এলএসডি থেকে ২০ টন চাল পাচারকালে মূল হোতা মামুন সহ আটক-৬

নিজস্ব প্রতিবেদক ॥ বরিশাল সদর খাদ্য গুদাম থেকে সরকারি চাল পাচারের সময় প্রায় ২০ টন চাল সহ ৬ কর্মকর্তা-কর্মচারীকে আটক করেছে র‌্যাব। গতকাল সোমবার সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত এই অভিযানে পাচারে জড়িত থাকায় আটককৃতরা হলেন বরিশাল সদর খাদ্য গুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. আবদুল্লাহ আল মামুন, সহকারি উপ-খাদ্য পরিদর্শক মো. আব্দুর রহিম হাওলাদার, নিরাপত্তা প্রহরী মো. আরিফুল ইসলাম, মো. শাহাবুদ্দিন সিকদার, মো. কবির খান ও ট্রান্সপোর্ট এজেন্সির দালাল মো. কবির। এসময় পাচারে ব্যবহৃত ট্রাক (যশোর ট-১১-২৯৭৬) এবং এতে বহনকৃত ৩৯৪ বস্তা চাল জব্দ করে তারা।

র‌্যাব-৮ এর ডিএডি ও স্পেশালাইজড কোম্পানীর প্রধান আমজাদ জানান, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে সরকারি চাল পাচারের খবরে তারা সকাল ১১টার দিকে সদর খাদ্য গুদামে অভিযান পরিচালনা করেন। এসময় তাদের উপস্থিতি টের পেয়ে প্রায় ২০ টন চাল বোঝাই ট্রাক ফেলে পালিয়ে যায় মাঠ পর্যায়ে পাচারের দায়িত্বে থাকা নিরাপত্তা প্রহরী মো. আরিফুল ইসলাম, মো. শাহাবুদ্দিন সিকদার ও মো. কবির খান। একই সাথে পালিয়ে যায় বরিশাল সদর খাদ্য গুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও পাচারের মূলহোতা মো. আবদুল্লাহ আল মামুন। ট্রাকটি পরিত্যক্ত অবস্থায় ৩নং গুদামের গেটে ফেলে পালায় চালক আজমল।

এসময় আশেপাশে খুঁজাখুঁজি করে জানতে পারেন, গুদাম সংলগ্ন মুক্তিযোদ্ধা পার্কে গা ঢাকা দিয়েছে অভিযুক্তরা। সেখান থেকে তাদের আটক করে নিয়ে আসেন সদর খাদ্য গুদামের অফিসে। তারা জানায়, খাদ্য গুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. আবদুল্লাহ আল মামুনের নির্দেশে আরআরএফ বাহিনীর জন্য এই ২০ টন চাল তারা ট্রাকে বোঝাই করেছেন। তবে, যে ট্রাকে তারা চাল বোঝাই করেছে ট্রাকটি আরআরএফ এর নির্ধারিত ট্রাক নয়। এটি আপন ট্রান্সপোর্ট এজেন্সির একটি মালবাহী ট্রাক যা এখান থেকে চাল বোঝাই করে খুলনার ফুলতলা অটো রাইস মিলে যাওয়ার উদ্দেশ্যে আনা হয়েছে বলে জানায় ওই ট্রাকের চালক আজমল।

অন্যদিকে সরকারি চাল বুঝে নিতে আসা আরআরএফ এর দুই কনস্টেবল মো. ইকবাল হোসেন ও রাজিব জানান, বেলা দুইটার সময় তাদের জন্য বরাদ্দকৃত ২০ টন চাল বুঝে নিতে ট্রাক (ঝিনাইদহ ট-০৫-০১৪১) নিয়ে খাদ্য গুদামে আসেন তারা। এসে দেখতে পান তাদের নামে বরাদ্দের কথা বলে ২০ টন সরকারি চাল খুলনা পাচারের জন্য অন্য ট্রাকে বোঝাই করা হয়েছে। তাদের এমন বক্তব্যের পরে অফিসে বসে এই চাল কোথায় এবং কি কারনে নেয়া হচ্ছে এমন জেরা করা হলে বের হয় আসল ঘটনা।

র‌্যাবের জিজ্ঞাসাবাদের প্রেক্ষিতে পাচারের অভিযোগে আটককৃত সহকারি উপ-খাদ্য পরিদর্শক মো. আব্দুর রহিম হাওলাদার বলেন, এই চাল মো. আবদুল্লাহ আল মামুনের নির্দেশে তারা পাচারের উদ্দেশ্যে ট্রাক বোঝাই করেছিলেন। প্রধান নির্দেশদাতা তিনিই। আরআরএফ এর জন্য চাল বরাদ্দের বাহানায় এই চাল পাচার করছেন তারা। সরকারি বস্তাভরা এই ২০ টন চালের মালিক গুদামের লেবার সর্দার আলমগীর ও সত্তার। সরকারি গুদাম হলেও সরকারি চাল তাদের হয়ে বিভিন্ন সময় থাকে খাদ্য গুদামে। অতঃপর তা দালালের মাধ্যমে বিক্রি করা হয় দেশের বিভিন্ন স্থানের অসাধু ব্যবসায়ীদের কাছে। আরআরএফ এর চাল দেয়ার বাহানায় গতকালও এমনই একটি পাচার চলছিল। মূলত তিনি অফিসেই দায়িত্ব পালন করেন। গুদাম থেকে চাল পাচারের উদ্দেশ্যে ট্রাকে উঠানো-নামানোর কাজ করে থাকে আটককৃত তিন নিরাপত্তাকর্মী। এসময় জিজ্ঞাসাবাদে ৩ নিরাপত্তাকর্মী স্বীকার করেন তারা কিছুই জানেন না। গুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা মো. আবদুল্লাহ আল মামুনের নির্দেশেই তারা এই পাচার কাজে অংশ নেয়। প্রতি পাচারে ৬-১০ বস্তা চাল পান তারা। যা বিভিন্নভাবে বিক্রি করেন। চোরাই চাল বিক্রির বিভিন্ন রসিদ পাওয়া যায় তাদের দেহ তল্লাশী করে।

