এমএল ঐশী উদ্ধার ॥ সন্ধ্যা নদীতে লাশের মিছিল

রুবেল খান / কাওছার হোসেন বানারীপাড়ার সন্ধ্যা নদীতে ভেসে উঠছে একের পর এক মৃত দেহ। এমএল ঐশী নামের লঞ্চ ডুবির ঘটনায় নদীতে ভেসে উঠেছে শিশু সহ ৪ যাত্রীর লাশ। তবে দ্বিতীয় দিনের অভিযানে উদ্ধার হওয়া লাশের সংখ্যা ৬টি। সব মিলিয়ে উদ্ধার হওয়া লাশের সংখ্যা দাড়িয়েছে ২৪ জনে। বৃহস্পতিবার রাত পর্যন্ত পুলিশের তালিকায় আরো ৬ যাত্রী নিখোঁজ রয়েছে। এদিকে নদীতে নিমজ্জিত হওয়ার প্রায় ২২ ঘন্টা পর উদ্ধার করা হয়েছে ডুবে যাওয়া এমএল ঐশী প্লাস নামের লঞ্চটি। বিআইডব্লিউটিএ’র উদ্ধারকারী জাহাজ নির্ভিক এর মাধ্যমে লঞ্চটি উদ্ধার করা হয়। পরবর্তীতে সকাল সাড়ে ৯টায় লঞ্চ উদ্ধার কাজ সমাপ্ত ঘোষনা করেন জেলা প্রশাসন কর্তৃপক্ষ। অপরদিকে লঞ্চ ডুবির ঘটনায় পৃথক দুটি মামলা দায়ের করা হচ্ছে। এর মধ্যে পুলিশ বাদী হয়ে একটি ফৌজদারী মামলা এবং মেরিন আদালতে আরো একটি মামলা করবেন বিআইডব্লিউটিএ কর্তৃপক্ষ। ইতিমধ্যে মামলার কার্যক্রম শুরু হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। এর পূর্বে বৃহস্পতিবার ভোর ৪টার দিকে লঞ্চ ডবির ঘটনাস্থল বানারীপাড়ার দাসেরহাটের মসজিদবাড়ি ঘাটে পৌঁছায় উদ্ধারকারী জাহাজ ‘নির্ভীক’। পরে সকাল ৮টার দিকে উদ্ধারকাজ শুরু করেন। মাত্র ৪০ মিনিটে ডুবে যাওয়া লঞ্চটি উদ্ধারে সক্ষম হন বলে জানিয়েছেন নির্ভিক এর কমান্ডার রফিকুল ইসলাম। উদ্ধারের পর পরই সকাল সাড়ে ৯টার দিকে লঞ্চ উদ্ধার অভিযান সমাপন্ত ঘোষনা করা হয় বলে জানিয়েছেন অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিষ্ট্রেট মো. জাকির হোসেন।

বিআইডব্লিউটিএ’র বন্দর কর্মকর্তা ও অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত নৌ নিরাপত্তা ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা বিভাগের উপ-পরিচালক মোস্তাফিজুর রহমান জানান, বুধবার রাত ৯ টায় নৌ বাহিনীর লে. আরিফুর ইসলামের নেতৃত্বে ১৪ সদস্যের নৌ বাহিনীর সদস্য ঘটনাস্থলে পৌছে। বৃহস্পতিবার ভোর রাতে উদ্ধারকারী জাহাজ নির্ভীক ঘটনা স্থানে আসলে নৌবাহিনীর

সদস্য, ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি দল ও বিআইডব্লিটিএ’র কর্মিরা যৌথভাবে এ উদ্ধার অভিযান চালায়। তিনি বলেন, লঞ্চ ডুবির ঘটনায় আমাদের ফৌজদারী মামলা করার বিধান নেই। তবে এই ঘটনায় মেরিন আদালতে তারা বাদী হয়ে অবৈধ লঞ্চ নামধারী ট্রলারটির মালিক এবং সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হবে।

