কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বরখাস্তসহ শাস্তি পেলেও বরিশালের সরকারী দপ্তরে দুর্নীতি অব্যাহত

রুবেল খান॥ একের পর এক ফাঁস হয়ে যাচ্ছে সরকারী দপ্তরের কর্মকর্তাদের দুর্নীতি এবং ঘুষ কেলেঙ্কারীর তথ্য। গত বছরের শেষ দিক থেকে চলতি বছর পর্যন্ত দুর্নীতির দায়ে বরখাস্ত সহ শাস্তিও পেয়েছেন প্রায় ডজন খানে শীর্ষ কর্তারা। তার পরেও সরকারী প্রতিষ্ঠান গুলোতে থামছে না অনিয়ম ও দুর্নীতি।
খোঁজ নিয়ে জানাগেছে, বিভাগীয় শহর নগরীতে জনগনের সেবা এবং উন্নয়ন মুলক বিভিন্ন সরকারী প্রতিষ্ঠান রয়েছে। যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হিসেবে রয়েছে বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার কার্যালয়, বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল, কর কমিশনার কার্যালয়, শিক্ষা অফিস সহ আরো অনেক দপ্তর। জনগনের সেবার জন্য এসব দপ্তর গড়ে উঠলেও সরকারের সেই লক্ষ অর্জিত হচ্ছে না। বরং সরকারী দপ্তরকে অনিয়ম, দুর্নীতি আর ঘুষ বানিজ্যের মাধ্যমে অবৈধ অর্থ আয়ের প্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করছে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। প্রতিটি দপ্তরেই টাকা আর অনিয়ম ছাড়া মিলছে না কোন সেবা। যে কারনে জনগন ও সরকারের ভাবমুর্তি ক্ষুন্ন হলেও আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ বনে যাচ্ছেন সরকারী প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তা এবং তাদের অনুসারীরা।
এদিকে অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী ২০১৫ সালের শেষ দিক থেকে চলতি বছরের জানুয়ারী পর্যন্ত দুর্নীতি এবং অনিময় করতে গিয়ে বিভিন্ন সরকারী প্রতিষ্ঠানের বেশ কয়েকজন শীর্ষ কর্তা ব্যক্তিরা ধরা পড়েছেন। এদের মধ্যে কারো কারো শাস্তি দেয়া হয়েছে। আবার কেউ কেউ প্রাথমিক পর্যায়ের শাস্তি ভোগ করছেন। তবে তাদের শাস্তি চুড়ান্ত করতে বিভাগীয় মামলা সহ তদন্ত করছে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রনালয়।
সরকারী দপ্তরে ঘুষ বানিজ্য, অনিয়ম এবং দুর্নীতির শেষ ঘটনাটি ঘটেছে নগরীর জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসে। কোটা সংকট দেখিয়ে শিক্ষকদের জিম্মি করে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়ে শাস্তিমূলক বদলি হয়েছে ভারপ্রাপ্ত জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা শেখ মো. আক্তারুজ্জামান। এর পূর্বে বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের তৃতীয় এবং চতুর্থ শ্রেনী কর্মচারী পদে ২২৬ জন জনবল নিয়োগের মাধ্যমে দুর্নীতির অভিযোগে সাবেক অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত পরিচালক ও চক্ষু বিভাগের চলতি দিয়েত্বে অধ্যাপক ডা. নিজাম উদ্দিন ফারুক, উপ-পরিচালক ডা. শহীদুল ইসলাম ও প্রশাসনিক কর্তকর্তা আব্দুল জলিলকে সাময়িক ভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে। এমনকি