কীর্তনখোলার নদীতে নিঃস্ব চরবাড়িয়াবাসী হুমকির মুখে বরিশাল-ভোলার বিদ্যুত টাওয়ার

সাইদ মেনন ॥ বালু উত্তোলনকারী দস্যুদের কারনে কীর্তনখোলা নদীর ভয়বাহ ভাঙ্গনের কবলে পড়ে নিঃস্ব হচ্ছে চরবাড়িয়া ইউপির ৫ গ্রামবাসী। দারিদ্রতার কষাঘাতে জর্জরিত ওই ৫ গ্রামের সিংহভাগ বাসিন্দাদের পথে নামার উপক্রম হয়েছে। ঘুর্ণিঝড় কোমেনের প্রভাবে গত কয়েকদিনের বৃষ্টিতে নদীর পানি বৃদ্ধি ও তীব্র ¯্রােতের কারনে শুধু কৃষি জমি নয়, বাড়ী, ঘর ও বাগান বিলীন হয়ে গেছে। এমনকি তিন গ্রামের বাসিন্দাদের একমাত্র সড়ক ভেঙ্গে গেছে। এতে কীর্তনখোলার সাথে তালতলী নদীর (পূর্বের নাম ফুলতলা নদী) সংযুক্ত হয়ে গেছে। দুই নদীর মিলনে চরবাড়িয়াবাসীর বেচে থাকার অবলম্বন চর হারিয়ে যাওয়ার শংকা দানা বেধেছে। দুই নদীর মিলন ঠেকাতে না পারলে চর পানিতে ডুবে যাবে। এতে ওই চরে ঘর বাধা ও চাষ করে ফসল উৎপাদন করে খেয়ে বাচার স্বপ্ন হারিয়ে চরবাড়িয়াবাসীর পথে নেমে পড়া ছাড়া কোন উপায় থাকবে না বলে মন্তব্য করেছেন বাসিন্দা শহীদ হাওলাদার।
তিনি জানান, ভাঙ্গন শুধু ওইসব গ্রামের বাসিন্দাদের বিপদে ফেলেনি। হুমকির মুখে পড়েছে ভোলা থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের সংযোগ।
সরোজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, ইউপির ৭ নং ওয়ার্ডের হাওলাদার বাড়ির পাশের জাতীয় গ্রীড সংযোগ ক্যাবলের টাওয়ার থেকে হাত বিশেক দূরে রয়েছে ভাঙ্গন।
স্থানীয় বাসিন্দা জিয়াউর রহমান জিয়া জানান, যেভাবে ভাঙ্গন হচ্ছে। তাতে অল্প সময়ের মধ্যে টাওয়ার ভেঙ্গে নদীর মধ্যে বিলীন হবে। এতে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নেয়া সংযোগ পুরোপুরি বিপর্যস্ত হয়ে পড়বে। বিচ্ছন্ন হয়ে পড়বে ভোলা থেকে জাতীয় গ্রীডে সরবরাহ।
তিনি বলেন, বিদ্যুৎ বিভাগ ও পানি উন্নয়ন বোর্ড যদি দুই একদিনের মধ্যে কার্যকরী পদক্ষেপ না নেয়, তাহলে মূল্যবান ও কয়েক মাস ধরে করা টাওয়ার নদী গর্ভে গিয়ে সরকারী অর্থ গচ্ছা দেওয়া ছাড়াও দেশের সম্পদ ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
স্থানীয় অপর বাসিন্দা স্বায়ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠানের চাকুরে মো. ইউনুস চাপরাশি বলেন, এখন পর্যন্ত কীর্তনখোলা নদীর ভাঙ্গনে ৬ বার ঘর সরিয়ে নিয়েছেন। নদীতে তার বাড়ী, বাগান ও কৃষি জমি বিলীন হয়েছে। বর্তমানে মাথা গোজার ঠাই নেই বললেই চলে। তিনি পরিবার নিয়ে অপরের জমিতে ছাউনী উঠিয়ে বাস করছেন।
