কীর্তনখোলার ভয়াবহ ভাঙ্গন ॥ চরকাউয়া মাদ্রাসা সহ ২৫ ব্যবসা প্রতিষ্ঠান নদী গর্ভে

রুবেল খান ॥ কীর্তনখোলা নদীর ভয়াবহ ভাঙ্গনে নদী গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে একটি হাফিজি মাদ্রাসার ২টি একাডেমিক ভবন সহ প্রায় ২৫টি’র মত দোকান। গত রোববার নগরীর অদুরে সদর উপজেলার চর কাউয়া ইউনিয়নের চর কাউয়া বাজারে রাত সাড়ে ১১টার পর থেকে শুরু হওয়া ভাঙ্গন অব্যাহত রয়েছে। আর এ অব্যাহত ভাঙ্গনের ফলে পথে বসেছে শতাধিক পরিবার। শেষ সম্বল জমি এবং বেঁচে থাকার অনুপ্রেরণা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানটুকুও হারিয়ে নিঃস্ব প্রায় তারা। শুধু তাই নয়, অব্যাহত ভাঙ্গনের ফলে এখনো হুমকির মুখে রয়েছে ইউনিয়ন পরিষদ ভবন, একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়, মাদ্রাসা ও বাস টার্মিনাল ভবন সহ বহু স্থাপনা। তাই ভাঙ্গনের হাত থেকে রক্ষায় সরিয়ে নেয়া হচ্ছে ওইসব স্থাপনার মালামাল ও গাছপালা।
এদিকে নিজ নিজ উদ্যোগে শেষ সম্বল বাঁচাতে ভাঙ্গন কবলিত মানুষগুলো ছোটাছুটি করলেও স্থানীয় প্রশাসন ছাড়া ক্ষতিগ্রস্থদের পাশে এসে দাড়ায়নি স্থানীয় জনপ্রতিনিধি কিংবা রাজনৈতিক দলের নেতারা। বিশেষ করে নির্বাচন আসলেই মন ভুলানোর গল্প আর নানা ধরনের প্রতিশ্রুতির বানী শোনানো সেইসব জনপ্রতিনিধিরা খোঁজও নেননি বলে অভিযোগ করেছেন ক্ষতিগ্রস্থরা। তাদের মধ্যে কেউ গেছেন হজ্ব পালনে, আবার পারিবারিক ও ব্যবসায়ীক কাজে কেউ আছেন রাজধানী ঢাকায়। ফলে এ নিয়ে ভাঙ্গনে কবলিত মানুষের মাঝে চরম ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
তবে ক্ষতিগ্রস্থ এলাকা পরিদর্শন এবং ক্ষতিগ্রস্থদের খোঁজ খবর নিয়েছেন জেলা প্রশাসক আর পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা। আপদকালীন জরুরী সহায়তার অংশ হিসেবে ক্ষতিগ্রস্থদের তালিকা করে তাদের অর্থসহায়তা প্রদানের আশ্বাস দিয়েছেন জেলা প্রশাসক। পাশাপাশি ভাঙ্গন প্রতিরোধে সংশ্লিষ্ট এলাকার প্রায় ৯০ মিটার জুড়ে জিও ব্যাগ ফেলার কার্যক্রম গ্রহন করেছে পানি উন্নয়ন বোর্ড কর্তৃপক্ষ। উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুযায়ী খুব শিঘ্রই আপদকালীন জরুরী প্রটেকশন এর কাজ শুরু হবে বলে জানিয়েছেন পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আবু জাফর।
সরেজমিনে দেখাগেছে, নগরীর লঞ্চ ঘাটের অপর প্রান্তে সদর উপজেলার চরকাউয়া খেয়াঘাট সহ আশপাশের বিশাল অংশ নিয়ে হঠৎ শুরু হয়েছে কীর্তনখোলা নদীর ভাঙ্গন। ইতোমধ্যেই নদীগর্ভে হারিয়ে গেছে গুরুত্বপূর্ন স্থাপনা ও বিশাল আকারের গাছপালা। রাক্ষুসে কীর্তনখোলার করাল গ্রাসে শেষ সম্বল হারিয়ে পথে বসিয়ে দিয়েছে সংশ্লিষ্টদের। কারোর রুটি রুজির শেষ সম্বলটুকু ছিলো একটি টিনের দোকান ঘর। তাও গভীর রাতে হারিয়ে গেছে নদী গর্ভে। রক্ষা করা যায়নি কোন মালামাল। বিশেষ করে রোববার দিবাগত রাতে বৃষ্টি সহ দমকা হওয়া শুরু হওয়ার পর পরই নদীর ভাঙ্গন তীব্র থেকে আরো তীব্রতর হয়ে ওঠে। কিন্তু রাতভর ভাঙ্গনের ফলে সর্বস্ব হারিয়ে নিঃস্ব হওয়া মানুষগুলোর খোঁজ নিতে আসেনি কেউ। তবে শুধুমাত্র সরকারের পক্ষ হয়ে বরিশালের নবনিযুক্ত জেলা প্রশাসক, সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী এবং বন্দর থানার ওসি ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। সেই সাথে ক্ষতিগ্রস্থদের তালিকাও চেয়েছেন জেলা প্রশাসক মো. হাবিবুর রহমান।
