ইলিশে ভরপুর বরিশালের হাট বাজার

রুবেল খান ॥ সাগর-নদীতে জেলের জালে ধরা পড়ছে ঝাঁকে ঝাঁকে ইলিশ। সেই সুবাদে ইলিশে ছেয়ে গেছে বরিশাল নগরীর হাট-বাজার। চলতি মৌসুমে এই প্রথম সব থেকে বেশি ইলিশ ধরা পড়ছে বলে দাবী জেলে ও মৎস্য ব্যবসায়ীদের। আর তাই গত ১০ দিনের ব্যবধানে ইলিশের মূল্য মণ প্রতি ৭ থেকে ৮ হাজার টাকা কমে গেছে বলেও দাবী তাদের।
এদিকে চলতি মৌসুমের সর্বোচ্চ ইলিশ জালে ধরা পড়লেও হতাশ জেলেরা। ইলিশ ধরা পড়ার নির্দিষ্ট সময়ে সরকারি নিষেধাজ্ঞার আগমনে তারা হতাশাগ্রস্ত হচ্ছে। এমণকি সরকারের ইলিশ রক্ষার পদ্ধতিতেও ক্ষুব্ধ জেলেরা।
সূত্রমতে, দক্ষিণাঞ্চলের মধ্যে এক সময়ের সর্ব বৃহৎ মৎস্য অবতরন কেন্দ্র ছিলো নগরীর পোর্ট রোড। তখনকার সময় এখান থেকেই হাজার হাজার মণ দেশের বিভিন্ন স্থানে রপ্তানী হতো। কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপটে পূর্বেই সেই চিত্র শুধুই স্মৃতি। তবে গত কয়েক দিনে নগরীর পোর্ট রোডে ইলিশ আমদানীর চিত্র পূর্বের সেই স্মৃতি মনে করিয়ে দিচ্ছে। কেননা চলতি মৌসুমে সাগর এবং নদীর সর্বোচ্চ সংখ্যক ইলিশ ধরা পড়ায় পোর্ট রোডের ইলিশ মোকাম বিভিন্ন সাইজের ইলিশের অভায়ারন্যে পরিনত হয়েছে। প্রতি দিন গড়ে ৭ থেকে ১০টি ফিশিং বোর্ডে সাগরের ইলিশ আসছে পোর্ট রোডের ইলিশ মোকামে। এর পাশাপাশি স্থানীয় নদ নদীর ইলিশতো রয়েছেই।
গতকাল শুক্রবার পোর্ট রোডের ইলিশ মোকাম ঘুরে দেখা গেছে, যে পরিমান ইলিশ আসছে তার বেশিরভাগ এলসি এবং গ্রেড সাইজের মাছ। সর্বনি¤œ ২শ গ্রাম থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ সাড়ে ৩ কেজি ওজনের ইলিশ আসছে এই মোকামে। মণ প্রতি ইলিশের মূল্যও রাখা হচ্ছে তুলনামূলক কম। শুধু তাই নয়, খুচরা হিসেবে দেড় কেজি ওজনের এক একটি ইলিশ বিক্রি করতে দেখা গেছে ৮’শ থেকে ১১’শ টাকায়। যার মূল্য গত কয়েক দিন পূর্বেও ছিলো দেড় থেকে প্রায় দুই হাজার টাকা।
বরিশাল জেলা মৎস্য আড়ৎদার এ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক ও পোর্ট রোডের ইজারাদার নিরব হোসেন টুটুল বলেন, গত কয়েক দিনের তুলনায় বর্তমানে সাগর এবং নদীতে ঝাঁকে ঝাঁকে ইলিশ ধরা পড়ছে। এর ফলে ইলিশের মূল্যও তুলনামূলক ভাবে অনেকাংশে কমে গেছে। চলতি মাসের শেষ পর্যন্ত এমণ ভাবে থাকবে বলে আশা ব্যক্ত করেন তিনি।
ইলিশের বর্তমান মূল্য সম্পর্কে নিরব হোসেন টুটুল বলেন, ইলিশ বেশি ধরা পড়ায় দামও দিন দিন কমছে। গতকাল শুক্রবার সকাল থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত পোর্ট রোড মোকামে এক হাজার মণের মত সাগর এবং লোকাল ইলিশ আমদানী হয়েছে। যা গত তিন-চার দিনের তুলনায় বেশি। ফিশিং বোটে আসা সাগরের ৪’শ থেকে ৮’শ গ্রাম ইলিশ মণ প্রতি বিক্রি হয়েছে ২২ হাজার টাকায়।
এছাড়া লোকাল ইলিশ গোটলা (২’শ গ্রাম ৪’শ গ্রাম) মণ প্রতি ১৪ হাজার টাকা, ভ্যালকা (৪’শ থেকে ৬’শ গ্রাম) মণ প্রতি ২০ হাজার টাকা, এলসি (৬’শ থেকে ১ হাজার গ্রাম) ২৮ হাজার এবং গ্রেট সাইজ অর্থাৎ ১ কেজি থেকে ১২’শ গ্রাম ওজনের প্রতিমণ ইলিশ বিক্রি হয়েছে ৪২ হাজার টাকা দরে। চলতি মাসে ইলিশের মূল্য আরো কমে আসবে বলে জানিয়েছেন মৎস্য আড়ৎদার এ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক নিরাব হোসেন টুটুল।
