এমভি বাঙালী’র কথিত সংস্কার বিআইডব্লিউটিসি’র দুই নৌযান গলার কাটা

বিশেষ প্রতিবেদক ॥ রাষ্ট্রীয় জাহাজ চলাচল প্রতিষ্ঠান-বিআইডব্লিউটিসির অর্ধ শতাধীক কোটি টাকা ব্যয়ে দুটি যাত্রীবাহী নৌযান সংগ্রহ করে লোকসানের বোঝা ক্রমশ ভাড়ী করলেও তা থেকে উত্তরণে দায়িত্বশীল মহলে তেমন কোন হেলদোল নেই। এমনকি এসব নৌযানের ‘পরিচালন লোকসান’ কমাতে অপেক্ষাকৃত কম লোকসানী নৌপথে পরিচালনারও কোন উদ্যোগ নেই। প্রায় ৫৬ কোটি টাকা ব্যয়ে সংগৃহীত এমভি বাঙালী ও এমভি মধুমতি নামের এসব নৌযানে যাত্রীদের ভ্রমনে স্বাচ্ছন্দ আনতেও বাস্তব কোন কর্মসূচী নেই। এর মধ্যে এমভি বাঙালী নামের নৌযানটির কিছু সংস্কার সহ যাত্রী সুবিধাসমূহ বৃদ্ধির (?) লক্ষ্যে গত ২৯ অক্টোবর থেকে নির্মাণ প্রতিষ্ঠান, চট্টগ্রামের ওয়েষ্টার্ন মেরিন শিপ বিল্ডার্সে রয়েছে। নৌযানটি ২৯ ডিসেম্বরের মধ্যে বিআডব্লিউটিসি’র কাছে হস্তান্তরের কথা থাকলেও আরো একমাস সময় বৃদ্ধি করে ৩১জানুয়ারির মধ্যে সব কাজ সম্পন্ন করার ওয়াদা করে তা চলতি ফেব্রুয়ারি মাসেও তা সম্ভব হচ্ছেনা। ইতোমধ্যে সংস্থার চেয়ারম্যান ও পরিচালক-কারিগরি সহ প্রকল্প পরিচালক কয়েক দফায় চট্টগ্রামে ডকইয়ার্ডে নৌযানটি পরিদর্শনও করেছেন।
১৯৭২ সালের ফেব্রুয়ারিতে কিছু পরিত্যক্ত ও আধা সরকারী নৌÑবাণিজ্য প্রতিষ্ঠান নিয়ে রাষ্ট্রীয় জাহাজ চলাচল প্রতিষ্ঠান বিআইডব্লিউটিসি গঠনের প্রায় ৪০ বছর পরে ২০১২ সালে সংস্থাটি দুটি নতুন যাত্রীবাহী নৌযান সংগ্রহে চট্টগ্রামের ওয়েষ্টার্ন মেরিন শিপ বিল্ডার্স-এর সাথে এমভি বাঙালী ও এমভি মধুমতি নামের দুটি নৌযান নির্মাণে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। তবে চুক্তির নির্ধারিত সময়ের প্রায় চারমাস পরে ২০১৪-এর মার্চে এমভি বাঙালী ও দেড় বছর পরে এমভি মধুমতি জাহাজটি গত বছর মে মাসের শেষভাগে বিআইব্লিউটিসি’র কাছে হস্তান্তর করে ওয়েস্টার্ন মেরিন। ২০১৪-এর ২৯ মার্চ এমভি বাঙালী ও গত বছর ১৪ জুলাই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এসব নৌযানের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনও করেন।
কিন্তু ২০১৪Ñএর ১০ এপ্রিল এমভি বাঙালী বাণিজ্যিক পরিচালনে যাত্রী পরিবহন শুরু করার পরেই এতে নানান অসংগতি ধরা পরে। নৌযানটিকে যাত্রী বান্ধব করে তৈরী করতে পারেনি বিআইব্লিউটিসি। এমনকি পুরো নৌযানটিকে একটি ‘গুদামঘর’ বলেও আখ্যা দিয়েছেন সাধারণ যাত্রীগণ। উপরন্তু নৌযানটির পরিচালন ত্রুটির কারণে এর প্রপেলার তিন দফায় খুলে নদীতে পড়ে গেছে। রাডার-সুকানও ছিল ত্রুটিপূর্ণ। তৃতীয় তলার কথিত প্রথম শ্রেণির কক্ষগুলো যাত্রী ভ্রমন উপযোগী ছিলনা।
এসব ত্রুটি বিচ্যুতি দূর করা সহ কিছু যাত্রী সুবিধা সম্প্রসারণের লক্ষ্যে নির্মাণ প্রতিষ্ঠানকে অনুরোধ করে বিআইডব্লিউটিসি। কিন্তু ২৬.৮০কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এমভি বাঙালী’র এসব সংস্কার কাজের জন্য নির্মাণ প্রতিষ্ঠানটি আরো ২.২২কোটি টাকা দাবী করেছে। বিআইডব্লিউটিসি নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন নিয়ে এ বাড়তি খরচ করে নৌযানটি সংস্কার সহ কিছুটা যাত্রী বান্ধব করতে সম্মতি দেয়ার পরও গত সাড়ে ৩ মাসে সে কাজ সম্পন্ন হয়নি। উপরন্তু নৌযানটি গতবছর ২৯ নভেম্বর ডকিং করার পরে এখনো এর তলা বা খোলর কাজ সম্পন্ন করা সহ রং-এর কাজটিও হয়নি। নির্মাণ প্রতষ্ঠানটি এখন পুরো নৌযানটি রং করার জন্য বাড়তি অর্থ দাবী করছে।
