উত্তাল ক্যাম্পাসঃ ভাংচুর ও বিক্ষোভ অভ্যন্তরীণ কোন্দলে পলিটেকনিকে ছাত্রলীগ নেতা রেজা খুন

নিজস্ব প্রতিবেদক ॥ পূর্ব শত্রুতার জের ধরে বরিশাল সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের ছাত্রলীগ নেতা রেজাউল করিম রেজাকে কুপিয়ে হত্যা করেছে বহিরাগত সন্ত্রাসীরা। এসময় কুপিয়ে জখম করা হয়েছে তার অনুসারী আরো তিন ছাত্রকে। গতকাল শুক্রবার রাত ৯টার দিকে সংঘটিত এই ঘটনার প্রতিবাদে ইনস্টিটিউটের সামনে যুবলীগের এক নেতার বাড়ি, রাস্তায় অটোরিক্সা ভাংচুর ও ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ মিছিল করে তারা। এই ঘটনায় রাত সাড়ে ১২টার দিকে দুই জনকে আটক করেছে পুলিশ। এর মধ্যে একজন হল হত্যা মিশনে যোগ দেয়া জাহিদ এর বাবা। তাৎক্ষণিকভাবে অপর জনের নাম জানা যায়নি।
নিহত রেজাউল করিম রেজা পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলার ঘড়িপাশা গ্রামের বাসিন্দা মৃত. আব্দুস ছত্তার এর ছেলে। সে বরিশাল পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের ২০০৬ ব্যাচের ছাত্র ছিলো। বরিশাল জেলা ছাত্রলীগের সাধারন সম্পাদক আব্দুর রাজ্জাক এর হাত ধরে রাজনীতিতে প্রবেশ করে সে।
এদিকে নিহত রেজার অপর তিন সহযোগী ছাত্রলীগ নেতাকে আহত অবস্থায় বরিশাল শেবাচিম হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
এরা হলো- পলিটেকনিক ছাত্রলীগ নেতা মেকানিক্যাল ৭ম পর্বের ছাত্র আসাদুজ্জামান ফাহিম, মেহেদী হাসান এবং ইলেক্ট্রো মেডিক্যাল ৭ম পর্বের ছাত্র রায়হান।
রেজা গ্রুপের সমর্থক ইলেক্ট্রো মেডিক্যাল বিভাগের ছাত্র আহত রায়হান জানান, সম্প্রতি রাতের আধারে নগরীর আমির কুটির এলাকার হরিজন পট্টির বাসিন্দা সন্ত্রাসী জাহিদ ধারালো অস্ত্র সহ তাদের ক্যাম্পাসে প্রবেশ করে। এসময় সিভিল বিভাগের ছাত্র মোর্শেদ এর কাছে চাঁদা দাবী সহ বিভিন্ন ভাবে হুমকি দেয়। তখন পলিটেকনিক ছাত্রলীগ নেতা রেজা গ্রুপের অনুসারিরা তাকে ক্যাম্পাসের মধ্যে আটকে গনধোলাই দিয়ে একটি ধারালো অস্ত্র সহ পুলিশের হাতে তুলে দেয়। কিন্তু এক সপ্তাহ না যেতেই সন্ত্রাসী জাহিদ রহস্যজনক ভাবে জেল থেকে ছাড়া পেয়ে যায়।
অপর ছাত্র ইলেকট্রিক বিভাগের আশিকুর রহমান রায়হান জানায়, শুক্রবার তাদের নেতা রেজাউল করিম রেজা, আসাদুজ্জামান ফাহিম, মেহেদী হাসান ও রায়হান রাত ৯টার দিকে এক সাথে ক্যাম্পাসে ফেরে। তখন পূর্বে থেকে ক্যাম্পাস সংলগ্ন টু ইন টাওয়ারের গলিতে অবস্থান নেয়া আমির কুটির হরিজন পট্টির বাসিন্দা সন্ত্রাসী জাহিদ, রাকিব ও ছাত্রলীগের অপর অংশের নেতা পলিটেকনিকের কম্পিউটার ৭ম সেমিষ্টারের ছাত্র সাইদুল ইসলাম সহ ৬/৭ জন ধারালো অস্ত্র নিয়ে রেজা ও তার সমর্থকদের উপর অতর্কিত হামলা চালায়। এসময় তাদের চারজনকেই কুপিয়ে গুরুতর জখম করে সন্ত্রাসীরা। খবর পেয়ে রেজা অনুসারিরা ঘটনাস্থলে পৌছাতেই পালিয়ে যায় সন্ত্রাসীরা। পরে রেজা সহ আহতদের উদ্ধার করে শেবাচিম হাসপাতালের সার্জারী বিভাগে ভর্তি করা হয়।
সার্জারী ইউনিট-৪ এর সহযোগী অধ্যাপক ডা. এস.এম নজরুল ইসলাম জানান, ধারালো অস্ত্রের আঘাতে ঘাড়ের রগ কেটে যায় রেজার। এ কারনে অপারেশন থিয়েটারে প্রবেশের পর পরই রাত পৌনে ১১টার দিকে তার মৃত্যু হয়। তবে বাকি আহতদের হাসপাতালে ভর্তি রেখে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে।
এদিকে রেজা ও তার সমর্থকদের উপর হামলার প্রতিবাদে তার অনুসারিরা হামলাকারী সন্ত্রাসীদের ধাওয়া করে। এসময় তারা ক্যাম্পাস সংলগ্ন সড়কে দুটি অটোরিক্সা ভাংচুর করে। এর পর পরই ক্যাম্পাসের প্রধান ফটকের সামনে থাকা মহানগর যুবলীগ সদস্য মেহেদী হাসান এর বাড়িতে ভাংচুর চালায়।
খবর পেয়ে কোতয়ালী মডেল থানা পুলিশের একটি টিম ঘটনাস্থলে পৌছে ছাত্রলীগ নেতা-কর্মীদের প্রতিরোধের চেষ্টা করে। এসময় ছাত্রলীগ নেতা-কর্মীরা পুলিশের উপর হামলা চালালে দুই পক্ষের মাঝে ধস্তাধস্তি হয়। পরবর্তীতে মেট্রোপলিটন পুলিশের সিনিয়র সহকারী কমিশনার (কোতয়ালী) আজাদ রহমান, দায়িত্বপ্রাপ্ত অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আতাউর রহমান সহ পুলিশের একাধিক টিম ঘটনাস্থলে পৌছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনে আনে। তবে রাতে রেজার মৃত্যুর সংবাদে তার অনুসারী নেতা-কর্মীরা ক্ষোভে ফেটে পড়ে। তারা ক্যাম্পাসে ভাংচুর এবং যুবলীগ নেতা মেহেদী সহ হামলাকারী সন্ত্রাসীদের বিচার দাবীতে বিক্ষোভ মিছিল করে।
ছাত্রলীগ নেতা-কর্মীদের অভিযোগ যুবলীগ নেতা মেহেদী হাসান বহিরাগত সন্ত্রাসীদের নেতৃত্ব দিচ্ছে। তার নির্দেশেই সন্ত্রাসীরা রেজা সহ তার সহযোগিদের কুপিয়ে জখম করে। এতে রেজার মৃত্যু হয়েছে।
তারা আরো অভিযোগ করেন ক্যাম্পাস সংলগ্ন টু ইন টাওয়ার নামক মেসে ছাত্রলীগ কর্মী সাইদুল সহ একদল সন্ত্রাসী বসবাস করে। ঐ সন্ত্রাসীদের নেতৃত্ব দেন মেহেদী। এমনকি গতকাল শুক্রবার রাতে সন্ত্রাসী জাহিদ, সাইদুল এবং রাকিব হামলা চালানোর পর তাদের পালিয়ে যেতে সহযোগিতা করেন মেহেদী।
তবে অভিযোগ অস্বীকার করে যুবলীগ সদস্য মেহেদী হাসান বলেন, ঘটনার সময় আমি ঘরের ভেতরে ছিলাম। ডাক চিৎকারের শব্দ পেয়ে বাইরে বের হয়ে আহতদের উদ্ধারের চেষ্টায় এগিয়ে আসি। কিন্তু উল্টো রেজার লোকজন আমাদের ঘরে হামলা এবং ভাংচুর করেছে।
মেট্রোপলিটন পুলিশের সিনিয়র সহকারী কমিশনার (কোতয়ালী) আজাদ রহমান জানান, পূর্ব বিরোধের জের ধরে ক্যাম্পাস এবং বহিরাগত ছাত্রলীগের একটি গ্রুপ রেজা ও তার সহযোগিদের কুপিয়ে জখম করে। এ নিয়ে ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা মেহেদী নামের যুবলীগ নেতার বাড়িতে ভাংচুর করেছে। তারা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনে এনেছেন। তাছাড়া পরবর্তী অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে ক্যাম্পাসে বিপুল সংখক পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। তিনি বলেন রাতে অভিযান চালিয়ে ঘটনার সাথে জড়িত সন্দেহে বটতলা আমির কুটির এলাকার জাহিদের বাবা সহ ২ জনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করা হয়েছে। তবে বাকিদের গ্রেফতারের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
উল্লেখ্য, বাউফলের বাসিন্দা রেজাউল করিম রেজা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের সাবেক ছাত্রলীগ নেতা ও বর্তমানে জেলা ছাত্রলীগের সাধারন সম্পাদক আব্দুর রাজ্জাক এর হাত ধরে রাজনীতিতে প্রবেশ করে। রাজ্জাকের অবর্তমানে রেজাউল করিম ছাত্রলীগের একাংশের নেতৃত্ব দিয়ে আসছিল। এনিয়ে ছাত্রলীগের দুই গ্রুপের ভিতরে ক্যাম্পাসে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে বিরোধ চলে আসছিল। ইতিমধ্যে রেজা ও তার প্রতিপক্ষ গ্রুপের সাথে বেশ কয়েকবার হামলা, সংঘর্ষ, ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। এ নিয়ে বেশ কিছু দিন যাবত ক্যাম্পাস অশান্ত হয়ে ওঠে। শেষ পর্যন্ত গ্রুপের একাংশের নেতা রেজাকেই প্রতিপক্ষের হাতে প্রাণ দিতে হল।