তাদের বিরুদ্ধে দায়ের করা হয়েছে বিভাগীয় মামলা। যার তদন্ত করছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এছাড়া অনিয়ম এবং দুর্নীতির মধ্যে দিয়ে চাকুরী পাওয়াদের কার্যক্রম স্থগিত এবং বেতন ভাতা বন্ধ করে দিয়েছেন স্বাস্থ্য মন্ত্রনালয় কর্তৃপক্ষ। এর পূর্বে দরপত্রে অনিময় এবং দুর্নীতির অভিযোগে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে ওএসডি করা হয় হয় শেবাচিম হাসপাতালের সাবেক পরিচালক ডা. মু. কামরুল হাসান সেলিম।
একইভাবে নিয়োগ দুর্নীতি করে চাকুরী থেকে স্থায়ী ভাবে বরখাস্ত হয়েছে কর কমিশনারের এপিএস সৈয়দ নুমান। এছাড়াও দুর্নীতিতে ফেঁসে গিয়ে স্ট্যান্ড রিলিজ হয়েছেন নগরীর গনপূর্ত কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. জাকির হোসেন। তার বিরুদ্ধে রয়েছে দুর্নীতির মামলা ও গ্রেফতারী পরোয়ানা।
বরিশাল মহানগরীতে দুর্নীতি এবং অনিয়মের আরেকটি রেকড সৃষ্টি হয়েছিলে বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশে। কনষ্ট্রাবল থেকে এএসআই এবং এএসআই থেকে এসআই পদে পদুন্নতির নামে ঘুষ ফান্ড খোলেন মহানগর পুলিশের শীর্ষ কর্মকর্তারা। পুলিশের ঘুষ ফান্ড কেলেংকারীতে মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার শৈবাল কান্তি দাস, ডিসি হেট কোয়ার্টার সোয়েব আহম্মেদকে শাস্তিমুলক বদলি, উপ-পুলিশ কমিশনার জিল্লুর রহমান, মেট্রোপলিটন পুলিশের এক আরআই সহ আরো ১১ এসআই, এএসআই এবং কন্ট্রাবলকে সাময়িক ভাবে বরখাস্ত করা হয় স্বারাস্ত্র মন্ত্রনালয় থেকে। এছাড়া যাদের কাজ থেকে ঘুষ আদায় করা হয়েছিলো তাদের ফেরত দেয়া হয় ঘুষের টাকা এবং পেয়ে যান পদন্নতিও।
এছাড়া দুর্নীতির দায়ে বদলি করা হয়েছে বরিশাল সদর খাদ্য গুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জসিম উদ্দিনকে। অনিয়মের অভিযোগে বরিশাল থেকে বদলি করা হয়ে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের সহকারী কমিশনার ভাস্কর সাহা, উপ-পরিদর্শক চিন্ময় মিত্র, অনিয়ম এবং অর্থ কেলেঙ্কারীর অভিযোগে নগরীর ইনস্টিটিউট অব হেলথ্ টেকনোলজী (আই.এইচ.টি) এর প্রধান সহকারী আব্দুল জলিল এর প্রেসন বাতিল করে সদর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পন্ন কর্মকর্তার কার্যালয়ে নিয়ে আসা হয়।
এদিকে সরকারী দপ্তরে একের পর এক দুর্নীতি এবং অনিয়ম কারীদের শাস্তির আওতায় আনার পরেও প্রেক্ষাটপটের পরিবর্তন হচ্ছে না। পূর্বের নিয়মেই প্রতিষ্ঠানগুলো চলছে অনিময় এবং দুর্নীতি। কেননা যেসব প্রতিষ্ঠানের কর্তাদের শাস্তি দেয়া হয়েছে তাদের সহযোগিরা এখনো বহাল তবিয়তেই রয়েছেন। নতুন যে প্রতিষ্ঠান প্রদান আসছেন তিনিও বাধ্য হচ্ছেন পূর্বের নিয়েমেই হাটতে। তাই শাস্তি শুধুমাত্র বড় কর্তাদের নয়, তাদের সহযোগিদেরও শাস্তির আওতায় নিয়ে আসলে দুর্নীতি দমন সম্ভব বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।