ইউপি নির্বাচন ধানের শীষের তিনগুণ ভোট নৌকার ‘অপমান’ এড়াতে বর্জনের পরামর্শ

বিডিনিউজ ॥ নবম ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনে চেয়ারম্যানর পদে প্রথম ধাপের মতো দ্বিতীয় ধাপেও বিএনপির প্রায় তিনগুণ ভোট পেয়েছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। প্রথম দুই ধাপে ব্যাপক সহিংসতা ও অনিয়মের অভিযোগ তুলে ‘ধানের শীষের অপমান’ এড়াতে পরবর্তী সব ধাপের নির্বাচন ‘বর্জনের’ পক্ষে যুক্তি দিয়েছেন বিএনপির দুই জ্যেষ্ঠ নেতা।
বৃহস্পতিবার দ্বিতীয় ধাপের ৬৩৯ ইউপির ভোটের মধ্যে ৫৮৪টির ফলে দেখা গেছে, গড়ে প্রায় ৭৬ শতাংশ ভোট পড়েছে। এর মধ্যে নৌকায় পড়েছে ৫৪ শতাংশ, ধানের শীষে ১৭ শতাংশ ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা পেয়েছেন ২৮ শতাংশ ভোট।
প্রথম ধাপের ৭১২ ইউপির মধ্যে আওয়ামী লীগ ৫৪০টিতে জয়ী হওয়ার পর দ্বিতীয় ধাপের ৫৮৪টির মধ্যে জিতেছে ৪০৫টিতে। বিএনপি প্রথম ধাপে ৪৭টিতে জয় পায়; দ্বিতীয় ধাপে এ পর্যন্ত জিতেছে ৫৮টিতে। স্বতন্ত্র প্রার্থীরা জয়ী হয়েছেন ১০৫ ইউপিতে; প্রথম ধাপে তারা জয়ী হন ১০৩টিতে।
শুক্রবার বিকালে নির্বাচন কমিশনে (ইসি) পাঠানো রিটার্নিং কর্মকর্তাদের দ্বিতীয় ধাপের ভোটের প্রাথমিক ফল পর্যালোচনা করে এসব তথ্য মিলেছে। মাঠ কর্মকর্তারা বিশেষ সফটওয়ারের মাধ্যমে ইসির নেটওয়ার্কে ভোটের ফল পাঠাচ্ছেন।
বিকাল ৫টা পর্যন্ত ৫৫১ ইউপির চেয়ারম্যান পদের পূর্ণাঙ্গ ফল পেয়েছে ইসি। এর বাইরে ৩৩ ইউপিতে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন একক প্রার্থীরা। বাকি ইউপির আংশিক তথ্য এসেছে। ৩৩টি কেন্দ্রের ভোট বন্ধ থাকায় তা পর্যালোচনা করে তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা চলছে।
ইসির উপ-সচিব রকিব উদ্দিন ম-ল বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমরা মাঠ পর্যায়ের তথ্য একীভূত করছি। বৈরি আবহাওয়ার কারণে কিছু এলাকা থেকে ইসির নিজস্ব সার্ভারে ফল পাঠাতেও বিলম্ব হয়েছে। পূর্ণাঙ্গ তথ্য রাতের মধ্যে একীভূত করা সম্ভব হবে।”
বৃহস্পতিবারের নির্বাচনী সহিংসতায় অন্তত ৮ জনের প্রাণহানি হয়েছে। অনিয়মের কারণে ৩৩টি ভোটকেন্দ্র স্থগিত করা হয়। ২২ মার্চের প্রথম ধাপের ভোটে ৬৫টি কেন্দ্র বন্ধ হয়। ওই ভোট নিয়ে অন্তত ২০ জন নিহত হয়।
ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ এ নির্বাচনে সন্তোষ প্রকাশ করলেও বিএনপি কঠোর সমালোচনা করে আসছে।
বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় ভোট শেষে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী রকিবউদ্দীন আহমদ বলেন, গতবারের চেয়ে একটু ভালো ভোট হয়েছে; ব্যাপক ভোটার উপস্থিতিও ছিল। তবে কয়েকটি ঘটনা সামগ্রিক অর্জন ম্লান করেছে।