নদী ভাঙ্গনে ক্ষতিগ্রস্থ চরকাউয়া আহমদিয়া ফাজিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ একেএম ফারুক খান বলেন, রোববার রাত সাড়ে ১১টার দিকে হঠাৎ করেই ভাঙ্গন শুরু হয়। তবে এর তীব্রতা বেড়ে যায় শেষ রাতের দিকে। অবশ্য দীর্ঘ দিন থেকেই চর কাউয়ার এই পয়েন্টে ভাঙ্গন চলে আসছিলো। মাঝখানে বছর খানেক ভাঙ্গন বন্ধ ছিলা। তাও পুরোপুরি ভাবে নয়।
তিনি বলেন, রাতে ভাঙ্গন শুরুর পর থেকে ভোর রাত ৫টার মধ্যে তাদের চরকাউয়া আহমদিয়া ফাজিল মাদ্রাসার দুটি টিন সেড একাডেমিক ভবন, একটি লিল্লাহ বোর্ডিং এবং জৈনপুরী হুজুরের একটি খানকা নদী গভে বিলিন হয়ে গেছে। এর পাশাপাশি মাদ্রাসার প্রায় ৫০ হাজার টাকা মূল্যের বিভিন্ন প্রজাতির বড় বড় গাছও ভাঙ্গনে নদীগর্ভে হারিয়ে গেছে। এখনো ভাঙ্গনের কবলে রয়েছে বহু স্থাপনা। যার মধ্যে রয়েছে চরকাউয়া তোফায়েল আহমেদ মাধ্যমিক বিদ্যালয়, চরকাউয়া ইউনিয়ন পরিষদ, ফাজিল মাদ্রাসার মুল ভবন, বাস মালিক সমিতি ভবন এবং বাজারের বহু ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে ভাঙ্গন স্থলের কয়েক ফুট দূরত্বে রয়েছে আহমদিয়া ফাজিল মাদ্রাসা এবং ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয়টি। ভাঙ্গন অব্যাহত থাকলে তাও মুহুর্তের মধ্যে কীর্তনখোলা নদীর গর্ভে বিলিন হয়ে যাবে বলে জানান এলাকার ক্ষতিগ্রস্থ ব্যবসায়ীরা।
অপরদিকে নদী ভাঙ্গনে ক্ষতিগ্রস্থ চর কাউয়া বাজারের ব্যবসায়ী হাবিল, বাদল খলিফা, আমানত, কাওসার, সহিদ, শামীম, রাসেল, রাহাত বলেন, তাদের সহ আরো অন্যান্যদের ২৫টি দোকান ঘর নদী গর্ভে বিলিন হয়ে গেছে। এর মধ্যে রয়েছে পোল্ট্রি ফার্ম, খাবার হোটেল, মুদী ও স্টেশনারী দোকান এবং মাছের আড়ত।
ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করেন, দীর্ঘ দিন ধরেই চর কাউয়ার এই পয়েন্টে নদী ভাঙ্গন অব্যাহত রয়েছে। গত কয়েক বছর ধরেই এখানে স্থায়ী প্রটেকশনের ব্যবস্থা গ্রহনের জন্য তারা দাবী জানিয়ে আসছেন। কিন্তু পানি উন্নয়ন বোর্ড কর্তৃপক্ষ গুরুত্ব দিচ্ছেন না। শুধুমাত্র ভাঙ্গন দেখা দিলেই তারা জরুরী প্রটেকশন কার্যক্রমের অংশ হিসেবে কিছু জিও ব্যাগ ফেলে আবার নীরব হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু এতে ভাঙ্গন প্রতিরোধ হচ্ছে না।
তারা আরো অভিযোগ করেন, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা এবং জনপ্রতিনিধিরা আছেন। যারা নির্বাচন আসলেই নানা আশ্বাসের বাণী নিয়ে আসেন। কিন্তু বিপদের সময়ে কেউ খোঁজ নেয় না। স্থানীয় এমপি কিংবা উপজেলা চেয়ারম্যান কেউ ভাঙ্গন প্রতিরোধ কিংবা ক্ষতিগ্রস্থদের দুঃখ দুর্দশার কথা ভেবেও দেখছেন না।