এবার ফেঁসে যাচ্ছেন শেবাচিম’র সাবেক পরিচালক ডাঃ সিরাজ ॥ তদন্ত কমিটি গঠন

নিজস্ব প্রতিবেদক ॥ শেবাচিম হাসপাতালের অবসরকালীন ছুটিতে (এলপিআর) যাওয়া পরিচালক ডা. এসএম সিরাজুল ইসলামের দুর্নীতি খোঁজে তদন্ত শুরু হচ্ছে। নিয়োগ, চুক্তিভিত্তিক প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে মাসোয়ারা গ্রহন, টেন্ডার এবং ভারি যন্ত্রপাতি ক্রয় নিয়ে গনমাধ্যমে প্রকাশিত দুর্নীতির অভিযোগ তদন্তে গঠন করা হয়েছে ৩ সদস্য বিশিষ্ট উচ্চ পর্যায়ের কমিটি। যার নেতৃত্বে থাকবেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যান মন্ত্রনালয়ের একজন যুগ্ম সচিব। ডা. সিরাজুল ইসলামের বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ প্রমান সংগ্রহ এবং তদন্তের জন্য কমিটিকে এক মাসের সময় বেঁধে দেয়া হয়েছে। গতকাল সোমবার স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যান মন্ত্রনালয়ের হাসপাতাল শাখার অতিরিক্ত সচিব হাবিবুর রহমান খান এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তবে তৎক্ষনিকভাবে তদন্ত কমিটিতে থাকা তিন কর্মকর্তার নাম জানাতে পারেননি তিনি। সূত্রমতে, শেবাচিম হাসপাতালের পরিচালক হিসেবে যোগদানের পর পরই দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েন সদ্য বিদায়ী পরিচালক ডা. এসএম সিরাজুল ইসলাম। বিশেষ করে বাতিল হওয়া ৯ কোটি টাকার ভারী যন্ত্রপাতি ক্রয় টেন্ডারের মালামাল অবৈধভাবে গ্রহনের বিষয়টি বেশ আলোচনার সৃষ্টি হয়। ঠিকাদারের সাথে আতাঁত করে কোটি টাকা উৎকোচের বিনিময়ে বাতিল হওয়া টেন্ডারের বিল পরিশোধের চেষ্টা করেন তিনি। প্রথম পর্যায়ে একক ক্ষমতায় ঠিকাদারী বিল তৈরী করে তা হিসাব নিয়ন্ত্রক এর কাছে জমা দেন। এ নিয়ে পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশের পরে এবং মন্ত্রনালয়ের অনুমতি না থাকায় জেলা হিসাব নিয়ন্ত্রক অবৈধ বিলে স্বাক্ষর করেননি। তাছাড়া সর্বশেষ কোটি টাকার চুক্তিতে পরিচালক ডা. সিরাজুল ইসলাম মন্ত্রনালয়ের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের পাশ কাটিয়ে শুধুমাত্র লাইন ডিরেক্টরের মাধ্যমে অর্থ বরাদ্দ এনে বাতিল হওয়া টেন্ডারের মালামালের বৈধতা দেয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু শেবাচিম হাসপাতালের একাউন্স অফিসার, স্টোর অফিসার সহ অন্যান্য কর্মকর্তারা ডা. সিরাজুল ইসলামের অনৈতিক প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় শেষ পর্যন্ত তার সেই চেষ্টাও ব্যর্থতায় রুপ নেয়।