ইসি থেকে এ পর্যন্ত পাওয়া দ্বিতীয় ধাপের ফল পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ৬৩৯ ইউপির মধ্যে ৩৩টিতে আওয়ামী লীগের চেয়ারম্যান প্রার্থীরা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন। এছাড়া ৫৫১ ইউপিতে আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতীকের ৩৭২ জন, বিএনপির ধানের শীষ প্রতীকের ৫৮ জন, জাতীয় পার্টির তিন জন, জাতীয় পার্টি-জেপির দুজন ও ১০৫ জন স্বতন্ত্র প্রার্থী বিজয়ী হয়েছেন। বাকিরা কয়েকটি রাজনৈতিক দলের।
এসব ইউপির ৯৬ লাখ ৪৩ হাজার ৬৮২ ভোটের মধ্যে ৭৩ লাখ ৪১ হাজার ৮৯৬ ভোট পড়েছে। এ হিসাবে গড়ে ৭৬ দশমিক ১৩ শতাংশ ভোট পড়েছে। এর মধ্যে বৈধ ভোট ৭১ লাখ ৯১ হাজার ৫৯৫টি ও বাতিল ভোট ১ লাখ ৫০ হাজার ৩০১ টি।
দলভিত্তিক ভোটে নৌকা প্রতীকই তাদের ধারাবাহিকতা ধরে রেখেছে। আওয়ামী লীগ প্রার্থীরা প্রায় ৩৯ লাখ ভোট পেয়েছে, যা প্রদত্ত ভোটের ৫৪ শতাংশ।
ধানের শীষে ভোট পড়েছে ১৩ লাখের বেশি, যা প্রদত্ত ভোটের ১৭ শতাংশ। স্বতন্ত্র প্রার্থীরা পেয়েছে ২১ লাখের বেশি ভোট; যা প্রদত্ত ভোটের ২৮ দশমিক ৪৮ শতাংশ।
প্রথম ধাপের ফলে আ. লীগ-বিএনপি
দেশের সোয়া চার হাজার নির্বাচন উপযোগী ইউপির মধ্যে ২২ মার্চ ৭১২ ইউপিতে ভোট হয়। এতে ৭৪ দশমিক ৭৭ শতাংশ ভোট পড়ে।
আওয়ামী লীগ ৫৪ ও বিএনপি ১৭ শতাংশ ভোট পায়। আওয়ামী লীগ ৫৪০টিতে জয়ী হয় (৫৪ জন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায়)। বিএনপি জয় পায় ৪৭টিতে।
স্বতন্ত্র প্রার্থীরা ১০৩ ইউপিতে নির্বাচিত হয়। জাতীয় পার্টি, জাতীয় পার্টি-জেপি, জাসদ, ওয়ার্কার্স পার্টির চেয়ারম্যান প্রার্থীরাও নির্বাচিত হয়েছে এ ধাপে। তৃতীয় ধাপে ২৩ এপ্রিল ভোট হবে ৬৫০ ইউপিতে। এরপর চতুর্থ ধাপে ৭ মে সাত শতাধিক, পঞ্চম পর্বে ২৮ মে ৭১৪ ইউপিতে এবং ৪ জুন ষষ্ঠ ও শেষ পর্বে ভোট হবে বাকিগুলোয়।
এদিকে গতকাল শুক্রবার ঢাকায় জাতীয় প্রেসক্লাবে দুই আলোচনা সভায় বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মাহবুবুর রহমান ও ভাইস চেয়ারম্যান শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন ওই যুক্তি তুলে ধরে দলের নীতি-নির্ধারকদের তা আমলে নেওয়ার অনুরোধ জানান।
নাগরিক সংসদ আয়োজিত সভায় শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন, “নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তারা, পুলিশরা, প্রিজাইডিং এজেন্টরা সবাই মিলে নৌকায় ভোট দিয়েছে। আর নৌকার লোকেরা তো আছেই।
“এটা কি ভোট হয়েছে? এটা ভোট না, এটা ভোট না, এটা বোট (নৌকা)। এটার মধ্যে আপনি (বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব) যান কেন?”