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বরিশাল সদর-৫ আসনের সংসদ সদস্য জেবুন্নেছা আফরোজ রয়েছেন রাজধানীতে। বরিশাল তার সংসদীয় এলাকা হলেও বেশিরভাগ সময় কাটে তার রাজধানীতে। কোন অনুষ্ঠান ছাড়া তার দেখা মেলে না নির্বাচনী এলাকায়। এর পরে যিনি রয়েছেন তিনি হলেন সদর উপজেলা চেয়ারম্যান সাইদুর রহমান রিন্টু। তিনিও বরিশালে নেই। হজ্ব পালনের জন্য তিনি দেশ ত্যাগ করেছেন। যে কারনে তার সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও পাওয়া যানি। চরকাউয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মনিরুল ইসলাম ছবি জানিয়েছেন বিশেষ কাজে তিনি ঢাকায় আছেন।
এদিকে নদী ভাঙ্গন প্রতিরোধের বিষয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আবু জাফর বলেন, নদী ভাঙ্গনের খবর পেয়ে আমি সহ অন্যান্য কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছি। ওই স্থানে প্রায় ৯০ মিটার জুড়ে নদী ভাঙ্গন হচ্ছে। নদী ভাঙ্গন রোধে জরুরী প্রটেকশনের জন্য ওই স্থানে জিও ব্যাগ ফেলার কার্যক্রম গ্রহন করা হয়েছে। ইতোমধ্যেই বিষয়টি ঢাকায় উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানানো হয়েছে। তাদের নির্দেশনা অনুযাযী জিও ব্যাগ ফেলার কাজ শুরু হবে।
তিনি আরো বলেন, গত দুই বছর পূর্বে ওই এলাকায় ভাঙ্গন শুরু হয়েছিলো। তখনও সেখানে জিও ব্যাগ ফেলা হয়। তখন যেখানে জিও ব্যাগ ফেলা হয়েছে সেখানে এবার ভাঙ্গছে না। বরং তার পাশে নতুন করে ভাঙ্গন শুরু হয়েছে। যতদুর জানাগেছে, যেখানে ভাঙ্গন শুরু হয়েছে ওই স্থানটিতে একসময় পুকুর ছিলো। তা বালু দিয়ে ভরাট করা হয়। বর্ষ মৌসুমে নদীতে পানি এবং ¯্রােত বেশি থাকে। যে কারনে ভরাট হওয়া বালু পানির সাথে ধুয়ে যাওয়ায় ভাঙ্গন সৃষ্টি হচ্ছে। ভাঙ্গন রোধে আপাতত জরুরী প্রটেকশন হিসেবে জিও ব্যাগ ফেলার কার্যক্রম ছাড়াও অনেক আগেই চরকাউয়ার ও এলাকায় এক কিলোমিটার জুড়ে সিসি ব্লক ফেলার প্রকল্প গ্রহন করা হয়েছে। যা অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। তাছাড়া জরুরী ভিত্তিতে ভাঙ্গন রক্ষায় যতটুকু সম্ভব চেষ্টা করবেন বলেও জানিয়েছেন পাউবোর ওই কর্মকর্তা।
এদিকে বিকালে ঘটনাস্থল পরিদর্শনে গিয়ে ক্ষতিগ্রস্থদের তালিকা জমা দেয়ার জন্য বলেছেন জেলা প্রশাসক মো. হাবিবুর রহমান। তিনি পরিবর্তনকে জানান, আপদকালীন সংযোগিতার অংশ হিসেবে আংশিক ক্ষতিগ্রস্থদের জরুরী ভিত্তিতে পাঁচ হাজার টাকা করে অর্থ সহায়তা প্রদানের বিধান রয়েছে। কিন্তু আমাদের কাছে যা আছে তাতে করে পাঁচ হাজার টাকা করে দেয়া সম্ভব হচ্ছে না। তাই যা আছে তা সমন্বয় করে আংশিক ক্ষতিগ্রস্থদের দেয়া হবে।
তাছাড়া যারা বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছেন তাদের তালিকা এবং ক্ষতির পরিমান উল্লেখ করে মন্ত্রনালয়ে চিঠি প্রেরন করা হবে। পরে মন্ত্রনালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী ক্ষতিগ্রস্থদের সহায়তা কিংবা পুর্নবাসনের কাজ করা হবে। পাশাপাশি নদী ভাঙ্গন প্রতিরোধে জরুরী ভিত্তিতে ভাঙ্গন এলাকায় জিও ব্যাগ ফেলার জন্য প্রয়োজনীয় কার্যক্রম গ্রহনের জন্য পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলীর সাথে কথা বলেছেন বলেও জানিয়েছেন জেলা প্রশাসক।