কর্মক্ষেত্রে সফল ৩ নারীকে সম্মাননা নানা আয়োজনে নগরীতে নারী দিবস উদযাপন

নিজস্ব প্রতিবেদক ॥ কর্মক্ষেত্রে সফল নারীদের সম্মাননা, আলোচনা সভা, উপস্থিত বক্তৃতা প্রতিযোগীতা এবং সাংষ্কৃতিক অনুষ্ঠানের মধ্যে দিয়ে নগরীতে আন্তর্জাতিক নারী দিবস উদযাপন করা হয়েছে। গতকাল বুধবার সকাল ১১ টায় নগরীর অশ্বিনী কুমার হলে “নারী পুরুষ সমতায় উন্নয়নে যাত্রা, বদলে যাবে বিশ্ব কর্মে নতুন মাত্রা” এ প্রতিপাদ্যে জেলা প্রশাসন ও মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের আয়োজনে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। জেলা প্রশাসক ড.গাজী মোঃ সাইফুজ্জানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন বিভাগীয় কমিশনার মোঃ গাউস (অতিরিক্ত সচিব)। এতে বিশেষ অতিথি ছিলেন মেট্রোপলিটান পুলিশ কমিশনার এস এম রুহুল আমিন। এছাড়াও অনুষ্ঠানে শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন জেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা রাশিদা বেগম, জেলা মহিলা পরিষদের সভানেত্রী রাবেয়া খাতুন, আভাসের নির্বাহী পরিচালক রহিমা সুলতানা কাজল, কবি আছমা চৌধুরি, সরকারী মহিলা কলেজের ইংরেজী বিভাগের সহকারী শিক্ষক রুমানা ইসলাম লুনা, আইসিডিএর নির্বাহী পরিচালক আনোয়ার জাহিদ, সমাজ সেবিকা নাসিমা আক্তার প্রমুখ। এসময় বক্তারা বলেন, বর্তমান বিশ্বে নারীর অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে দিবসটির তাৎপর্য ও গুরুত্ব অপরিসীম। সর্বক্ষেত্রে নারী-পুরুষের অংশীদারত্ব নিশ্চিত করার মাধ্যমে দেশের সার্বিক চিত্র পরিবর্তন করা সম্ভব। যা টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সহায়ক হবে। তাছাড়াও বর্তমান সরকারের সময়োপযোগী পদক্ষেপে রাজনীতি, বিচার বিভাগ, প্রশাসন, শিক্ষা, চিকিৎসা, সশস্ত্র বাহিনী, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ সর্বক্ষেত্রে নারীরা যোগ্যতার স্বাক্ষর রাখছেন। এসময় তারা আরো বলেন, যে দেশে নারীরা অগ্রগামী, সেই দেশ তত উন্নত। আমাদের দেশের নারীরাও অগ্রগামী হলেও এখনো পারিবারিক বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে রয়েছে। আমরা পারিবারিক ভাবে নারী বান্ধব নয়। আমাদের সমাজে নারী পুরুষে বিভক্তি থাকার কারনে আমরা পিছিয়ে রয়েছি। এছাড়াও বর্তমান সরকার নারী সমাজের উন্নয়ন মূলক কাজ করা সহ তাদের নিরাপত্তার জন্য বিভিন্ন আইন করেছে। নারীদের অধিকার আদায়ের জন্য নারীদেরকে বেশী করে এগিয়ে আসতে হবে। নিজ নিজ উদ্যোগে দেশের নারীরা যত এগিয়ে আসবে ততই এই দেশ তার কাঙ্খিত লক্ষ্যে পৌছে যেতে পারবে। পরে অনুষ্ঠানে নগরীর বিভিন্ন সরকারী-বেসরকারী কলেজের শিক্ষার্থীরা নারী সমাজের উন্নয়ন, আইন শৃংখলা সহ বিভিন্ন বিষয়ের উপর বক্তৃতার প্রতিযোগীতায় অংশ নেয়। গ্রামীন নারীরা নিজ নিজ স্থানে কৃষি উপকরন বিক্রির কাজে সফলতা অর্জন করায় সফল নারী দিবসের অনুষ্ঠানে তিন নারীকে সম্মাননা প্রদান করা হয়েছে। সম্মাননাপ্রাপ্ত সফল নারীরা হলেন, মাদারীপুরের যুথিকা বিশ্বাষ, আগৈলঝাড়ার লাকি পান্ডে ও বরগুনার ছালমা শহীদ। সবাইকে সম্মাননা স্বরুপ ক্রেস্ট প্রদান করা হয়। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন পুলিশের সিনিয়র সহকারী কমিশনার শাহনাজ পারভিন, জেলা প্রশাসনের নির্বাহী হাকিম উর্মি ভৌমিক, অধ্যাপিকা শাহ সাজেদা, শিশু সংগঠক জীবন কৃষ্ণ দে, শুভংকর চক্রবর্তী, নারী নেত্রী নিগার সুলতানা হনুফা, হাসিনা বেগম নীলা, রণজিৎ দত্ত প্রমুখ।
এদিকে আন্তর্জাতিক নারী দিবস উদযাপনে কোতয়ালী মডেল থানার ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারের আয়োজনে আলোচনা সভা ও র‌্যালী অনুষ্ঠিত হয়। পুলিশ কমিশনার এস এম রুহুল আমিনের নেতৃত র‌্যালীতে অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার আবুল কালাম আজাদ, উপ-পুলিশ কমিশনার (সদর) মো. হাবিবুর রহমান, উপ-পুলিশ কমিশনার (উত্তর) কামরুল আমিন, উপ-পুলিশ কমিশনার (দক্ষিন) গোলাম রউফ খান, উপ-পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) উত্তম কুমার পালসহ পুলিশের উর্ধতন কর্মকর্তা সহ নারী পুলিশ সদস্যরা অংশ নেন। র‌্যালীটি নগরীর প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিন করে।
