ইলিশের জোয়ারে ভাসছে পোর্ট রোড মৎস্য অবতরন কেন্দ্র

জুবায়ের হোসেন ॥ মৌসুমের শেষের ভাগে এসে ইলিশের জোয়ারে ভাসছে নগরীর পোর্ট রোড মৎস অবতরন কেন্দ্র (ইলিশ মোকাম)। প্রতিদিন সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত রুপালী ইলিশ নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করছে ইলিশ মোকাম সংশ্লিষ্ট সকলেই। সমুদ্র ও মেঘনা থেকে শিকার করা হাজার হাজার মণ ইলিশ প্রতিদিন কোটি টাকায় বিক্রি হচ্ছে দেশের বিভিন্ন স্থানে। এবছরের ইলিশের প্রাচুর্যকে সৃষ্টিকর্তার আশির্বাদ জানিয়ে প্রতিদিন মৎস্য অবতরন কেন্দ্র থেকে আয় করে হাসিমুখে ঘরে ফিরছেন সেখানে কর্মরত বিভিন্ন শ্রেনীর মৎস্যজীবী ও শ্রমিকরা। শুধু তারাই নয় মোকামে ইলিশের অভাব না থাকায় বিভিন্ন ভাবে ইলিশের কেনা বেচায় নিজেদের অর্ন্তভূক্ত করে প্রতিদিন টাকা আয় করে অপার সন্তুষ্টির দিন কাটাচ্ছে পোর্ট রোড এলাকার খুচরা বিক্রেতারাও। বিগত বেশ কয়েক বছরের আকালের পর এবছর মৌসুমের প্রায় শেষে বিগত এক সপ্তাহে জালে ধরা পরা প্রচুর পরিমানে ইলিশকে তারা বরিশাল বাসীর প্রতি সৃষ্টিকর্তার ঈদ উপহার হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।
পোর্টরোড মৎস অবতরন কেন্দ্র (ইলিশ মোকাম) ঘুরে এবং সংশ্লিষ্টদের সাথে আলাপ করে জানা গেছে, ১ জুলাই থেকে ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত এবছর ইলিশ শিকারের মৌসুম চলবে। মৌসুমের শুরুর প্রথম দুই মাস জালে ইলিশের দেখা তেমন একটি না মিললেও পহেলা সেপ্টেম্বর থেকে হঠাৎ প্রচুর পরিমানে ইলিশ ধরা পরতে শুরু করে সমুদ্র ও মেঘনায় ইলিশ শিকারে থাকা জেলেদের জালে। চাপিলা বা জাটকা নয়, বেশির ভাগই গ্রেড আকারের মাছ এবছর শিকার হয়ে বরিশালসহ দক্ষিণাঞ্চলের মোকামগুলোতে বিক্রির জন্য আসছে। জেলেদের সাথে আলাপ কালে তারা জানায়, মৌসুমের শুরুর দিকে খুব একটা ইলিশ ধরা পড়েনি। এনিয়ে হতাশা ছিল জেলেদের মধ্যে। তবে সপ্তাহ ধরে গভীর সমুদ্র এবং দক্ষিণের নদ-নদীগুলোতে ইলিশ ধরা পড়ছে। তবে পরিমাণ ও দাম ওঠা-নামা করছে। তাদের দাবি, বিপুল ইলিশ ধরা পড়ায় দাম পড়ে গেছে। সাগর থেকে মাছ নিয়ে এলে ইলিশের দাম আরো কমে যাবে। পোর্ট রোডের মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রের ব্যবসায়ী মো. রফিকুল ইসলাম এবং আড়ৎদার ও মৎস আমদানী-রপ্তানীকারক কমিশন এজেন্ট নাসির উদ্দিন মিয়া জানান, আগে বহু জেলে এই অবতরণ কেন্দ্রে আসতো। কিন্তু বর্তমানে বেশি লাভের আশায় বরিশালের মাছ পাঠানো হচ্ছে চাঁদপুর, ভোলা ও পটুয়াখালীর মহিপুরে। তার পরেও এবছর মাছে টইটম্বুর অবতরন কেন্দ্র। বিগত ৭/৮ দিন থেকেই এই মাছ দেখা যাচ্ছে। পহেলা সেপ্টেম্বর থেকে গতকাল ৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রতিদিন গড়ে দুই থেকে তিন সাড়ে তিন হাজার মণ মাছ এসেছে অবতরন কেন্দ্রে। এই এক সপ্তাহে অবতরন কেন্দ্রে ৫০০ গ্রাম থেকে ১ কেজি বা তার থেকে কিছুটা বেশি