এভাবে কয়েকশ পরিবার ভাঙ্গনে সব হারিয়ে নিঃশ্ব হয়েছেন। স্থানীয় বাসিন্দা শহীদ বলেন, এখানে অনেক পরিবার গৃহহীন হয়ে পড়েছে। তাদের অনেকের নতুন করে জমি কিনে ঘর করার সামর্থ্য নেই। তাই তারা বাধ্য হয়ে অন্যত্র গিয়ে ভাড়া বাসায় বাস করছেন। কৃষক বাধ্য হয়ে দিন মজুরসহ নানা পেশায় কাজ করছে।
কীর্তনখোলা ভাঙ্গন চরবাড়িয়া ইউপির চরআবদানী, চর উলালঘুনী, রাঢ়ী মহল, মধ্য চরবাড়িয়া, লামছরি গ্রামের বাসিন্দাদের সুখ শান্তি কেড়ে নিয়েছে। লামছড়ির কাছারিবাড়িতে হওয়া ঘোর দৌড়, শীত মৌসুমে হওয়া জারীগান ও যাত্রা পালার আসর এখন আর হয় না। কারন সব হারিয়ে সকলে এখন বেচে থাকার সংগ্রামে জড়িয়ে পড়েছে।
শহীদ জানান, কীর্তনখোলা নদীর সাথে তালতলী নদীর সংযোগ হয়েছে। এখন পানি পুরোদমে আসা যাওয়া শুরু করলে তালতলী নদী মরে জেগে উঠা চর ডুবে যাবে। এতে আর বেচে থাকার কোন উপায় থাকবে না। চরবাড়িয়া ইউপির অস্তিত্ব নদীতে থাকবে।
তিনি জানান, রাতের আধারে নদীর অপর তীর এলাকা থেকে ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলন করা হয়। এছাড়াও চরউলালঘুনী এলাকার অংশ থেকেও নিয়মিত বালু উত্তোলন করে ক্ষমতাসীন দলের সুবিধাবাদী নেতারা। এই কারনে ভাঙ্গনের ভয়াবহতা কয়েকগুন বাড়ছে।
স্থানীয় বাসিন্দা লাল মিয়া জানান, কীর্তনখোলার ভাঙ্গনে ভেদী ও সরদার বাড়ীর স্থান থেকে যোগাযোগের একমাত্র ভেরী বাধের সড়ক ভেঙ্গে গেছে। এতে ইউপির ৭,৮ ও ৯ নং ওয়ার্ডের সড়ক পথের যোগাযোগ সম্পূর্ন বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। এই জন্য এক সপ্তাহ ধরে ইউপির ৮ ও ৯ নং ওয়ার্ডের বাসিন্দারা রাস্তার এ প্রান্ত থেকে অপর প্রান্তে ট্রলারে পার হচ্ছে।
যাত্রীদের কাছ থেকে নেয়া ভাড়া দিয়ে স্থানীয়দের স্বেচ্ছাশ্রমে রাস্তা তৈরি করতে বস্তাভর্তি বালু ফেলা হচ্ছে। জনপ্রতিনিধি, সরকারী দপ্তরের প্রধানরা এসে শুধু আশ্বাস দেয়। ভাঙ্গন প্রতিরোধে বরাদ্ধ হয়েছে। তা শোনা ও আশ্বাস পাওয়া পর্যন্ত সীমাবদ্ধ থাকছে, বাস্তবে এখনও দেখা মিলছে না। জরুরী ভিত্তিতে ভাঙ্গন প্রতিরোধে ব্যবস্থা নেয়ার দাবি শুধু তার একার নয়, হাজার গ্রামবাসীর।
বরিশাল চরবাড়িয়ার ইউপি চেয়ারম্যান জিয়াউল ইসলাম সাবু জানান, ভাঙ্গন কবলিতদের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কোন প্রকার সহযোগিতা দেয়া হয়নি। ভাঙ্গন প্রতিরোধে কোন ব্যবস্থাও নেয়া হচ্ছে না।
পানি উন্নয়ন বোর্ড বরিশাল এর নির্বাহী প্রকৌশলী জহির উদ্দিন আহম্মেদ জানান, বরাদ্দ না থাকায় কোন ব্যবস্থা নেয়া সম্ভব হচ্ছে না। বরাদ্দ চেয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে।