উৎসবমুখর পরিবেশে জেল খাল পরিচ্ছন্নতা কর্মসূচিতে সর্বস্তরের জনগনের অংশগ্রহণ

সিদ্দিকুর রহমান ॥ “আমাদের দেশে হবে সেই ছেলে কবে? কথায় না বড় হয়ে কাজে বড় হবে”। কবি কুসুম কুমারী দাশের লেখা কবিতার এই অংশটি বরিশালের আপামর সাধারন জনগন সত্যতে পরিণত করে ঐতিহ্যবাহী জেল খালটি পরিস্কার পরিচ্ছন্নতা কাজে স্বতস্ফুর্ত অংশগ্রহণ করে বরিশালের বুকে ইতিহাস রচনা করেছেন। এই কার্যক্রমে উপস্থিত থেকে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক এমপি বলেন, প্রাচ্যের ভেনিস খ্যাত এই বরিশালের লাইফ লাইন ছিল ঐতিহ্যবাহী এই জেল খালটি। কিন্তু কালের বিবর্তনে এটি হারিয়ে যেতে বসেছিল। বরিশালের জেলা প্রশাসক ড. গাজী মো. সাইফুজ্জামানের উদ্যোগ এবং সাধারণ জনগনের সহযোগিতায় আবার এই খালটি তার প্রাণ ফিরে পেতে চলেছে। গতকাল শনিবার সকাল ১০ টায় নগরীর নথুল্লাবাদের ১নং পয়েন্টে “জনগনের জেলখাল: আমাদের পরিচ্ছন্নতা অভিযান” কর্মসূচির ইধৎরংধষ ভন ঞা তে সরাসরি সম্প্রচার কার্যক্রমের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি একথা বলেন। এসময় তিনি আরো বলেন, বরিশালের এই ঐতিহাসিক কাজে অংশগ্রহণ করতে পেরে নিজেকে ধন্য মনে করছি। বরিশাল ফেসবুক টিভিতে পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম সরাসরি সম্প্রচারের ব্যাপারে তিনি বলেন, বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা অনুযায়ী প্রত্যেক জেলার জেলা প্রশাসকই নতুন নতুন উদ্ভাবনী কাজ করে যাচ্ছে। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক ব্যবহার করে সামাজিক এবং সরকারি সকল অনুষ্ঠান সারাবিশ্বে সরাসরি ছড়িয়ে দেয়ার এই নতুন উদ্ভাবন সারা বাংলাদেশের মধ্যে বরিশালের জেলা প্রশাসক এক উজ্জল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। এসময় তিনি আরো বলেন, বর্তমানে এই দেশে ২ থেকে ৩ কোটি যুব সমাজ ফেসবুক ইউজার রয়েছে। এছাড়াও বরিশালেও লক্ষ লক্ষ যুব সমাজ এই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক ব্যবহার করছে। যারা কিনা আগামীর ভবিষ্যৎ- দেশ গড়ার কারিগর। জেলা প্রশাসকের এই নতুন উদ্ভাবন যুব সমাজকে অনুপ্রাণিত করবে। তারা নানা সামজিক কাজে অংশগ্রহণ করে দেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবে। এছাড়াও এই উদ্ভাবনটি সকলের কাজে আসবে এবং সরকারি কর্মকর্তারা জনসাধারণ এর সংস্পর্শে এসে তাদের দ্বোরগোড়ায় সেবা পৌছে দেয়া এবং সেবা প্রদানের মান আরও বৃদ্ধি করতে পারবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক এমপি। প্রতিমন্ত্রী বলেন, এই তিলোত্তমা বরিশালের রুপকার সাবেক সিটি মেয়র ও সাংসদ অ্যাড. শওকত হোসেন হিরন। যার কঠোর পরিশ্রমে এই বরিশাল ফিরে পেয়েছিল এক নতুন রুপ। তিনি এই বরিশালকে ইতালির ভেনিস শহরে রুপান্তরের লক্ষ্যে কাজ করে