ঐতিহ্যবাহী বিউটি সিনেমা হল ভেঙে ফেলা হচ্ছে

সাইফ আমীন ॥ নতুন কোনো সিনেমা মুক্তি পেলেই মানুষের ঢল নামতো দক্ষিনাঞ্চলের অন্যতম প্রাচীন বিউটি সিনেমা হলে। বড় পর্দায় মুক্তি পাওয়া ছবি দেখতে এই প্রেক্ষাগৃহে তখন দর্শকদের ঢল নামতো । প্রেক্ষাগৃহ কর্তৃপক্ষ দর্শকদের চাহিদার কথা ভেবে ঢাকার সাথে তাল মিলিয়ে কিংবা একদিন আগেই বিউটি সিনেমা হলে ছবি মুক্তি পেত। সে সঙ্গে বানিজ্য সফল ব্যবসা হতো মালিকের। এখন এগুলো সবই স্মৃতি কথা। আকাশ সংস্কৃতির প্রভাব ও চলচিত্রের মান নি¤œমূখী হওয়ায় ধীরে ধীরে দর্শকরা সিনেমা হল বিমূখ হয়ে পড়ে। লোকসানের ঘানি টানতে না পেরে গত ১৬ জুন দক্ষিনাঞ্চলের অন্যতম প্রাচীন বিউটি সিনেমা হল বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয় মালিক। ফলে চাকরি হারান প্রেক্ষাগৃেহর প্রায় ৪০ জন স্টাফ। এছাড়া সিনেমা হলটি আকস্মিক বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এর সাথে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভাবে জড়িত প্রায় সহস্রাধিক মানুষ ক্ষতি গ্রস্থ হয়েছেন। সিনেমা হল সংশ্লিষ্টরা জানায়, ১৯৬৯ সালে বিউটি সিনেমা হলটির প্রতিষ্ঠা করেন কামাল উদ্দিন চৌধুরী। প্রতিষ্ঠার পর সাধারন কর্মদিবসে প্রতিদিন ৪টি শো অনুষ্ঠিত হতো। দর্শকদের ঢল নামতো শো’ গুলোতে। দর্শকদের কারনে তখন রমরমা ব্যবসা করতো প্রেক্ষাগৃহের মালিক। নব্বইয়ের দশকের শেষ ভাগে অশ্লীল সিনেমা নির্মাণের কারণে সম্ভ্রান্ত পরিবার দেশীয় সিনেমা বিমুখ হয়। ফলে সিনেমা হল হারায় মধ্য থেকে উচ্চ বিত্তের দর্শক। সিনেমা হল বন্ধের জন্য মানসম্মত চলচ্চিত্রের অভাবই মূলত দায়ী। এছাড়া স্যাটেলাইট চ্যানেলের প্রভাব, কাটপিসের দৌরাত্ম্য ক্ষতি করেছে এ শিল্পকে। দীর্ঘদিন লোকসান গুনে সিনেমা হলটি চলছিল। মাস শেষে বিদ্যুৎ বিল, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতনসহ নানা মেইনটেন্যান্স খরচ বেড়েই চলেছে। মাসে প্রায় দেড় লাখ টাকা লোকসান গুনেই মালিক জুলফিকার উদ্দিন চৌধুরী বাবার স্মৃতি ধরে রাখতে সিনেমা হলটি বন্ধ করতে চায়নি। তবে শেষ দিকে ২০/৩০ জনের বেশী দর্শক হতনা । এ
কারনে লোকসান আরো বাড়তে থাকায় হলটি বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয় মালিক পক্ষ। সিনেমা হলের স্টাফরা জানায়, গতকাল শুক্রবার সিনেমা হলটি ভেঙ্গে ফেলার কাজ শুরু হয়েছে। তাই এখন আয়ের জন্য অন্য কোন পথ বেছে নেওয়া ছাড়া তাদের আর কোন উপায় নেই। সিনেমা হল সংলগ্ন দোকানদাররা জানান, কয়েক বছর আগেও সিনেমা হলে দর্শক আসতেন। কিন্তু এখন ভালো ছবির অভাবে দর্শক আসে না। ঘরে বসে তারা ভালো ছবি দেখতে পাচ্ছেন স্যাটেলাইট চ্যানেলের কল্যাণে। এ কারনে তাদের দোকানেও বেচা কেনা প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে । লোকসান গুনতে হচ্ছে তাদেরও। সিনেমাপ্রেমী অটো রিকসা চালক নেয়ামত জানান, এক সময়তিনি নিয়মিত সিনেমা দেখতেন। কিন্ত এখন ঘড়ে বসে টিভিতেই এখন সিনেমা দেখা যায়। তাই সিনেমা হলে যাওয়া তিনি বন্ধ করেছেন। নগরীর বিশিষ্ট জনেরা মনে করেন, বিনোদনের অভাবে অপরাধ প্রবণতা বাড়ছে। এক সময় বিনোদন বলতে সিনেমা ছিল একমাত্র ভরসা। শ্রমজীবী মানুষ দিনভর খাটুনির পর সন্ধ্যায় বিনোদনের মাধ্যমে ক্লান্তি দূর করতে সিনেমা হলে গিয়ে ছবি দেখত। একসময় তারা মনের মতো ছবির অভাবে সিনেমা হল বিমুখ হয়। সিনেমা হলের সংখ্যা কমতে থাকায় বিনোদন হিসেবে তারা সিডি-ডিভিডিতে সেন্সরবিহীন আপত্তিকর দৃশ্যের সিনেমা ও নীল ছবি দেখে এবং জুয়া, হাউজি, মাদকদ্রব্যের আশ্রয় নিয়ে সমাজে অপরাধ বাড়াচ্ছে। নগরীর ঐতিহ্যবাহী এ সিনেমা হলটি ভেঙে ফেলার কারনে আরও একটি ইতিহাস মুছে যাচ্ছে। এর আগে সোনালী ও কাকলী সিনেমা হল বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। নিভু নিভু করে কোন রকমে নগরীর একমাত্র সিনেমা হল ‘অভিরুচি’ চললেও তার অবস্থাও বন্ধের পথে।