কলহ-প্রেম-প্রতারণায় বেড়েছে আত্মহত্যা

রুবেল খান॥ হঠাৎ করেই বরিশালে বেড়েছে আত্মহত্যার প্রবণতা। চলতি মাসের গত ২৫ দিনে বরিশাল জেলার বিভিন্ন উপজেলায় ঘটেছে ১৬টি আত্মহত্যার ঘটনা। এছাড়া আত্মহত্যার চেষ্টা চালিয়েছে আরো ৩৬ জন। যা গত অক্টোবরের তুলনায় অনেকাংশে বেশি।
এদিকে হঠাৎ করে আত্মহত্যার প্রবণতা বেড়ে যাওয়ার কারণ হিসেবে পারিবারিক কলহ, আবেগী প্রেম, প্রতারণাকে দায়ি করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওয়ার্ড মাষ্টার অফিস এবং ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের পরিসংখ্যান পরিসংখ্যান অনুযায়ী চলতি মাসে নগরী সহ জেলার বিভিন্ন উপজেলায় আত্মহত্যার প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছে। যা গত অক্টোবর মাসের পরিসংখ্যানকে ছাড়িয়ে গেছে।
হাসপাতালের ওয়ার্ড মাষ্টার অফিসের হিসাব অনুযায়ী চলতি নভেম্বর মাসের ১নভেম্বর থেকে গতকাল ২৫ নভেম্বর পর্যন্ত শিশু সহ ৭ জনের অস্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে। মৃত্যুর পূর্বে এদের মধ্যে ৪ জনকে আত্মহত্যা জনিত কারণে চিকিৎসার জন্য শেবাচিম হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। বাকি ৩জনকে জরুরী বিভাগের নিয়ে আসলে চিকিৎসক মৃত বলে ঘোষণা করেন। মৃত্যুর কারণ হিসেবে পরিবারের সদস্যরা আত্মহত্যা বলে দাবী অভিযোগ করেছেন। এর মধ্যে ২টি মরদেহের ময়না তদন্ত করা হয়েছে।
এদিকে মেডিকেল কলেজের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগ থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী চলতি মাসের গত ২৫ দিনে তারা আত্মহত্যা জনিত কারণে মৃত্যু হওয়া ৯টি লাশের ময়না তদন্ত করেছেন। এর মধ্যে শেবাচিম হাসপাতালে মৃত্যু হওয়া দুটি ছাড়াও নগরীর কোতয়ালী, বিমানবন্দর ও কাউনিয়া থানা সহ জেলার অন্যান্য থানার মাধ্যমে লাশগুলো ময়না তদন্তের জন্য শেবাচিমের মর্গে প্রেরণ করা হয়। এসব লাশের ময়না তদন্ত সম্পন্ন হলেও দু-একটি বাদে অন্য লাশগুলোর ময়না তদন্ত রিপোর্ট এখন পর্যন্ত তৈরি হয়নি।
অন্যদিকে চলতি মাসের ২৫ দিনের মধ্যে গত ২০ নভেম্বর নগরীতে সব থেকে বেশি আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে। এই দিন এক স্কুল ছাত্রী ও এক গৃহবধু সহ ৩টি আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে। এরা সাবাই গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করে। গত ২২ নভেম্বর নগরীর পদ্মাপতি রোড থেকে গলায় ফাঁস দেয়া অবস্থায় একটি লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। অবশ্য এ ঘটনাটি হত্যাকান্ড হতে পারে বলেও ধারণা করছেন স্থানীয়রা। এছাড়া গত সোমবার রাতে বিষপানে আত্মহত্যার চেষ্টা চালালে গতকাল সকালে শেবাচিম হাসপাতালে মৃত্যু হয় সদর উপজেলা চরকাউয়া এলাকার এক যুবকের।
হাসপাতালের জরুরী বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, গতকাল পর্যন্ত চলতি মাসের ২৫ দিনে ৩৬ জন নারী ও পুরুষ আত্মহত্যার চেষ্টা চালিয়েছে। যার মধ্যে নারীদের সংখ্যাই বেশি। রয়েছে স্কুল কলেজের ছাত্র-ছাত্রীরাও। এরা হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়েছে।
আত্মহত্যাকারীদের স্বজন ও চেষ্টকারীদের সাথে আত্মহত্যার কারণ সম্পর্কে জানতে চাইলে এসব ঘটনার জন্য পারিবারিক কলহ ও আবেগি প্রেমকে দায়ী করেছেন অনেকে। সংসারে অভাব, দাম্পত্য কলহ এবং প্রেমে প্রতারণার শিকার হয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করা হয়েছে বলে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এমনটি দাবী করা হয়েছে। এছাড়া স্বামী ও শ্বশুর বাড়ির লোকের নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে স্ত্রীর এবং স্ত্রীর মানসিক নির্যাতন থেকে মুক্তি পেতে আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে বলেও স্বজনরা দাবী করেছেন।
বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ ডাঃ তপন কুমার সাহা বলেন, যখন কোন মানুষের উপরে তার ইচ্চার বিরুদ্ধে চাপ সৃষ্টি করা হয় তাখন তার মাঝে ক্ষোভ এবং আবেগ কাজ করে। এজন্য অনেকে আবেগ আপ্লুত হয়ে আত্মহত্যার পথ বেছে নিচ্ছে। আবার চাপ সামলাতে না পেরে মানসিক ভারসম্য হারিয়ে ফেলছে।
ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডাঃ আক্তারুজ্জামান তালুকদার বলেন, অনেক সময় বড় ধরনের আঘাত কিংবা কাছের মানুষকে হারিয়ে ফেললে মানুষের মনে আবেগ সৃষ্টি হয়। তখন মানুষটি যা ভাববে তাই করার চেষ্টা করছে। এজন্য আত্মহত্যার পথ বেছে নিচ্ছে অনেকে। তবে বাস্তব অভিজ্ঞতা এবং আত্মহননকারীদের স্বজনদের বরাত দিয়ে ডাঃ আক্তারুজ্জামান তালুকদার বলেন, যে সব আত্মহত্যার ঘটনা ঘটছে তার মধে স্বামী-স্ত্রী কলহ এবং প্রেম সংক্রান্ত ঘটনাই বেশি। তথ্য প্রযুক্তি এবং অনলাইন এর কারণে বর্তমান সময়ে মানুষের মাঝে আবেগ বেড়ে গেছে। এ আবেগের জন্যই আত্মহত্যার প্রবণতা বৃদ্ধি পেতে পারে বলে ধারণা করেন এই চিকিৎসক।