গত বৃহস্পতিবার সংস্থার চেয়ারম্যান ও পরিচালক সরেজমিনে এমভি বাঙালী পরিদর্শন করলেও নৌযানটি রং করার বিষয়ে কোন চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি এখনো। তবে ওয়েষ্টার্ণ মেরিন চলতি মাসের মধ্যে তলার অবশিষ্ট কাজ সম্পন্ন করে এমভি বাঙালীকে কর্ণফুলী নদীতে ভাসানের কথা জানিয়েছেন। মার্চের প্রথমভাগেই তারা নৌযানটি বিআইডব্লিউটিসি’র কাছে হস্তান্তরে আশাবাদী বলে গতকাল প্রতিষ্ঠানটির দায়িত্বশীল মহল থেকে বলা হয়েছে। তবে ১৫ মার্চের পরে নৌযানটি কর্ণফুলী হয়ে ভাটি মেঘনার সাগর মুখ অতিক্রম করতে না পারলে তা বরিশাল বা ঢাকাতে পৌছান অসম্ভব হয় পড়তে পারে। ১৫ মার্চ থেকে ঐ নৌপথটি ডেঞ্জার জোন হিসেবে চিহ্নিত সমুদ্র পরিবহন অধিদফতরের কাছে। ফলে সে সময়কালে অভ্যন্তরীণ রুটের কোন নৌযান ঐ নৌপথ অতিক্রমে বিধি নিষেধ থাকবে। ফলে ১৫ মার্চের মধ্যে বাঙালীকে ঢাকা বা বরিশালে ফিরিয়ে আনার কোন বিকল্প নেই।
তবে এসব সংস্কারের পরেও এমভি বাঙালী বা এমভি মধুমতি যাত্রী পরিবহন করে লোকসান এড়াতে পারছে না। মাত্র ২৪৮ ফুট দৈর্ঘের সাড়ে ৭’শ যাত্রী বহনাক্ষম এসব নৌযানে ঘন্টায় ২শ লিটার জ্বালানী প্রয়োজন। কিন্তু ধারন ক্ষমতার পূর্ণ যাত্রী নিয়ে চললেও নৌযান দুটি পরিচালন মুনফাও অর্জন করতে পারবে না বলে মনে করছেন বিআইডব্লিউটিসি’র দায়িত্বশীল মহল। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মহলটির মতে এসব নৌযানের হাল ও খোলের নকশার কারণে অনেক শক্তিশালী ইঞ্জিন সংযোজন করা হয়েছে। ফলে জ্বালানী ব্যয় বেড়ে গেছে। ফলে যাত্রীভাড়া দ্বিগুন করা হলেও এসব নৌযানের লোকসান এড়ানো যাবেনা। কারণ বেসরকারী নৌযানের চেয়ে বিআইডব্লিউটিসি’র যাত্রী ভাড়া বেশী হবার কারণে ইতোমধ্যেই সংস্থার আয়ে বিরূপ প্রভাব পড়েছে। বেসরকারী নৌযানসমূহ যেখানে ধারন ক্ষমতার অতিরিক্ত যাত্রী নিয়ে ঢাকাÑবরিশাল নৌপথে চলাচল করছে, সেখানে বিআইডব্লিইটিসি’র নৌযানে ক্ষমতার অর্ধেক যাত্রীও ভ্রমন করেনা। ভাড়া বেশী হবার পাশাপাশি এসব নৌযানের সময়সূচীও যাত্রী বান্ধব নয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
উপরন্তু এমভি বাঙালী ও এমভি মধুমতি’র মত মাত্রাতিরিক্ত জ্বালানী ব্যয়ের নৌযান তার নির্ধারিত রুটের পরিবর্তে ঢাকা থেকে বরিশাল হয়ে মোড়েলগঞ্জ পর্যন্ত অধিক দূরত্বে অল্প সংখ্যক যাত্রী নিয়ে চলাচল করায় লোকসানের বোঝা বৃদ্ধি পাচ্ছে। প্রতি ট্রিপে এসব নৌযানের লোকসান ৩ লক্ষাধীক টাকা বলে জানা গেছে। অথচ নৌযান দুটি যদি বেসরকারী নৌযানের সাথে প্রতিযোগিতা করে শুধুমাত্র ঢাকাÑবরিশাল নৌপথে যাত্রী চাহিদা অনুযায়ী উভয়প্রান্ত থেকে রাত ৯ টায় ছাড়া হয়, তাহলে লোকসান অন্তত অর্ধেকে নামিয়ে অনা সম্ভব বলে মনে করছেন ওয়াকিবহাল মহল। তবে প্রায় ৫৬ কোটি টাকার এসব ‘স্বেতহস্তী’ যাত্রী পরিবহনে না দিয়ে ঘাটে বেঁধে রাখলেই লোকসানের কোন ঝুঁকি নেই বলে দাবী দুষ্টু লোকদের।
এসব ব্যাপারে নৌযান দুটির প্রকল্প পরিচালক জানান, আমরা চেষ্টা করছি দ্রুততম সময়ের মধ্যে এমভি বাঙালীকে বাণিজ্যিক পরিচালনে ফিরিয়ে দিতে। তবে নৌযান দুটির অত্যাধিক জ¦ালানী ব্যয় সম্পর্কে তিনি কোন মন্তব্য করেন নি। পরিচালক কারিগরি ‘নৌযান দুটির নকশা যথাযথভাবে হয়নি বলেই বড় মাপের ইঞ্জিন সংযোজন করা হয়েছে’ এমন দাবীর সাথে দ্বিমত পোষন না করলেও কোন মন্তব্য করতে রাজী হননি। জিএম-বাণিজ্য জানান, লোকসান এড়িয়ে নৌযাগুলো চালানোর পথ খোঁজা হচ্ছে ।