ্যে চরকাউয়া বাজার সংলগ্ন ফেরি ঘাটের পন্টুন এবং আশ-পাশের দোকান ঘর ভাঙ্গনের তোড়ে নদীতে বিলীন হয়ে যায়। এতে ২টি বসত ঘর সহ ২০টি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান নদীতে বিলিন হয়ে গেছে। এর মধ্যে মুদী, স্টেশনারী, জ্বালানি তেল ও যন্ত্রাংশের দোকান ১৭টি। বাকি তিনটি বসত ঘর।
তিনি জানিয়েছেন ভাঙ্গনে ক্ষতিগ্রস্তরা হলো- রাজ্জাক মজুমদার, হায়দার মজুমদার, আ. হান্নান মিয়া, মো. সেলিম, মো. রিয়াজ, সুলতান মিয়া, মো. লাবু, ইদ্রিস আলী, মো. রাজীব হোসেন, আব্দুল কাসেম, মো. সাইফুল ইসলাম, কাওসার হোসেন, মো. নূরুজ্জামান, আইয়ুব আলী, আনোয়ার হোসেন, শাহিন হাওলাদার, নূরুল ইসলাম, তৈয়ব আলী হাওলাদার, মো. সামেদ আলী ও আ. রশীদ মিয়া।
সরেজমিনে দেখা গেছে, নদী ভাঙ্গনে শুধু মাত্র বসত ঘরই নয়, ভাঙ্গনে ফেরির এপ্রোস এবং গ্যাংওয়ে নদীর পানিতে তলিয়ে গেছে। সকাল থেকে শুরু হওয়া ভাঙ্গন অব্যাহত ছিলো দুপুর আড়াইটা পর্যন্ত। এরপর একটু কমলেও পরে নদীতে জোয়ার আসার সাথে সাথে পুনরায় ভাঙ্গন শুরু হয়। এছাড়াও ভাঙ্গন স্থান সংলগ্ন লঞ্চ ঘাট থেকে লঞ্চ এবং অন্যান্য নৌ যান চলাচল করায় ঢেউয়ের তোড়ে ভাঙ্গন আরো তীব্র হয়। যে কারনে ভাঙ্গন এলাকায় নদীর আশপাশ থেকে অর্ধ শতাধিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান যে যার মত করে ভেঙ্গে সরিয়ে নিয়েছে। এমনকি নদীর আশেপাশে থাকা বসত ঘরের মালামালও নিরাপদে সরিয়ে নিতে দেখা গেছে।
চরকাউয়া এলাকার নদী ভাঙ্গন এলাকার বাসিন্দা আব্দুল জব্বার জানান, এর আগেও বর্ষা মৌসুমে চরকাউয়া বাজার সংলগ্নে নদী ভাঙ্গন হয়েছে। তখনও মুহুর্তের মধ্যে নদী গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে বহু দোকান-পাট ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। এসময় পানি উন্নয়ন বোর্ড জরুরী ভিত্তিতে নদীতে বালুর বস্তা ফেলে ভাঙ্গন রোধের চেষ্টা করেছে। এমনকি স্থানীয় ভাবে চাঁদা তুলে ভাঙ্গন রক্ষার চেষ্টা করেন ভাঙ্গন কুলের মানুষেরা। কিন্তু তখনকার সময় পানি উন্নয়ন বোর্ড ভাঙ্গন রোধে দীর্ঘ মেয়াদি কোন ব্যবস্থা না নেয়ায় পূনরায় বৃহস্পতিবার থেকে ভাঙ্গন শুরু হয়েছে।
চরকাউয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মনিরুল ইসলাম ছবি জানান, নদী ভাঙ্গন এখনো অব্যাহত রয়েছে। এর ফলে ইউনিয়ন পরিষদ ভবন, পার্শ্ববর্তী মাদ্রাসা, মসজিদ, বাস টার্মিনালসহ অর্ধ শতাধিক দোকান ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এখনো হুমকির মধ্যে রয়েছে। তাই প্রয়োজন দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহন করা। অন্যথায় কীর্তনখোলা নদী ভাঙ্গনে চরকাউয়া ইউনিয়নের অস্তিত্ব ধরে রাখা সম্ভব হবে না।
এদিকে ভাঙ্গনের খবর পেয়ে সকাল সোয়া ১০টার দিকে চরকাউয়ার ভাঙ্গন এলাকা পরিদর্শনে যান বরিশাল জেলা প্রশাসক ড. গাজী মো. সাইফুজ্জামান। পরিদর্শন কালে তিনি সাংবাদিকদের জানান, চর কাউয়া সহ আশ-পাশের নদী ভাঙ্গনের বিষয়ে তিনি ইতোমধ্যে পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তাদের সাথে কথা বলেছেন। সেই সাথে পানি উন্নয়ন বোর্ডের গৃহিত ভাঙ্গন রোধে তিনটি প্রকল্পের কাজ দ্রুত শুরু এবং বাস্তবায়নের জন্য মন্ত্রনালয়ে চিঠি লিখেছেন। তাছাড়া আপাতত নদী ভাঙ্গনে ক্ষতিগ্রস্তদের আর্থিক সহায়তা এবং পূনর্বাসনের আশ্বাস দিয়েছেন তিনি।
অপরদিকে বিকেলে ভাঙ্গন এলাকা পরিদর্শন এবং ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তার আশ্বাস দিয়েছেন বরিশাল মহানগর বিএনপি’র সভাপতি এবং বরিশাল সদর আসনে একাধিকবার নির্বাচিত সাবেক এমপি এ্যাড. মজিবর রহমান সরোয়ার, বরিশাল মহানগর আওয়ামীলীগ নেতা ও আওয়ামী যুবলীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সদস্য সেরনিয়াবাত সাদিক আব্দুল্লাহ সহ বিভিন্ন স্তরের নেতা-কর্মীরা।
জানতে চাইলে পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. জহির উদ্দিন আহম্মেদ বলেন, ঘটনার পর আমরা ভাঙ্গন এলাকা পরিদর্শন করেছি। হিসাব অনুযায়ী গতকাল বৃহস্পতিবার ১২০ মিটার জায়গা ভেঙ্গে নদী গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে।
তিনি বলেন, ২০১৩ সাল থেকে এ পর্যন্ত আমরা কীর্তনখোলা নদী ভাঙ্গন থেকে চরকাউয়া এলাকা রক্ষায় একাধিক প্রকল্প গ্রহন করেছিলাম। কিন্তু কোনটির বরাদ্দই পাওয়া যায়নি। সর্বশেষ গতকাল ভাঙ্গনের বিষয়টিও লিখিত আকারে বিভিন্ন দপ্তরে জানানো হয়েছে। সেই সাথে ভাঙ্গন রোধে জিও ব্যাগ (বালুর বস্তা) ফেলে ভাঙ্গন প্রতিরোধে ৩০ লক্ষ টাকা বরাদ্দ চেয়েছেন। এটা পেলে কোন প্রকার সময় না নিয়ে দ্রুত কাজ করা হবে বলেও জানিয়েছেন তিনি।