কিন্তু মাঠপর্যায়ের এসকল চোরদের আটক করা হলেও গুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. আবদুল্লাহ আল মামুন প্রথমেই পালিয়ে যায়। তার অবর্তমানে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সাথে আলাপ করতে আসেন উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক ও চোরাই সিন্ডিকেটের অপর সদস্য মো. মশিউর রহমান। তিনি এসে বিভিন্নভাবে পাচারের ঐ চাল বৈধ প্রমাণে ব্যর্থ হন। ঐ চালের কোন সরবরাহের চালান বা ডিউ কপি এসময় তিনি দেখাতে ব্যর্থ হন। তার নির্দেশেই আরআরএফ এর চাল বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। কিন্তু এই ২০ টন চাল আরআরএফ কে সরবরাহের জন্য বোঝাই করা হয়নি জানান তিনি। তবে কেন বোঝাই করা হয়েছে এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন তিনি কিছুই জানেন না। যা করার গুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. আবদুল্লাহ আল মামুন করেছেন। এসময় একাধিকবার ফোনে তার সাথে যোগাযোগ করা হলেও তিনি একেক বার একেক ঠিকানা দিয়ে এড়িয়ে গেছেন।

শেষ পর্যন্ত বিকেল ৩ টার দিকে ট্রাক বোঝাই চালের কোন বৈধ কাগজপত্র না দেখাতে পারায় মশিউর রহমান খানকে আটক করে র‌্যাব। এর কিছুক্ষণ পরেই হাজির হন সিন্ডিকেটের মূল হোতা গুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. আবদুল্লাহ আল মামুন। তিনি উপস্থিত হয়ে নতুন করে বিষয়টি বৈধ প্রমাণের চেষ্টা করে ব্যর্থ হন। তার উপস্থিতির পর উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মো. মশিউর রহমানকে সাময়িকভাবে ছেড়ে দেয় র‌্যাব সদস্যরা। আটককৃতদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য র‌্যাব কার্যালয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন র‌্যাব-৮ এর এএসপি কফিল। এসময় তিনি গুদামের হিসাব-নিকাশের বিভিন্ন প্রমাণপত্র যাচাই-বাছাইয়ের জন্য জব্দ করেন। বিষয়টি তদন্তের পর প্রকৃত ঘটনা বের হয়ে আসবে বলেও জানান তিনি।

তবে নির্ভরযোগ্য একটি সূত্র জানায়, ১০ টাকা দরে দরিদ্রদের জন্য সরকারের বরাদ্দকৃত চাল তাদের কাছে পুরোপুরি না পৌঁছে এর প্রত্যেকের বরাদ্দ থেকে একটু একটু করে চোরাইভাবে জমেছে এই গুদামে। হাজারো দরিদ্র মানুষের অধিকার ঠকিয়ে প্রায় ৫০ থেকে ৬০ টন চাল এই গুদামে বিভিন্ন সময় জমিয়েছে এই চোরাই চক্র। ঐ চালের মধ্য থেকে গতকাল পাচার হয়ে যাচ্ছিল ২০ টন চাল। সূত্রের জানানো এই তথ্যের প্রমাণ মিলেছে র‌্যাব সদস্যদের খোঁজাখুঁজিতে। বরিশাল সদর খাদ্য গুদামের হিসেবের চালের বাইরেও প্রায় ৫০ টন অতিরিক্ত পেয়েছেন তারা। ঐ চাল কোথা থেকে এসেছে এই প্রশ্নের কোন উত্তর দিতে পারেনি অভিযুক্ত কেউই। মূলত বিভিন্ন সময় সরকারের বরাদ্দকৃত চোরাই চালের স্তুপ এটি।

সূত্রটি আরও জানায়, যাদের আটক করা হয়েছে তারা পাচারের মাঠ পর্যায়ের কর্মী মাত্র। এই গুদামের সরকারি চাল পাচারে জড়িত রয়েছেন আবদুল্লাহ আল মামুন, মো. মশিউর রহমান সহ তাদের উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তারাও। আবদুল্লাহ আল মামুনের বিরুদ্ধে চাল পাচারের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। এমনকি আবদুল্লাহ আল মামুনের সাথে স্থানীয় কয়েকটি পত্রিকার সাংবাদিকদের সাথে সখ্যতা রয়েছে। বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, এসব সাংবাদিকদের তিনি মাসিক মাসোহারা দিয়ে থাকেন। আর মাসোহারার মাধ্যমে তিনি তার সকল অপকর্মকে আড়াল করে রাখেন। সরকারি মাল হরিলুটের মহোৎসব চলছে এদের মত কিছু ভদ্রবেশী চোরদের দ্বারা সৃষ্ট একটি চক্রের মাধ্যমে। প্রতিবছর এমনভাবেই শত শত টন চাল, গম এই চোরেরা গায়েব করে ফেলে যা সরকার থেকে বরাদ্দ হয়ে আসে স্বল্পমূল্যে হতদরিদ্রদের দোরগোড়ায় পৌছানোর জন্য।