কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উদাসীনতায় নাগরিক সেবা বঞ্চিত নগরবাসী

বিশেষ প্রতিবেদক ॥ কতিপয় কর্মকর্তা-কর্মচারীর দায়িত্বে উদাসীনতা ও অবহেলা সহ প্রয়োজনীয় তহবিলের অভাবে বরিশাল মহানগরীর নাগরিক পরিসেবা ক্রমশ সংকুচিত হচ্ছে। এর সাথে সাম্প্রতিক নজিরবিহীন প্রবল বর্ষনে এ নগরীর রাস্তাঘাটের কংকাল দেহ বেরিয়ে আসায় নগরবাসীর দূর্ভোগ আরো বেড়েছে। নিয়মিত পরিস্কার না করা সহ কতিপয় বিবেকহীন নগরবাসীর সমাজবিরোধী কর্মকান্ডে এ নগরীর পয়ঃনিস্কাশন ব্যবস্থা ক্রমশ অচলবস্থার মুখে। ফলে মাঝারী থেকে ভারী বর্ষনে জলাবদ্ধতায় বরিশাল মহানগরীর নগরজীবন স্তব্ধ হয়ে যাচ্ছে বার বার। ফলে রাস্তাঘাটসহ গোটা নগরীর জলাবদ্ধতা দীর্ঘায়িত হচ্ছে। রাস্তাঘাটের ক্ষতিও প্রলম্বিত হচ্ছে। এছাড়াও দিনের বেলা এমনকি দুপুরের পরেও রাস্তার পাশে ময়লা আবর্জনা জমে থাকায় নাকে রুমাল দিয়ে পথ চলতে হচ্ছে নগরবাসীকে। বিশেষ করে নগরীর হাতেম আলী কলেজ ছাত্রাবাস সংলগ্ন অস্থায়ী ময়লা আবর্জনা ফেলার স্থানটি এখন পথচারীদের কাছে রীতিমত দুর্গন্ধের স্থায়ী স্থান হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। কিন্তু এতেও টনক নড়ছে না কর্তৃপক্ষের। এসব দুরবস্থার সাথে প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার অভাবে বরিশাল সিটি করপোরেশনের প্রশাসনিক অচলবস্থাও তড়ান্বিত হচ্ছে ক্রমশ। তহবিল সংকট সহ নগর প্রশাসন ও এর কর্মকর্তাÑকর্মচারীদের উদাসীনতার সাথে দায়িত্বে অবহেলা বরিশাল মহানগরীর  নাগরিক পরিসেবাকে ক্রমশ সংকুচিত করছে। অথচ এ নগর ভবন জনবলের চাপ নুহ্যমান। এ নগরীর রাস্তাঘাট পরিস্কার পরিচ্ছন্ন সহ ড্রেনসমুহ সচল রাখার লক্ষে প্রায় দেড় হাজার দৈনিক মজুরী ভিত্তিক শ্রমিক রয়েছে। যাদের পেছনে  নগর ভবনের ব্যায় বছরে ব্যায় প্রায় সাড়ে ৭ কোটি টাকা। অথচ নিয়মিত কর্মকর্তাÑকর্মচারীদের বেতন ৮কোটি টাকার মত।  খোঁজ নিয়ে জানা গেছে বরিশাল সিটি করপোরেশনের দেড় হাজার দৈনিক মজুরী

ভিত্তিক শ্রমিকের অর্ধেকই কোন কাজ না করেই বেতন নিচ্ছে। এরা নিয়মিত হাজিরা পর্যন্ত দেয়না। সংশ্লিষ্ট শাখা প্রধান সহ দাযিত্বশীল মহল এসব বিষয় স্বীকার করলেও কোন ব্যবস্থা নেই । অবশিষ্ট  দৈনিক শ্রমিকরা কাজে আসলেও তার বেশীরভাগই এক ঘন্টাও কাজ করছে না প্রতিদিন। ফলে নগরীর রাস্তাঘাট সহ পাবলিক প্লেসগুলো ক্রমশ সৌন্দর্য হারাচ্ছে। ডাষ্টবিনগুলোও নিয়মিত পরিস্কার হচ্ছে না। ড্রেনগুলোর অবস্থা আরো করুন। রাস্তার ধারে দিনরাত ময়লা আবর্জনার উৎকট গন্ধে নগরবাসীর প্রান ওষ্ঠাগত।

নগরীর বিভিন্ন এলাকার রাস্তার পাশে মাসের পর মাস ধরে বালু সহ বিভিন্ন নির্মান সামগ্রী জড়ো করে রাখায় ড্রেনগুলো ক্রমশ ভরাট হয়ে গেছে। অনেক বাড়িওয়ালা সহ নগরবাসী ড্রেনকে ডাষ্টবিন হিসেবে ব্যবহার করছেন। আচ্ছাদনযুক্ত ড্রেনগুলোর স্যালো সাইড ড্রেনের পকেট দিয়ে প্রতিনিয়ত বালু সহ নানা ময়লা আবর্জনা প্রবেশ করে পয়ঃনিস্কাশন ব্যবস্থা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। ফলে সামান্য বৃষ্টিতেই বরিশাল মহানগরীর রাস্তায় পানি ঢেউ খেলে। কিন্তু এসব অব্যবস্থা অনিয়মকে প্রতিহত করারও কোন উদ্যোগ বা গরজ নেই নগর ভবনের।