এদিকে পোর্ট রোডের মৎস্য আড়ৎদার ও তালুকদার এন্টারপ্রাইজের ম্যানেজার লক্ষন চন্দ্র দাস বলেন, বর্তমান সময়ে নদী এবং সাগরে ইলিশ বেশি ধরা পড়ছে। যে কারনে গত ১০ দিনের ব্যবধানে মণ প্রতি ইলিশের মূল্য ৭ থেকে ৮ হাজার টাকা কমে এসেছে। গতকাল যে পরিমান ইলিশ পোর্ট রোড মোকামে আমদানী হয়েছে তার মধ্যে ৭ থেকে ৮’শ মণ লোকাল ইলিশ। বাকিটা ফিশিং বোটে সাগরের ইলিশ। ফিশিং বোটে আসা ইলিশ মণ প্রতি বিক্রি হয়েছে ২৩ থেকে ২৪ হাজার টাকা।
তিনি বলেন, বরিশাল মোকামে এখন যে পরিমান ইলিশ আসছে এক সময় তার থেকে অনেক বেশি ইলিশ আসত। কিন্তু এখন পটুয়াখালী, মহিপুর এবং পাথরঘাটা সহ বেশ কয়েটি স্থানে ইলিশ মোকাম থাকায় বরিশাল মোকামে ইলিশ আসা কমে গেছে। বরিশাল মোকামে যেসব মৎস্য ব্যবসায়ীদের ফিশিং বোট আছে তারাই শুধু সাগরের মাছ পাচ্ছে। বাকিটা অন্যান্য মোকামে চলে যাচ্ছে।
অপরদিকে তন্নি ফিশিং বোটের মালিক ভোলার চরফ্যাশনের বাসিন্দা মো. মাসুদ বলেন, মৎস্য বিভাগের ভুল সিদ্ধান্তের কারনে বঙ্গোপসাগরের বাংলাদেশ প্রান্তে ইলিশ পাওয়া যাচ্ছে না। এখন যে ইলিশ সাগর থেকে ধরে আনা হচ্ছে তা ভারতের কাকদী পয়েন্ট থেকে ধরা। জেলেরা ঝুঁকি নিয়ে বাংলাদেশের সিমান্তের বাইরে গিয়ে মাছ ধরে আনছে।
তিনি বলেন, বর্তমান সময়টা হচ্ছে ইলিশ মৌসুম। আগামী মাসের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত বড় সাইজের ইলিশ ধরা পরবে। আশ্বিন মাসের পূর্ণিমায় ইলিশ বাংলাদেশের মিঠা পানিতে ডিম ছাড়ে। মাছের ডিম ছাড়তে সর্বোচ্চ ১০ দিন সময় লাগে। কিন্তু সেখানে মৎস্য বিভাগ ২২ দিন বঙ্গোপসাগরের মিঠা পানিতে ইলিশ শিকারে নিষেধাজ্ঞা দিচ্ছে। এর এই সময়ের মধ্যে ইলিশ ডিম ছেড়ে ভারতের নোনা পানিতে নেমে যাচ্ছে। যে কারনে বাংলাদেশের অংশে ইলিশ পাওয়া যায় না। তাছাড়া নিষেধাজ্ঞার সময় বাংলাদেশীরা ইলিশ শিকারে ব্যর্থ হলেও ভারতের জেলেরা কোন প্রকার অনুমতি ছাড়াই বাংলাদেশ সিমান্তে এসে মাছ ধরে নিয়ে যাচ্ছে। সেখানে কোষ্টগার্ড এবং নৌ বাহিনী টহলে থাকলেও তারা বাঁধা দিচ্ছে না। যে কারনে বাঙ্গালীদের ভাগ্যে ইলিশ জুটছে না। এমনকি এক একটি ফিশিং বোট মালিক এবং জেলেরাও লাখ লাখ টাকা লোকসানে পড়ছে। তাই অনেক জেলে এবং বোট মালিক মাছ ধরা পেশাও ছেড়ে দিয়ে অন্য পেশায় মনোনিবেশ করেছেন।
এ প্রসঙ্গে মৎস্য কর্মকর্তা (ইলিশ) বিমল চন্দ্র দাস বলেন, ইলিশের ডিম ছাড়ার জন্য ২২ দিনের যে সময় নির্ধারন করা হয়েছে গবেষনা করেই করা হয়েছে। এই সময়ের মধ্যে ইলিশ বঙ্গোপসাগরের মিঠা পানিতে ডিম ছাড়ে। ভারত অংশের সাগরের পানি নোনা বিধায় সেখানকার মাছও বাংলাদেশে এসে ডিম দিচ্ছে। তাই ঐ সময়টুকুতে বাংলাদেশের নির্দিষ্ট স্থানে ইলিশ ধারার প্রতি নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়েছে। নির্দেশনা বাস্তবায়নে প্রশাসন দায়িত্ব পালন করে বলেও জানিয়েছেন তিনি।