ছিলেন। কিন্তু পরবর্তীতে তার মৃত্যুর ফলে সেটি আর সম্ভব হয়নি। কিন্তু বর্তমান জেলা প্রশাসক এই জেলখাল পুনরুদ্ধার এবং এর পুরোনো যৌবন ফিরিয়ে দিতে বরিশালের সর্বস্তরের জনগণকে সাথে নিয়ে ঘটিয়েছেন বরিশালের ইতিহাসে নয়া বিপ্লব। একই সাথে প্রমাণ করেছেন জনসম্পৃকততার বিকল্প নেই, জনসম্পৃকততাই পারে অসম্ভবকে সম্ভব করতে। এর আগে জেলা প্রশাসক ড. গাজী মো. সাইফুজ্জামানের সভাপতিত্বে জেলখালের পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন বরিশাল-৫ আসনের সাংসদ জেবুন্নেছা আফরোজ।
এসময় তিনি তার বক্তব্যে বলেন, বরিশাল নগরী এবং জেল খাল যেন একে অপরের পরিপূরক। একটিকে ছাড়া অন্যটি যেন অর্থহীন, এতটাই গুরুত্বপূর্ণ এই জেল খাল। নগরীর এই গুরুত্বপূর্ণ খালটি যে হারিয়ে যেতে বসেছিল। প্রায় বিলুপ্ত হয়েছিল এটির অবস্থান। আর কয়েক বছর এভাবে অবহেলায় চলে গেলেই ইতিহাস হয়ে যেত এই জেল খাল। তখন হয়ত নগরবাসী জেলখালের স্মৃতিচারণ করতো। আর তাই জেলখালের গুরুত্ব অনুধাবন করতে পেরে বরিশালের জেলা প্রশাসক এটিকে দখলদারদের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য নিয়েছেন ঐতিহাসিক পদক্ষেপ। একই সাথে বরিশাল নগরীর সকল জনসাধারণের মনে স্থান করে নিয়েছেন তিনি। বিষয়টি যেন এমন-জেল খাল পরিচ্ছন্নতা অভিযান তথা বরিশালের জেলা প্রশাসক ড. গাজী মোঃ সাইফুজ্জামান। জেল খাল উদ্ধারের এই উদ্যোগ গ্রহণের জন্য জেলা প্রশাসক এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ধন্যবাদ জানান তিনি। এছাড়াও ভবিষ্যতে যেন এই রকম সামজিক কাজ আরও বৃদ্ধি পায়, সে লক্ষ্যে সকলকে এগিয়ে আসার আহবান জানান তিনি।
এদিকে বেলা ১১টায় পরিচ্ছন্নতা অভিযানে অংশ নিতে আসেন স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের সচিব আব্দুল মালেক। এসময় তিনি বলেন, বরিশাল বাংলাদেশের প্রাচীনতম একটি অঞ্চল। আজকে জেল খাল পরিচ্ছন্নতার অভিযান প্রতিটি জেলা, বিভাগ এমনকি রাজধানী অনুসরন করবে। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী দক্ষিণাঞ্চলের উন্নয়নের জন্য কাজ করছেন। এখানকার কোন প্রকল্প দেয়ার সাথে সাথে তিনি অনুমোদন দেন। জেল খান উন্নয়নে ২৫ কোটি টাকার একটি প্রকল্প দেয়ার জন্য জেলা প্রশাসক ড. গাজী মোঃ সাইফুজ্জামান অনুরোধ জানালে সচিব আব্দুল মালেক বলেন, জেল খাল উন্নয়নে ২৫ কোটি টাকার প্রকল্প শীঘ্রই অনুমোদন হবে।
এদিকে জেল খাল পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম পরিদর্শনকালে সিটি মেয়র আহসান হাবীব কামাল বলেন, ঐতিহ্যবাহী জেল খালটি পরিচ্ছন্ন করতে সিটি কর্পোরেশনের সকল কাউন্সিলরবৃন্দ এবং সকল শাখার কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা অক্লান্ত পরিশ্রম করেছে। এছাড়াও তিনি বলেন, সামাজিক যে কোন কর্মকান্ডে সিটি কর্পোরেশন কর্তৃপক্ষ সবসময় পাশে ছিল এবং ভবিষ্যতেও থাকবে।