গত ২১ আগষ্ট স্মরনকালের ভয়াবহ বর্ষনে বরিশাল মহানগরীর প্রায় সাড়ে ৬শ কিলোমিটার রাস্তার দুই-তৃতীয়াংশই ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। এক সংবাদ সম্মেলনে সিটি মেয়র আহসান হাবীব কামাল জানিয়েছেন, ২১ আগষ্টের নজিরবিহীন বর্ষনে বরিশাল মহানগরীর ৪৬৬ কিলোমিটার বিটুমিনাস রাস্তার আড়াইশ কিলোমিটারেরও বেশী ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। এছাড়াও নদী তীরবর্তী প্রায় ৪১কিলোমিটার বাঁধ ও মাটির রাস্তারও ব্যপক ক্ষতি হয়েছে। তিনি এসব সড়ক অবকাঠামো মেরামত ও পূণর্বাসনে ৬শ কোটি টাকা প্রয়োজন বলে দাবী করে মন্ত্রনালয়ের  কাছে ৪১৩ কোটি টাকার থোক বরাদ্দ দাবী করেছেন।

কিন্তু শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত কোন তহবিলের সংস্থান হয়নি। ফলে নগরীর ভাঙাচোরা রাস্তাঘাট নগরবাসীর দূর্ভোগকে যথেষ্ঠ বৃদ্ধি করে চলেছে। রিক্সা সহ ইজিবাইকের যাত্রীদের কোমড় ব্যথা শুরু হচ্ছে প্রতিদিন। অনেক গর্ভবতী  নগরীর রাস্তায় প্রতিদিন অসুস্থ হয়ে পড়ছেন।

তহবিল সংকটের মধ্যেও ২১ আগষ্টের বর্ষনের পরে সিটি করপোরেশন থেকে নগরীর বেশ কয়েকটি ক্ষতিগ্রস্থ রাস্তায় বালু ও খোয়া দিয়ে সাময়িক জোড়াতালী দেয়া শুরু হলেও সপ্তাহ ঘুরতেই তা পূর্বাবস্থায় ফিরতেও শুরু করেছে। যদিও সিটি মেয়র নগরীর সদর রোড সহ প্রধান সড়কগুলো মেরামত ও পূণর্বাসনে নিজস্ব তহবিল থেকে ঠিকাদার নিয়োগের কথা জানিয়েছেন। কিন্তু বর্ষা পরোপুরি বিদায় না নেয়ায় সে সব কাজ সম্পন্ন করতেও আরো কিছু দিন অপেক্ষা করতে হতে পারে। ফলে দূর্ভোগ আপাতত নগরবাসীকে ছাড়ছে না।

উপরন্তু  তহবিল সংকটে বরিশাল সিটি করপোরেশন যেখানে প্রশাসনিক ব্যায় মেটাতে পারছে না , সেখানে নিয়মিত রক্ষনাবেক্ষন সহ উন্নয়ন কাজ করার স্বপ্ন বাস্তবায়নের সুযোগ কোথায়? এমন প্রশ্ন ওয়াকিবাহাল মহলের। গত ১৭আগষ্ট চলতি অর্থ বছরের জন্য বরিশাল সিটি করপোরেশনের ৪৪৪ কোটি টাকার বাজেট ঘোষনাকালে সিটি মেয়র ১১৮ কোটি টাকার নিজস্ব তহবিল থেকে আয়ের একটি পরিসংখ্যানও প্রদান করেছেন। অথচ এর মধ্যে সিটি করপোরেশনের হোল্ডিং ট্যাক্স সহ পানির বিল ও একান্ত আয় ধরা হয়েছে মাত্র ৩৩ কোটি ২৯ লাখ টাকার কিছু বেশী। কর্মকর্তাÑকর্মচারীদের বেতন-বোনাস সহ প্রশাসনিক ব্যায় ৪২ কোটি ২৩ লাখ টাকারও বেশী। ফলে শুধুমাত্র প্রশাসনিক খাতেই নগর ভবনকে  ৮ কোটি টাকারও বেশী ঋন নিয়ে চলতে হচ্ছে। নতুন বেতন কাঠামো অনুযায়ী বেতন-বোনাস দেয়া শুরু হলে প্রশাসনিক ব্যায় আরো কয়েক কোটি টাকা বাড়বে। ফলে এ নগর ভবনের কর্মকর্তা-কর্মচারীতের বকেয়া বর্তমানের ৪ মাস থেকে ৮ মাসে উন্নীত হলেও আশ্চর্যের কিছু নাও থাকতে পারে। আগামীতে এ নগর প্রশাসনের বেতন-বোনাস পরিশোধই দুরুহ হয়ে পড়বে।

একদিকে প্রায় দ্বিগুন দৈনিক মজুরী ভিত্তিক কর্মী, আপরদিকে রাজনৈতিক কারনে বরিশাল সিটি করপোরেশনের জন্য সরকারী থোক বরাদ্দ সহ উন্নয়ন বরাদ্দ ক্রমশ হ্রাস পাওয়ায় এ স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানটির অর্থনৈতিক দুরবস্থা ক্রমশ নিয়ন্ত্রনের বাইরে চলে যাচ্ছে।

একসময়ে পরিচ্ছন্ন  বরিশাল মহানগরী ক্রমশ ময়লা আবর্জনার নগরীতে পরিনত হচ্ছে। এর সাথে ভাঙা রাস্তাঘাট মেরামত সহ উন্নয়ন কাজ তহবিল সংকটে ব্যাহত হবার বিষয়টি নগরবাসীকে যথেষ্ঠ কষ্ট দিচ্ছে।

এসব ব্যাপারে সিটি মেয়র সহ একাধীক কাউন্সিলরের বক্তব্য, ‘তারা চেষ্টা করছেন সীমিত সাধ্যের মধ্যেও সর্বোচ্চ নাগরিক পরিসেবা নিশ্চিত করতে। এজন্য তারা নগরবাসী সহ সমাজের সর্বস্তরের মানুষের সহযোগিতাও কামনা করেছেন।