কামারুজ্জামানের ফাঁসি কার্যকর

বিডিনিউজ/ রাইজিংবিডি/ দ্যা রিপোর্ট ॥ মুক্তিযুদ্ধকালে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে মৃত্যুদ-প্রাপ্ত জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মুহাম্মদ কামারুজ্জামানের ফাঁসি কার্যকর করা হয়েছে। গতকাল শনিবার রাত ১০টা ১ মিনিটে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে তার মৃত্যুদ- কার্যকর করা হয় বলে কারা সূত্র নিশ্চিত করেছে। এর আগে, দুপুরে তাকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্বাহী আদেশের কপি পড়ে শোনান ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার ফরমান আলী। এ সময় কামারুজ্জামানকে সিনিয়র জেল সুপার বলেন, ‘আপনার প্রাণভিক্ষা চাওয়ার সময় শেষ হয়ে গেছে। কপি পড়ে শোনানোর আগে পর্যন্ত সময় ছিল। এখন আর নেই। আপনার পরিবারের সদস্যরা আসছেন। তাদের কাছে শেষ বিদায় নিন।’
বিচারিক প্রক্রিয়ার শেষ ধাপে গত ৬ এপ্রিল রায় পুনর্বিবেচনার আবেদনও খারিজ হয়ে গেলে কামারুজ্জামানের সামনে কেবল অপারাধ স্বীকার করে প্রাণভিক্ষা চাওয়ার সুযোগ বাকি থাকে। এই জামায়াত নেতা তা না চাওয়ায় শুক্রবার সন্ধ্যায় নাজিম উদ্দিন রোডে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে শুরু হয় ফাঁসির মঞ্চ তৈরির তোড়জোড়। মঞ্চের জন্য অন্তত আটটি বাঁশ, বড় আকারের তিনটি কার্টন, ত্রিপল নেওয়ার পর দ- কার্যকরের আলোচনা চললেও শেষ পর্যন্ত ঘটনাপ্রবাহ শনিবার পর্যন্ত গড়ায়।
জামায়াতের আরেক সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল কাদের মোল্লার ক্ষেত্রে রিভিউ খারিজের দিনই দ- কার্যকর হয়েছিল। সেই হিসাবে কামরুজ্জামান ছয় দিন বেশি সময় পেয়েছেন।
একাত্তর সালের ২৫ জুলাই ভোরে সোহাগপুর গ্রামের ১২০ জন পুরুষকে হত্যা করা হয়; ধর্ষণের শিকার হন গ্রামের নারীরা। এক গ্রামে একসঙ্গে এতজন পুরুষ নিহত হওয়ায় গ্রামের অধিকাংশ নারীকে অকালে বৈধব্য নিতে হয়েছিল বলে সোহাগপুরের নাম হয়ে যায় ‘বিধবাদের গ্রাম’।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ২০১৩ সালের ৯ মে দেওয়া রায়ে যে দুটি অপরাধে কামারুজ্জামানকে মৃত্যুদ- দিয়েছিল, তার মধ্যে একটি ছিল সোহাগপুরের এই গণহত্যা। ট্রাইব্যুনালের ওই রায়ের বিরুদ্ধে কামারুজ্জামান আপিল করলে সর্বোচ্চ আদালতের বিচারে একটি অপরাধে সাজা কমে যাবজ্জীবনে নামলেও সোহাগপুরের গণহত্যার জন্য মৃত্যুদ-ই বহাল থাকে।
১৯৫২ সালের ৪ জুলাই শেরপুর জেলার বাজিতখিলা ইউনিয়নের মুদিপাড়া গ্রামে কামারুজ্জামান জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবার নাম ইনসান আলী সরকার। মুহাম্মদ কামারুজ্জামান কুমরী কালিতলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়াশুনার পর শেরপুর জিকেএম ইন্সটিটিউশনে ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হন। ১৯৬৭ সালে জিকেএম ইন্সটিটিউশন থেকে এসএসসি পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হন। ১৯৬৭-৬৯ সেশনে জামালপুর আশেক মাহমুদ কলেজে উচ্চ মাধ্যমিক শ্রেণিতে অধ্যয়ন করেন। ১৯৭৩ (১৯৭৪ সালে অনুষ্ঠিত) সালে ঢাকা আইডিয়াল কলেজ থেকে বিএ পাস করেন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে মাস্টার্সে ভর্তি হন। তিনি ১৯৭৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগ হতে এমএ পাস করেন।
মুহাম্মদ কামারুজ্জামান ১৯৮০ সালে বাংলা মাসিক ‘ঢাকা ডাইজেস্ট’ পত্রিকার নির্বাহী সম্পাদক হিসেবে কাজ শুরু করেন। ১৯৮১ সালে তাকে সাপ্তাহিক ‘সোনার বাংলা’ পত্রিকার সম্পাদকের দায়িত্ব প্রদান করা হয়। গ্রেফতারের আগ পর্যন্ত তিনি এই দায়িত্ব পালন করেছেন। মুহাম্মদ কামারুজ্জামান ১৯৮৩ সাল থেকে ১৯৯৩ সাল পর্যন্ত দশ বছর দৈনিক সংগ্রামের নির্বাহী সম্পাদকের দায়িত্বও পালন করেন। তিনি জাতীয় প্রেসক্লাবের এবং ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সদস্য ছিলেন। ১৯৮৫-৮৬ সাল পর্যন্ত তিনি ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের কার্যনির্বাহী পরিষদের নির্বাচিত সদস্য ছিলেন। পরে ২০১৩ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে আন্দোলনরত গণজাগরণ মঞ্চের দাবির প্রেক্ষিতে কামারুজ্জামান ও কাদের মোল্লার প্রেসক্লাবের সদস্য পদ বাতিল করা হয়। কামারুজ্জামানের স্ত্রীর নাম নূরুন্নাহার। কামারুজ্জামানের পাঁচ ছেলে ও এক মেয়ে রয়েছে। ছেলেরা হলেন- হাসান ইকবাল, হাসান ইকরাম, হাসান জামান, হাসান ইমাম এবং আহমেদ হাসান। আর মেয়ে সবার ছোট আতিয়া নূর। প্রথম তিন ছেলে বিয়ে করেছেন। দুই ছেলে দেশের বাইরে। হাসান ইকরাম সুইডেনে হিউম্যান রাইটস-এর ওপর পড়াশোনা করছেন। আর হাসান জামান টেলিকমিউনিকেশনের ওপর পড়াশোনা শেষ করে মালয়েশিয়াতেই চাকরি করছেন। বড় ছেলে হাসান ইকবাল বন্ধ হয়ে যাওয়া দিগন্ত টেলিভিশনের রিসার্চ ডাইরেক্টর পদে কর্মরত ছিলেন। দেশে থাকা আরো দুই ছেলে হাসান ইমাম এবং আহমেদ হাসান চাকরি করেন। কামারুজ্জামানের মেয়ে আতিয়া নূর মনিপুর স্কুলের ৮ম শ্রেণির ছাত্রী। স্ত্রী নূরুন্নাহার লেখালেখি করেন। কামারুজ্জামানের স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের মধ্যে ঢাকার মিরপুরে সাংবাদিক আবাসিক পল্লীতে একটি ছয়তলা বাড়ি, শেরপুর শহরে একটি বাড়ি, শেরপুর ও গাজীপুরে জমি এবং কামারুজ্জামানের উত্তরাধিকার সূত্রে শেরপুরের গ্রামের বাড়িতে পাওয়া জমি ও বাড়ি রয়েছে।