অন্যদিকে জেল খালের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তব্যে জেলা প্রশাসক ড. গাজী মো. সাইফুজ্জামান বলেন, এই জেল খাল জনগনের সম্পত্তি। তাই এই জেল খালের পুরনো ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে জনগনের স্বতস্ফুর্ত অংশগ্রহণ আমাকে অভিভূত করেছে। আমি আশা করছি ভবিষ্যতে যেকোন সামাজিক কার্যক্রমে জনগনকে পাশে পাবো।
এদিকে সকাল ১০ টায় শুরু হওয়া জেল খাল পরিচ্ছন্নতা অভিযান শেষ হয় দুপুর দেড় টায়। পুরো সাড়ে পাঁচ ঘণ্টা জেল খালের দুই পাড় জুড়ে ছিল এক উৎসবের আমেজ।
জেলা প্রশাসন এবং সিটি কর্পোরেশন সূত্রে জানা গেছে, নগরীর নথুল্লাবাদ থেকে কীর্তনখোলা নদী পর্যন্ত জেল খালের দৈর্ঘ্য ৩.২ কিলোমিটার। প্রতি ১০০ মিটার করে একেকটি ব্লক চিহ্নিত করে ৩০টি খন্ড সুচিহ্নিত করে দৃশ্যমান নম্বর প্লেট এর মাধ্যমে এই পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে। এছাড়াও প্রতিটি খন্ডে একেকটি দলকে নিযুক্ত করা হয়েছিল। সবক’টি দল মিলিয়ে ২০ হাজারেরও বেশি সচেতন মানুষ অংশগ্রহণ করেছেন বলে জানা গেছে। পরিচ্ছন্নতা অভিযানের প্রত্যেক দশটি দলের একেকটি গুচ্ছের দায়িত্বে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক পর্যায়ের একেক জন কর্মকর্তা সমন্বয়ের দায়িত্বে ছিলেন। তাছাড়াও তার সাথে জেলা প্রশাসনের একেক জন নির্বাহী হাকিম একেক জন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সহযোগী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এছাড়াও জেল খাল পরিচ্ছন্নতা অভিযানে ছিলো ৩০টি নৌকা, স্পীডবোট এবং তিনটি মোবাইল কোর্ট। ৩০টি খন্ডের প্রত্যেক খন্ডে সিটি কর্পোরেশনের ৫ জন করে পরিচ্ছন্নতা কর্মী সহযোগিতায় ছিলেন। এদিকে ঢাক ঢোল পিটিয়ে, পথ নাটক, গানে গানে মুখরিত ছিলো খাল পাড়ের সড়কগুলো। শিশু থেকে বৃদ্ধ পর্যন্ত সকল বয়সী মানুষের অংশগ্রহণ ছিল বেশ চোখে পড়ার মত।
এদিকে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আরো উপস্থিত ছিলেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) আবুল কালাম আজাদ, অতিরিক্ত জেলা প্র্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) কাজী হোসনে আরা, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) আহসান হাবিব, অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্টেট মো. জাকির হোসেন, বরিশাল মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক অ্যাড. আফজালুল করিম সহ সিটি কর্পোরেশনের সকল কাউন্সিলরবৃন্দ এবং জেলা প্রশাসনের নির্বাহী হাকিমগণসহ অন্যান্য কর্মকর্তাবৃন্দ এবং পিপীলিকা চ্যারেটি ক্লাবের উপদেষ্টা মাসুদ এ খান, সভাপতিদ জেড এম আবু মাহমুদ আবদুল্ল্হা, সাধারণ সম্পাদক ইব্রাহিম মাসুম সহ সংগঠনের অন্যান্য সদস্যবৃন্দ।