এদিকে ফায়ার সার্ভিসের উপ-পরিচালক মো. ফারুক হোসেন বলেন, সকাল পৌনে ৯টার দিকে লঞ্চটি উদ্ধারের সময় আরো চার শিশুর লাশ উদ্ধার করা হয়। তাছাড়া লঞ্চ উদ্ধার অভিযান শেষ হলেও নিখোঁজ যাত্রীদের উদ্ধারে অভিযান চলমান ছিলো। অভিযানে নৌ বাহিনীর সদস্যরাও ছিলো। তবে বিকালের পর পরই অভিযান বন্ধ করে দেয় ফায়ার সার্ভিস। তবে সকালের পরে রাত পর্যন্ত সন্ধ্যা নদীর বানারীপাড়া লঞ্চ ঘাট এলাকা সহ কয়েকটি স্থান থেকে শিশু সহ আরো ৬টি লাশ ভেসে ওঠে।

গতকাল বৃহস্পতিবার যে লাশ উদ্ধার হয়েছে তার মধ্যে উজিরপুরের মশাং গ্রামের মাইসা (৫) ও রাফি (৮),বানারীপাড়ার জিরাকাঠি গ্রামের সাফওয়ান (৩), রিয়াদ (৫) ও মারিয়া (৩) সহ ১০ জন।

বানারীপাড়া থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) জিয়াউল আহসান জানান, এমএল ঐশী প্লাস নামের লঞ্চ ডুবির ঘটনায় তালিকা অনুযায়ী এখনো ৫ যাত্রী নিখোঁজ রয়েছে। তবে সৈয়দকাঠী ইউপি চেয়ারম্যান আব্দুল মন্নান মৃধা বলেন, সাধারণত ওই সময় লঞ্চে যাত্রী বেশী থাকে। ঘটনার পর মাত্র ৪ জন যাত্রী সাতরে উপরে উঠতে পেরেছিলো। বাকী কয়েক জনকে জীবিত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। সে হিসেবে এখনো ১০ থেকে ১৫ জনের মত যাত্রী নিখোঁজ রয়েছে।

এর আগে বুধবার যাদের মৃত দেহ উদ্ধার করা হয়েছে তারা হলেন বানারীপাড়ার মসজিদ বাড়ি স্কুল এ্যান্ড কলেজের ৭ম শ্রেণীর শিক্ষার্থী মোঃ সাগর মীর (১৩),পূর্ব সৈয়দকাঠি গ্রামের রাবেয়া বেগম (৪৫),মসজিদবাড়ি গ্রামের মোজাম্মেল ওরফে মুজা মোল্লা (৬৫),জিরাকাঠি গ্রামের রেহানা বেগম (৩৫),সাতবাড়িয়া গ্রামের ফিরোজা বেগম (৫৫),রাহিমা বেগম(৬০) সৈয়দকাঠি গ্রামের সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত সার্জেন্ট মুক্তিযোদ্ধা আঃ রাজ্জাক,জিরাকাঠি গ্রামের মিলন ঘরামী(৩৫), কোহিনুর বেগম(৬৫) উজিরপুরের হারতা গ্রামের মাছ ব্যবসায়ী সুখদেব মল্লিক (৪৫), মশাং গ্রামের শান্তা(৮),নয়াকান্দি গ্রামের মোঃ জয়নাল হাওলাদার (৫৫), পূর্ব কেশবকাঠি গ্রামের নাফসি (৫), স্বরূপকাঠির আলকির হাট গ্রামের হিরা বেগম (২৫)।

এদিকে বানারীপাড়া উপজেলা চেয়ারম্যান আলহাজ্ব গোলাম ফারুক খবর পেয়ে ঢাকা থেকে ঘটনাস্থলে ছুঁটে এসে শোকার্ত স্বজনদের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে স্থাণীয় ইউপি চেয়ারম্যান আঃ মন্নান মৃধার কাছে নিহতদের প্রত্যেক পরিবার’র জন্য ৫ হাজার টাকা করে দেড় লাখ টাকা দেন অর্থ সহায়তা প্রদান করেন। এর পূর্বে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ১০ হাজার টাকা করে অর্থ সহায়তা প্রদান করা হয়।

উল্লেখ্য বুধবার বেলা সোয়া ১১টার দিকে বানারীপাড়া থেকে উজিরপুরের হাবিবপুরের উদ্দ্যেশে যাবার পথে অনুমোদন বিহীন ঐশি- প্লাস নামক লঞ্চটি সৈয়দকাঠির মসজিদ বাড়ি গ্রামের দাসেরহাট বাজার সংলগ্নে সন্ধ্যা নদীতে ডুবে যায়।