অপরদিকে আন্তর্জাতিক নারী দিবস বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের একমাত্র ছাত্রী হল শেখ হাসিনা হলের উদ্যোগে এক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। শেখ হাসিনা হলের প্রভোস্ট দিল আফরোজ খানমের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড.এস এম ইমামুল হক। বিশেষ অতিথি ছিলেন ট্রেজারার অধ্যাপক ড. এ কে এম মাহবুব হাসান। প্রধান অতিথির বক্তব্যে উপাচার্য নারী দিবসে সকল নারীর প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করে বলেন, আপনারা কখনো নিজেদেরকে ছোট ও দূর্বল ভাববেন না, কেননা নারীরা মায়ের জাতি। প্রতিটি ধর্মেই নারীর অবদানের কথা বলা হয়েছে। নারী দিবসকে একটি নির্দিষ্ট দিনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে এর ব্যাপকতা ও গভীরতা বছরের প্রতিটি দিনই উপলব্ধি করতে হবে। তিনি বলেন, যে সকল নারীরা গৃহের অভ্যন্তরীন কাজে নিজেদেরকে নিয়োজিত রাখেন তাদের অবদানের কথা চিন্তা করে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী দেশরতœ শেখ হাসিনা তাদেরকে হাউজ মেকার হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন। তাঁর সরকার নারীর কল্যানে সব ধরনের কাজ করে যাচ্ছে। উপাচার্য আরও বলেন, আমি যতদিন বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য হিসেবে আছি ততদিন আমার এ বিশ্ববিদ্যালয়ে কোন নারীর প্রতি অবহেলা ও বৈষম্য হতে দেয়া হবেনা। আলোচনা সভায় শেখ হাসিনা হলের হাউজ টিউটর ও সহকারী হাউজ টিউটর সহ শিক্ষার্থীরা উপস্থিত ছিলেন। আলোচনা সভা শেষে এক মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
অন্যদিকে বিকেলে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ বরিশাল জেলা শাখার আয়োজনে নগরীর কবি জীবনানন্দ দাশ সড়কে একটি র‌্যালী বের হয়ে শহরের প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিন করে।
উল্লেখ্য, এই দিবসটি উদযাপনের পেছনে রয়েছে নারী শ্রমিকের অধিকার আদায়ের সংগ্রামের ইতিহাস। ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দে মজুরি বৈষম্য, কর্মঘণ্টা নির্দিষ্ট করা, কাজের অমানবিক পরিবেশের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের রাস্তায় নেমেছিলেন সুতা কারখানার নারী শ্রমিকেরা। সেই মিছিলে চলে সরকারের লেঠেল বাহিনীর দমন-পীড়ন। ১৯০৮ খ্রিস্টাব্দে নিউইয়র্কের সোশ্যাল ডেমোক্র্যাট নারী সংগঠনের পক্ষ থেকে আয়োজিত নারী সমাবেশে জার্মান সমাজতান্ত্রিক নেত্রী ক্লারা জেটকিনের নেতৃত্বে সর্ব প্রথম আন্তর্জাতিক নারী সম্মেলন হয়। ক্লারা ছিলেন জার্মান রাজনীতিবিদ জার্মান কমিউনিস্ট পার্টির স্থপতিদের একজন। এরপর ১৯১০ খ্রিস্টাব্দে ডেনমার্কের কোপেনহেগেনে অনুষ্ঠিত হয় দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক নারী সম্মেলন। ১৭টি দেশ থেকে ১০০ জন নারী প্রতিনিধি এতে যোগ দিয়েছিলেন। এ সম্মেলনে ক্লারা প্রতি বৎসর ৮ মার্চকে আন্তর্জাতিক নারী দিবস হিসেবে পালন করার প্রস্তাব দেন। সিদ্ধান্ত হয় ১৯১১ খ্রিস্টাব্দ থেকে নারীদের সম-অধিকার দিবস হিসেবে দিনটি পালিত হবে। দিবসটি পালনে এগিয়ে আসে বিভিন্ন দেশের সমাজতন্ত্রীরা। ১৯১৪ খ্রিস্টাব্দ থেকে বেশ কয়েকটি দেশে ৮ মার্চ পালিত হতে লাগল। বাংলাদেশেও ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার লাভের পূর্ব থেকেই এই দিবসটি পালিত হতে শুরু করে। অতঃপর ১৯৭৫ সালে খ্রিস্টাব্দে ৮ মার্চকে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি প্রদান করা হয়। এছাড়াও দিবসটি পালনের জন্য বিভিন্ন রাষ্ট্রকে আহ্বান জানায় জাতিসংঘ। এরপর থেকে সারা পৃথিবী জুড়েই পালিত হচ্ছে এই দিনটি। তখন থেকেই বিভিন্ন দেশে নারীর সংগ্রামের ইতিহাসকে স্মরণ করে দিবসটি পালন শুরু হয়।