হাসপাতালে খোঁজ নিয়ে জানাগেছে, শুধুমাত্র বাতিল হওয়া ৯ কোটি টাকার টেন্ডার নিয়েই দুর্নীতি নয়, প্রতিটি ধাপেই দুর্নীতিতে করেন পরিচালক ডা. এসএম সিরাজুল ইসলাম। একজনের নাম ভাঙ্গিয়ে রক্ত পরিসঞ্চলন কেন্দ্রে নীতি মালা উপেক্ষা করে তিন জনকে নিয়োগ প্রদান, ঠিকাদারদের কাছ থেকে পার্সেন্টিজ গ্রহন, ওষুধ কোম্পানি থেকে উপঢৌকন গ্রহন, চিকিৎসকদের কাছ থেকে বদলি বানিজ্য সহ নানান দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে বিদায়ী পরিচালক ডা. এসএম সিরাজুল ইসলামের বিরুদ্ধে। হাসপাতালের দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, বিদায়ী পরিচালক ডা. এসএম সিরাজুল ইসলাম পথ্য বিভাগের দরপত্রের মাধ্যমে কয়েক লাখ টাকার বানিজ্য করেছেন। পথ্য বিভাগে বহুজাতিক ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান অংশগ্রহন করলেও দীর্ঘ বছরের আলোচিত সেভেন স্টার গ্রুপকেই দরপত্রের কার্যাদেশ পেতে সহযোগিতা করেছেন তিনি। এজন্য তাদের কাছ থেকে মোটা অংকের উৎকোচ পেয়েছেন পরিচালক। তাছাড়া হাসপাতালে চুক্তি ভিত্তিক জনবল সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান থেকেও পার্সেন্টিজ গ্রহন করতেন তিনি। নির্ধারিত সংখ্যক জনবল সরবরাহ না করে এবং শ্রমিক আইন উপেক্ষা করার অজুহাতে ঠিকাদারের বিল আটকে রেখে পার্সেন্টিজ আদায় করেন তিনি। হাসপাতালে নিয়োগ দুর্নীতির কারনে বঞ্চিত হওয়া কর্মচারীদের সরকারের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে যোগসাজশ, কাজ না করেই ঠিকাদারের বিল পাশ করিয়ে দেয়া সহ আরো এন্তার অভিযোগ রয়েছে ডা. সিরাজুল ইসলামের বিরুদ্ধে। এছাড়া দুর্নীতি এবং অনিয়মের প্রতিবাদ করতে গিয়ে তিন নার্সের হয়রানির অভিযোগও খতিয়ে দেখবে মন্ত্রনালয়ের তদন্ত টিম। যেসব ডাক্তার ও নার্স তার মতের বাইরে যেতেন তাদেরকে বদলি অথবা হয়রানির চেষ্টা করতেন তিনি।
সূত্রগুলো আরো জানায়, এসব অভিযোগের বাইরে সরকারি ওষুধ পাঁচারের সাথে সম্পৃক্ততার অভিযোগও রয়েছে ডা. এসএম সিরাজুল ইসলামের বিরুদ্ধে। এসব করে কোটিপতি বনে গেছেন ডা. এসএম সিরাজুল ইসলাম। তিনি দুর্নীতির কারনে শেষ পর্যন্ত বিদায়ের বেলায় সহকর্মীদেরও কাছে পাননি বলে অভিযোগ রয়েছে।
তদন্ত কমিটির গঠনের বিষয়ে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যান মন্ত্রনালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. হাবিবুর রহমান খান বলেন, পত্রিকায় প্রকাশিত বিভিন্ন অনিয়ম, দুর্নীতি’র তথ্য সহ কর্মক্ষেত্রে বিদায়ী পরিচালক ডা. এসএম সিরাজুল ইসলামের অনিয়ম এবং দুর্নীতি রয়েছে কিনা তা খতিয়ে দেখতে তিন সদস্য’র কমিটি গঠন করা হয়েছে। মন্ত্রনালয়ের উচ্চ পর্যায়ের এই তদন্ত কমিটি আগামী এক মাসের মধ্যে শেবাচিম হাসপাতাল পরিদর্শনে আসবেন। তারা সরেজমিন থেকে সংশ্লিষ্টদের সাক্ষ্য গ্রহন এবং দুর্নীতির অভিযোগের বিষয়ে তথ্য উপাথ্য সংগ্রহ করবেন বলে জানিয়েছেন মন্ত্রনালয়ের ওই জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা।