একাডেমিক ভবন রক্ষায় নার্সিং শিক্ষার্থীদের আন্দোলন অব্যাহত অধ্যক্ষ অবরুদ্ধ, সংবাদ সম্মেলন ও স্মারকলিপি পেশ ॥ কঠোর আন্দোলনের হুমকি

নিজস্ব প্রতিবেদক॥ দীর্ঘ বছর পর পাওয়া নব নির্মিত একমাত্র একাডেমিক ভবন রক্ষার দাবীতে আন্দোলন অব্যাহত রেখেছে বরিশাল নার্সিং কলেজ শিক্ষার্থীরা। আন্দোলন কর্মসূচীর অংশ হিসেবে গতকাল বুধবার বিক্ষোভ সমাবেশের পাশাপাশি অধ্যক্ষকে অবরুদ্ধ, সংবাদ সম্মেলন, জেলা প্রশাসক ও পুলিশ কমিশনারের কাছে স্মারক লিপি দিয়েছে তারা। বিকেলে বরিশাল প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলনে দাবী না মানা হলে বড় ধরনের আন্দোলনের হুমকি দিয়েছে শিক্ষার্থীরা। একই সাথে উদ্ভুত ও অনাকাংখিত পরিস্থিতি সৃষ্টিতে উস্কানী এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনে ব্যর্থতার অভিযোগে বরিশাল নার্সিং কলেজ অধ্যক্ষ আলেয়া পারভিন ও প্রশিক্ষক আলী আজগরকে বদলী করা হয়েছে বলেও সংবাদ সম্মেলনে দাবি করা হয়েছে। তবে এর সত্যতা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। সূত্রমতে শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ ছাত্রী নিবাস বসবাসে ঝুকিপূর্ন হওয়ায় পার্শ্ববর্তী নার্সিং কলেজের নব নির্মিত একমাত্র একাডেমিক কাম প্রশাসনিক ভবনটি সাময়িক সময়ের জন্য ছাত্রীনিবাস করার প্রস্তুাব রাখে কলেজ কর্তৃপক্ষ। এ বিষয়ে তারা মন্ত্রনালয়ে চিঠি দেয়ার পরে গত ১৫ মার্চ স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক নার্সিং কলেজের একাডেমিক ভবন পরিদর্শন করে ছাত্রীদের ব্যবহারের জন্য অনুমতি দেয়া হয়।
মহাপরিচালকের এমন সিদ্ধান্তের পর পরই বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে নার্সিং কলেজ শিক্ষার্থীরা। ১৫ মার্চ সন্ধ্যায় তারা তাদের একমাত্র একাডেমিক ভবনটি রক্ষায় বিক্ষোভ মিছিল শেষে অবস্থান কর্মসূচী ও বিক্ষোভ সমাবেশ শুরু করেন।
এদিকে আন্দোলনের তৃতীয় দিন বুধবার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রন এবং নিরসনের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহনের নির্দেশ দিয়ে বরিশাল নার্সিং কলেজ, পুলিশ সুপার, মেডিকেল কলেজ অধ্যক্ষ, হাসপাতালের পরিচালকসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরে চিঠি দিয়েছে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যান মন্ত্রনালয়ের নার্সিং শাখার জ্যেষ্ঠ সহকারী সচিব মো. লুৎফুর রহমান। আদেশের পরিপ্রেক্ষিতে সকালে নার্সিং কলেজ অধ্যক্ষ আলেয়া পারভিন শিক্ষার্থীদের ডেকে আন্দোলন স্থগিতের নির্দেশ দেন। এতে শিক্ষার্থীরা ক্ষুব্ধ হয়ে অধ্যক্ষকে তার কার্যালয়ের ভেতরে তালা দিয়ে অবরুদ্ধ করে। এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত (রাত ১০ টা) অধ্যক্ষ অবরুদ্ধ।
এদিকে, শিক্ষার্থীদের একটি প্রতিনিধি দল দাবী আদায়ের বিষয়ে জেলা প্রশাসক মো. শহীদুল আলম ও মহানগর পুলিশ কমিশনার শৈবাল কান্তি চৌধুরীর সাথে দেখা করে স্মারক লিপি দিয়েছে। এ বিষয়ে মেডিকেল কলেজ অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. ভাস্কর সাহা জানান, মন্ত্রনালয়ের চিঠি পেয়ে দুপুরে একাডেমিক কাউন্সিলের জরুরী সভা করেন তারা। সভা শেষে দুপুর ২টার দিকে জেলা প্রশাসনের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট কাজী হোসনেআরার নেতৃত্বে তিনি (অধ্যক্ষ), পুলিশের সহকারী কমিশনার (কোতয়ালী) কাজী আব্দুল কাইয়ুম এবং ওসি শাখাওয়াত হোসেন সহ একটি প্রতিনিধি দল নার্সিং কলেজে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনের চেষ্টা করেন। কিন্তু নার্সিং শিক্ষার্থীরা তাদের দাবিতে অটল থাকায় নার্সিং কলেজ অধ্যক্ষের দেখা করতে না পেরে ফিরে আসা হয়েছে। আজ পূনরায় একাডেমিক কাউন্সিলের সভায় সিদ্ধান্ত নেয়া হবে বলেও জানান তিনি।
অপরদিকে বিকাল ৪টায় বরিশাল প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করেন শিক্ষার্থীরা। সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন নার্সিং ছাত্রী সম্পা বৈদ্য। লিখিত বক্তব্যে তিনি বলেন, ১৯৭০ সালে ১৬০টি আসন নিয়ে পথচলা শুরু করে বরিশাল নার্সিং ইনস্টিটিউট। তখন চার বছর মেয়াদী ডিপ্লোমা ইন নার্সিং কোর্সে প্রতি ব্যাচে ৪০ জন করে মোট ১৬০ জন শিক্ষার্থী ভর্তি হত। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২০১০ সালে ইনস্টিটিউটটিকে নার্সিং কলেজে উন্নিত করা হয়। এর পর থেকে প্রতি ব্যাচে ১০০ জন করে মোট ৪০০ জন বিএসসি ও ধাত্রি বিধ্যায় ২৫ জন করে শিক্ষার্থী ভর্তি করা হয়।
ছাত্র-ছাত্রী বাড়লেও বাড়েনি ছাত্রী নিবাসের আসন সংখ্যা। ১৬০টি আসনের স্থলে ৫৫০ জন শিক্ষার্থী বসবাস করতে হয়। তার মধ্যে ছিলো না লেখাপড়া এবং প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য আলাদা কোন ব্যবস্থা। ছাত্রী নিবাসের নিচ তলায় ঘন্টার পর ঘন্টা দাড়িয়ে থেকে ক্লাস করতে হতো তাদের। শম্পা বৈদ্য আরো বলেন, এমন পরিস্থিতিতে দেশের বিভিন্ন স্থানের ন্যায় বরিশাল নার্সিং কলেজে একাডেমিক ভবন নির্মান করে দেয় সরকার। গত ৩ মার্চ ভবনটি গনপূর্ত বিভাগ তাদের কাছে হস্তান্তর করে। কিন্ত এক মাস যেতে না যেতেই তাদের একমাত্র একাডেমিক ভবনটি কেড়ে নেয়ার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছে মেডিকেল কলেজ কর্তৃপক্ষ। তারা পড়া শুনার ভবনটিকে হোস্টেলে পরিনত করতে চাইছে। তাদের এই ষড়যন্ত্রের হাত থেকে একাডেমিক ভবনটি রক্ষার্তেই আমরা আন্দোলন করছি। দাবী মেনে না নিলে পরবর্তীতে আরো কঠোর কর্মসূচী দেয়া হবে বলেও সংবাদ সম্মেলনে হুশিয়ারী উচ্চারন করেন সম্পা। এসময় উপস্থিত ছিলেন- নার্সিং শিক্ষার্থী পারভেজ কবির, সেতু রানী মল্লিক, সুবর্ণা হালদার, মাকসুদা আক্তার ও মহিউদ্দিন। নার্সিং কলেজ ছাত্রী সুস্মিতা মল্লিক পরিবর্তনকে জানান, পূর্বে ১৯৮৩ এবং ১৯৮৫ সালে মেডিকেল কলেজ কর্তৃপক্ষ নার্সিং হোস্টেলটি মেডিকেল কলেজ ছাত্রীদের সাময়িক সময় বসবাসের জন্য নিয়েছিল। কিন্তু তখন হোষ্টেলটি এক প্রকার দখলে চলে গিয়েছিলো। মাত্র দুই মাসের জন্য নিলেও তখন দুই বছর পরে হোস্টেলটি দখল মুক্ত করা হয়। সুস্মিতা বলেন, আমরা হলে ঝুকি নিয়ে থাকছি। অনেক সময় ভবনের পলেস্তরা খড়ে পড়ে ছাত্রীরা আহত হয়েছে। কিন্তু তাতে কারো কর্ণপাত হয়নি। এখন মেডিকেল কলেজ ছাত্রীরা থাকতে পারছে না সেজন্য আমাদের একাডেমিক ভবন কেড়ে নিতে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছে। দীর্ঘ প্রতিক্ষার পরে পাওয়া আমাদের একমাত্র একাডেমিক ভবনটি কিছুতেই হাত ছাড়া হতে দেয়া যাবে না। এজন্য প্রয়োজন বড় ধরনের আন্দোলন গড়ে তোলা হবে। ছাত্রীদের সংবাদ সম্মেলনে করা বদলির অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে নার্সিং কলেজ অধ্যক্ষ আলেয়া পারভিন এবং প্রশিক্ষক আলী আজগর বলেন, আমরাও বিষয়টি শুনছি। তবে রাত পর্যন্ত কোন চিঠি পাননি বলে তারা নিশ্চিত করেন।