ওজনের ২০ হাজার মনের অধিক ইলিশ মাছ এসেছে। বিভিন্ন আকারের মাছের মধ্যে এলসি(৬০০-৯০০ গ্রাম) সাইজের মাছ ৩২ থেকে ৩৫ হাজার টাকায়, এক কেজির মাছ মণ প্রতি ৪২ থেকে ৪৬ হাজার টাকায়, এক কেজি দুইশ গ্রামের মাছ মণ প্রতি ৫০ থেকে ৫৫ হাজার টাকায় এবং দেড়কেজি সাইজের ইলিশ মণ প্রতি ৮০ থেকে ৯০ হাজার টাকায় বেচা কেনা হচ্ছে। তবে এই দাম প্রায় অপরিবর্তীত থাকলেও মাছ বেশী পাওয়া গেলে দাম প্রতি আকারের মাছের মণেই ২/৩ হাজার টাকা করে কম রাখা হয়েছে। এতে করে বিগত ৭ দিনেই দীর্ঘদিন ক্ষতির ব্যবসা পরিচালনা করে আসা মৎস্য বিক্রেতারা এবার দেখেছেন কোটি টাকার মুখ। বিগত সাত দিনে প্রতিদিন কমপক্ষে ৫-৭ কোটি টাকার ইলিশ অবতরন কেন্দ্র থেকে দেশের বিভিন্ন স্থানে বিক্রি হয়েছে বা এজেন্টদের মাধ্যমে বিক্রির জন্য পাঠানো হয়েছে বলে জানায় ইলিশ মোকাম সংশ্লিষ্ঠ একটি সূত্র। এমন রমরমা ব্যবসায় শুধু আড়তদার ও কমিশন এজেন্টরাই আনন্দিত নয়, দীর্ঘদিন পর ইলিশের রুপালী ঝলকে হাসি ফুটেছে মোকাম এর হাজারো শ্রমিকের মুখে। তারা প্রতিদিন মোকাম থেকে শুধু টাকা নয়, পরিবারের জন্য আনন্দের সাথে বড় ছোট দু একটি ইলিশ মাছ নিয়েও যেতে পারছেন। যা বিগত কয়েকবছর ছিল তাদের কাছে অপূরনীয় স্বপ্নের মত। অন্যদিকে মৌসুমের শুরুতে ইলিশ না থাকলেও মাঝে হঠাৎ করে ইলিশের আমদানি বাড়ায় ধাক্কা সামলাতে বেগ পেতে হচ্ছে বরিশালের বরফকল কর্তৃপক্ষকে। চাপ সামলাতে খুলনা থেকে বরফ এনে বিক্রি করছেন বলে জানিয়েছেন বরফকল ব্যবসায়ী মো. শহিদুল ইসলাম। তিনি আরো জানান, লোকসানের কারণে বরিশালে কিছু বরফকল বন্ধ রাখা হয়েছে। তারপরও এখন বরিশালেই প্রয়োজনীয় বরফ উৎপাদন করা সম্ভব হবে।
বরিশাল মৎস্য পাইকারী ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি আলী আশরাফ জানান, গত ৭ দিনে প্রচুর ইলিশ ধরা পড়েছে সাগর ও স্থানীয় নদ-নদীতে। প্রতিদিন গড়ে ২/৩ হাজার মন ইলিশ অবতরন কেন্দ্রে আসছে। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত সবাই ব্যস্ত সময় পাড় করছেন এসব ইলিশ বাজারজাত করার জন্য। দামও অনেকটা কমে গেছে বর্তমানে। মাছের ব্যাপক আমদানির জন্যই দাম কম বলে মৎস্য পাইকারী ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি জানান।
বরিশালের বিভিন্ন উপজেলাসহ ভোলা, লালমোহন, চরফ্যাসন, মনপুরা, হাতিয়া, নোয়াখালী, পাথরঘাটাসহ বিভিন্ন অঞ্চল থেকে এখানে জেলেরা নৌকা ও ট্রলারে করে ইলিশ নিয়ে আসে। আর রাজধানী ঢাকা ও এর আশপাশের এলাকাসহ রংপুর, দিনাজপুর, বগুড়া, ঠাকুরগাও, পঞ্চগড়, কুষ্টিয়া, ভেড়ামাড়া, নাটোর, ঈশ্বরদী, পাবনা, গাইবান্ধা ও অন্যান্য জেলায় এখান থেকে ইলিশ রপ্তানী করা হয়। সরকারের ইলিশ রক্ষা আইন যথাযথভাবে পালন করায় ইলিশের উৎপাদন কয়েকগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। সামনের দিনগুলোতে আরো ইলিশ পাওয়া যাবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন তিনি।