এতিমখানার ব্যয় শিশুদের পথে নামিয়ে আয়

জুবায়ের হোসেন/সিদ্দিকুর রহমান ॥ সরকারি সাহায্যের অপর্যাপ্ত দাবি করে নগরী ও আশপাশের জেলা উপজেলার সহ¯্রাধীক এতিম শিশুদের দিয়ে টাকা উত্তোলন করানো হচ্ছে। এক প্রকার বাধ্য করে এতিম খানা কর্তৃপক্ষ শিশুদের দিয়ে এসব কাজ করাচ্ছে বলে তথ্যানুসন্ধানে জানা গেছে। ভয়ভীতি এমনকি শারীরিক নির্যাতন করে এমন কাজ করা হয় নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে।
যা বন্ধ করা প্রয়োজন বলে এতিমখানা, মাদ্রাসা ও লিল্লাহ বোর্ডিং পরিচালনায় দায়িত্বরতরা স্বীকার করেছেন। এসব বন্ধে যাদের এগিয়ে আসার কথা সেই সমাজ সেবা দপ্তরের কর্মকর্তারা ব্যর্থতার দায় নি¤œ পদের কর্মকর্তাদের উপর চাপিয়ে দিচ্ছে। প্রতি মাসে তদারকি নিয়ম বছরে পালন করে ওই দপ্তর। নিবন্ধন বিহীন এতিমখানাগুলো এমন অপরাধে জড়িত থাকলেও তাদের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না।
এই কর্মে জড়িত শিশুরা জানিয়েছে, প্রতি সপ্তাহে ২ থেকে ৩ দিন এলাকা ভাগ করে তাদের সাহায্যের নামে টাকা উত্তোলনে পাঠানো হয়। শিক্ষকরা ৩ থেকে ৪ জন শিশুকে নিয়ে একটি দল তৈরি করে দেয়। তাদের তত্ত্বাবধানে থাকে মাদ্রাসার শিক্ষক ও জ্যেষ্ঠ ছাত্ররা।
প্রত্যেক দলকে টাকা উত্তোলনের নির্দিষ্ট অংক নির্ধারন করে দেয়া হয়। ওই পরিমান টাকা যেভাবে হোক নিয়ে প্রতিষ্ঠানে নিয়ে ফিরতে হয়। নগরীতে বিশেষ করে বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠানের পূর্বে এবং জেলা উপজেলায় প্রায় প্রতিদিন সাহায্যের নামে এই অপরাধ হয়।
অভিযোগ রয়েছে, প্রতিটি দল টাকা নিয়ে ফেরার পর শিক্ষকরা তাদের কাছ থেকে নিয়ে নেয়। টাকা গোপন করার সন্দেহে তাদের নগ্ন করেও তল্লাশী করা হয়।
তারা টাকা গোপন রাখা বা যেতে অস্বীকার করতে না পারে সেই জন্য আতংকিত রাখতে সামান্য অজুহাতে শিশুদের নির্যাতন করা হয়। এমন অভিযোগের বেশির ভাগ গলির এতিম খানা, লিল্লাহ বোর্ডিংয়ের বিরুদ্ধে থাকলেও স্বনামধন্যরাও বাদ নেই।
সমাজ সেবা অধিদপ্তরের সূত্রে জানা যায়, বরিশাল জেলায় সরকার নিবন্ধিত ইয়াতিম খানা, মাদ্রাসা ও লিল্লাহ বোর্ডিং এর সংখ্যা ১২৮টি। এর মধ্যে সক্রিয় আছে ১০০টি। এর মধ্যে অনুদানের জন্য ৯৪টি লিল্লাহ বোর্ডিং ও মাদ্রাসার তালিকা ঢাকা সমাজ সেবা অধিদপ্তরে প্রেরণ করা হয়েছে। এই মাদ্রাসাগুলোতে ৩ হাজারের বেশি ইয়াতিম শিশু রয়েছে। সরকারি নিয়মানুযায়ী আবেদনকৃত প্রতিষ্ঠান যদি অনুদানের অনুমোদন পায় তাতে তা পাবে এর অর্ধেক বা তার কম ছাত্ররা। এতিখানায় প্রতি ছাত্র অনুদন হিসেবে প্রতি মাসে১ হাজার টাকা করে পায়। এটি খুব সামান্য পরিমাণ তবে তাদের অধিকাংশই স্থানীয়ভাবে প্রায় সকলের কাছ থেকেই কম বেশি অনুদান পায়। এছাড়া নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানগুলোর শিক্ষকদের বেতনও দেয় সরকার।
অন্যদিকে নিবন্ধন বিহীন অনেক এতিম খানা, মাদ্রাসা ও লিল্লাহ বোর্ডিং রয়েছে যাদের ব্যাপারে কোন তথ্যই নেই সমাজ সেবা অধিদপ্তরের কাছে। সরেজমিনে ওই সকল নিবন্ধন বিহীন প্রতিষ্ঠানগুলোতে গিয়েও মিলেছে ছাত্রদের অভিযোগের সাদৃশ্যতা। অন্যদিকে নিবন্ধন প্রাপ্ত যারা এমন কাজ করে তাদের দাবী সরকারের বরাদ্দে হয় না কিছুই।
দ্রব্যমূল্যের বৃদ্ধির কারনে নানা সমস্যা তাদের। এই সকল সমস্যা স্থানীয় সাহায্য ও সরকারের দেয়া বরাদ্দে পূরণ হয়না। তাই তাদের ছাত্রদের দিয়ে সাহায্যের আবেদন করান। এটি ভিক্ষাবৃত্তি কিনা এই প্রশ্নের জবাবে তারা বলেন সাহায্য আর ভিক্ষা এক নয়। অন্যদিকে ২০১৩ সালের শিশু আইনে এমন কাজ করা এবং এমন কাজে উৎসাহ দেয়ার সর্বোচ্চ শাস্তি ৫ বছরের সশ্রম কারাদন্ড ও অনাদায়ে ১ লক্ষ টাকা জরিমানার আইনটি তারা জানেনই না।
সাগরদী জামিয়া ইমলামিয়া মাদ্রাসার অধ্যক্ষ আশরাফ আলী দেওয়ান বলেন, এটি পুরোই অনৈতিক কাজ। যারা এমন করে থাকেন তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া সহ বন্ধের জন্য সংশ্লিষ্টদের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া উচিত।
সমাজ সেবা অধিদপ্তরের বরিশাল অঞ্চলের উপ-পরিচালক মনোজ কুমার ঘরামি বলেন, সরকার নিবন্ধিত ইয়াতিম খানা, মাদ্রাসা ও লিল্লাহ বোর্ডিংগুলো এমনটা করে না। যারা করে তারা নিবন্ধনের বাইরে। বাইরের কেউ কিছু করলে তা তাদের দেখার বিষয় না। তবে গুরুতর অভিযোগ থাকলে তারা পর্যবেক্ষন করবেন। দু একটি উপজেলার স্বনামধন্য কিছু প্রতিষ্ঠানের এমন কাজ করার উদাহরন দিলে তিনি বিষয়টি উপজেলার দায়িত্বে থাকা কর্তাদের মাথায় চাপিয়ে গেছেন।