কসাই ডাক্তার হারুনের অপচিকিৎসায় ফের রোগীর মৃত্যু

নিজস্ব প্রতিবেদক ॥ নগরীর বহুল আলোচিত ও সমালোচিত কসাই ডাক্তার হারুন অর রশিদ অস্ত্রপচারের নামে হত্যা করলো আরো এক গৃহবধূকে। গতকাল বৃহস্পতিবার বরিশাল নগরীর বান্দ রোডের সেবা ক্লিনিক এন্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারে হেনারা বেগম (৪৫) নামের রোগীর অপচিকিৎসায় মৃত্যু হয় বলে অভিযোগ করেছেন স্বজনরা। মৃত হেনারা ঝালকাঠীর নলছিটির চরকয়া এলাকার এনায়েত সিকদারের স্ত্রী।

হেনারার ছোট বোন কুলসুম বেগম জানান, এক বছর পূর্বে হেনারা বেগম এর নাকে পলিপাস সমস্যা ধরা পড়ে। পরবর্তীতে স্থানীয় এক চিকিৎসক তার নাকে অস্ত্রপচারের পরামর্শ দেন। কিন্তু ভয়ে সে অস্ত্রপচার না করিয়ে হমিওপ্যাথী ওষুধ সেবন করেন। কিন্তু এতে সমস্যা সমাধান না হওয়ায় গত রবিবার তাকে বরিশাল শেবাচিম হাসপাতালের ইএনটি বহিঃবিভাগের নিয়ে আসা হলে চিকিৎসক তাকে হাসপাতালে ভর্তির পরামর্শ দেন।

কিন্তু তাকে হাসপাতালে ভর্তি না করে কোন এক আত্মিয়’র পরামর্শে গত বুধবার হেনারাকে নগরীর পুলিশ লাইনের সামনে নলছিটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের অবসরপ্রাপ্ত নাক-কান-গলা বিভাগের চিকিৎসক হারুন অর রশিদের বাড়ি কাম ক্লিনিকে নিয়ে যাওয়া হয়। এসময় নগরীর বহু রোগীর মৃত্যুর ঘটনার খলনায়ক কসাই খ্যাত ডা. হারুন অর রশিদ হেনারার গুরুতর এবং জটিল সমস্যার কথা বলে ভয় ভিতি দেখায়। এমনকি দ্রুত দুটি অপারেশন এক সঙ্গে করতে হবে বলে তাকে পুলিশ লাইনের সামনে হারুন তার নিজ অবৈধ ক্লিনিকে ভর্তি করেন।

এর প্রেক্ষিতে ডা. হারুন রোগীর স্বজনদের সঙ্গে দুটি অপারেশনের জন্য ২০ হাজার টাকায় চুক্তিবদ্ধ হয়ে গতকাল বৃহস্পতিবার নগরীর বান্দ রোডের সেবা ক্লিনিক এন্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারে অস্ত্রপচার করে। অস্ত্রপচার শেষে তাকে শয্যায় রাখা মাত্র মৃত ঘোষণা করেন তিনি।

কসাই ডাক্তার হারুনের অপচিকিৎসায় হেনারার মৃত্যু হয়েছে দাবী জানিয়ে তার বোন কুলসুম বলেন, বেলা ১১টার দিকে সেবা ক্লিনিক এন্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারে অস্ত্রপচার শুরু করেন ডা. হারুন। মাত্র ১৫ মিনিটের মধ্যে তার নাকের পলিপাস সহ দুটি অপারেশন সম্পন্ন করে ডা. হারুন।

অপারেশনের বর্ণনা দিয়ে কুলসুম বেগম আরো বলেন, কোন প্রকার কাটা-চেড়া ছাড়াই বড় একটি অস্ত্রপচারের চাকু নাকের ভেতর ঢুকিয়ে দেয়। তখন থেকেই তার নাক থেকে অনবরত রক্ত ঝড়তে থাকে। চাকুর আঘাতে মস্তিস্কের সঙ্গে সংযুক্ত কোন এক গুরুত্বপূর্ণ রগ ছিড়ে রক্তক্ষরণ এবং রোগীর অপারেশন টেবিলেই মৃত্যু হয়েছে বলে অভিযোগ তার।

এদিকে বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, পালিপাস সব থেকে সহজ অস্ত্রপচার। মাত্র আধা ঘন্টা সময়ের মধ্যেই এটা করা সম্ভব। তাছাড়া নাক-কান-গলা এবং মস্তিস্কের যুক্ত স্থানে বড় ধরনের আঘাত ছাড়া ব্যাপক হারে রক্ত ক্ষরণ হয় না। বিশেষ করে অস্ত্রপচারের সময় মস্তিস্কের বিশেষ কোন রগ ছিড়ে গেলে রোগীর মৃত্যু হওয়ার সম্ভাবনা থেকে যায় বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা।

তবে অস্ত্রপচারের নামে একাধিক রোগী হত্যাকারী ডা. হারুন অর রশিদ এর সঙ্গে আলাপকালে তিনি তার চিকিৎসা অবহেলায় রোগীর মৃত্যুর অভিযোগ বরাবরের মতই এড়িয়ে যান। বলেন, আমার ভুলে রোগী মারা যায়নি। এনেসথেসিয়া চিকিৎসকের দায়িত্ব রোগীকে অচেতন ও জ্ঞান ফিরিয়ে আনার। রোগীর মৃত্যুর জন্য এনেসথেসিয়া চিকিৎসকের ভুল থাকতে পারে বলে দাবী তার। তবে নাক-কান এবং মুখ থেকে অনবরত রক্তক্ষরনের সঙ্গে এনেসথেসিয়ার সম্পর্ক কতটুকু এমন প্রশ্ন করা হলে ডা. হারুন অর রশিদ বিষয়টি এড়িয়ে গিয়ে বলেন, ভাই আপনে আমার সাথে দেখা করেন। এ বিষয়ে সাক্ষাতে কথা হবে।

এদিকে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শুধু হেনারা বেগমই নয়, ইতিপূর্বে কসাই হারুন অস্ত্রপচারের নামে প্রায় ১৫ জনের মত রোগীকে হত্যা করেছে। বড় কোন অস্ত্রপচার নয়, গলায় টনসিল টিউমার এবং নাকের পলিপাসের মত ছোট অপারেশন করতে গিয়েই রোগীদের জমের দুয়ারে পৌছে দেন কসাই হারুন। টনসিল অপারেশন করতে গিয়ে ভোলার এক যুবককে গলা কেটে হত্যা, অপর এক প্রসুতী নারীকেও একই ভাবে হত্যা করে সে। এছাড়াও টনসিল অপারেশন করতে গিয়ে ১০ বছর বয়সি এক শিশুকেও হত্যা করে পালিয়ে যায় ডা. হারুন। শুধু এসব ঘটনাই নয়। এরকম আরো একাধিক ঘটনার নজির সৃষ্টি করেছেন কসাই ডাক্তার হারুন।

অপর দিকে অস্ত্রপচারের নামে একের পর এক রোগী হত্যার কারণে গত বছরের ১ সেপ্টেম্বর ডা. হারুনকে র‌্যাব আটক করে তাদের কার্যালয়ে নিয়ে যায়। আর কোনদিন রোগীর অপারেশন করবে না মর্মে মুচলেকা দিয়ে মুক্তি পান তিনি। কিন্তু কিছুদিন না যেতেই ডা. হারুন অর রশিদ পুনরায় প্রাইভেট প্রাকটিসের পাশাপাশি অস্ত্রপচার কার্যক্রম শুরু করেন তিনি। প্রথমত তিনি গোপনীয়তা রক্ষা করে নগরীর বাংলাবাজার পলি ক্লিনিকে রোগীর অস্ত্রপচার করতেন। কিন্তু সেখানে বেশিদিন স্থায়িত্ব হয়নি তার। পলিক্লিনিক থেকে তাকে বিতারিত করা হয়।

এরপর পুলিশ লাইনে নিজ বাড়ির নিচ তলার অবৈধ ক্লিনিকে রোগী ভর্তি এবং অপারেশন কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছিলো। সর্বশেষ তিনি নগরীর বান্দ রোডে প্লানেট পার্ক সংলগ্ন স্বেচ্ছাসেবক লীগ মহানগর শাখার আহ্বায়ক আজিজুর রহমান শাহিনের মালিকানাধীন সেবা ক্লিনিক এন্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারে কসাই খানা খুলে বসেন কসাই হারুন। সেখানে মাত্র ২’শ টাকার বিনিময়ে অপারেশন থিয়েটার ভাড়া নিয়ে অপারেশনের নামে রোগী হত্যায় মেতে ওঠে কসাই হারুন। এরপরেও সেবা ক্লিনিকের মালিক পক্ষ অর্থ লোভে কসাই হারুনের লাগাম টেনে দেয়নি। যে কারণে কসাই হারুনের কসাই খানায় প্রাণ দিতে হলো হেনারাকে। এমনটিই অভিযোগ করেছেন নিহত হেনারার স্বজন সহ সচেতন মহল।

এ প্রসঙ্গে সেবা ক্লিনিক এন্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মালিক স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা আজিজুর রহমান শাহীন বলেন, এটা আমার ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। যে কোন চিকিৎসক একশ টাকায় শয্যা এবং ২’শ টাকায় অপারেশন থিয়েটার ভাড়া নিয়ে অস্ত্রপচার করতে পারেন। কিন্তু এতে রোগীর মৃত্যু হলে সে দায়ভার মালিক পক্ষ নিবে না। ইতিপূর্বে রোগী হত্যার একাধিক ঘটনা সৃষ্টিকারী ডা. হারুনকে সেবা ক্লিনিকে অস্ত্রপচারের সুযোগ দেয়ার বিষয়টি জানতে চাইলে আজিজুর রহমান শাহীন বলেন, পেপার পত্রিকার মাধ্যমে ডা. হারুনের রোগী হত্যার বিষয়টি জেনেছি। কিন্তু বিষয়টি ততটা গুরুত্ব দেননি বলেও উক্তি করেন তিনি।

এ প্রসঙ্গে কোতয়ালী মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) শাহ মোহাম্মদ আওলাদ বলেন, রোগী মৃত্যুর কথা শুনে সেখানে পুলিশ পাঠানো হয়েছে। তবে মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে কেউ থানায় মামলা কিংবা অভিযোগ করেননি। অভিযোগ পেলে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।