ইউপি নির্বাচনের প্রথম ও দ্বিতীয় ধাপের ভোট হয়ে যাওয়ার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, “তৃতীয়, চতুর্থ, পঞ্চম ধাপের নির্বাচন সামনে। আমার মনে হয়, ইট ইজ হাই টাইম।
“এই নির্বাচনকে আমাদের তরফ থেকে বর্জন করা উচিৎ। এই নির্বাচন এভাবে আর করা ঠিক হবে না। আমাদের প্রতীককে অপমান করা হচ্ছে, ধানের শীষকে অপমান করা হচ্ছে।”
স্থানীয় সরকারের তৃণমূলের এই নির্বাচন এবারই প্রথমবারের মতো দলীয় প্রতীকে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। দশম সংসদ বর্জনকারী নবম সংসদের বিরোধী দল বিএনপি নেতাদের অভিযোগ, এই ভোটের নামে তামাশা করছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)।
বিএনপির নীতি-নির্ধারকদের উদ্দেশে শাহ মোয়াজ্জেম বলেন, “আমি অনুরোধ করব, আমাদের দলের নীতি-নির্ধারকদের, যেটা গেছে, গেছে।
“এদের কাছ থেকে নির্বাচন চান? এদের কাছ থেকে ভোট চান? এরা ভোট দেবে না। এবার নির্বাচন প্রত্যাখ্যান করুন।
অল কমিউনিটি ফোরাম আয়োজিত আরেক আলোচনা সভায় মাহবুবুর রহমান বলেন, “গতকাল ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন ছিল। গোটা দেশজুড়ে আমরা কী দেখলাম- শিশুসহ ১১ জন নিহত হয়েছে।
“এর কয়েকদিন আগেও যে নির্বাচন হয়েছে, সেখানেও মঠবাড়িয়াসহ বিভিন্নস্থানে ১০ জন নিহত হয়েছিল। গোটা দেশজুড়ে কী হচ্ছে ? একটা রক্তের হোলি খেলা হচ্ছে।”
‘কিসের, কেন ও কার জন্য’ এই নির্বাচন- এমন প্রশ্ন রেখে তিনি বলেন, “আজ বাংলাদেশ মৃত্যুকূপে পরিণত হয়েছে। লাশের মিছিল চলছে। এটা হতে দেওয়া যায় না। আমি মনে করি, এভাবে রক্তপাতের নির্বাচন আমরা চাই না, এটা সুফল বয়ে আনবে না।”
দুই অনুষ্ঠানেই নির্বাচনী সহিংসতার জন্য ইসিকে দায়ী করে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের (সিইসি) তীব্র সমালোচনা করেন বিএনপির দুই নেতা।
মাহবুবুর রহমান বলেন, “সিইসি যতই আস্ফালন করে বলুন, আমার অর্জন অনেক। ছোট একটু ঘটনায় অর্জন ম্লান হয়ে গেছে। এজন্য আমি দায়ী না, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দায়ী।
“আমি বলব, না। নির্বাচনের সবকিছুর জন্য দায়ী তুমি, একমাত্র তুমি। কারণ নির্বাচনের সময়কালে নির্বাচন কমিশনের ক্ষমতা প্রধানমন্ত্রীর চেয়েও আরও শক্তিশালী। সিইসিকে সেইসময়ে সুপার প্রাইম মিনিস্টার বলা হয়ে থাকে।”
কাজী রকিবউদ্দীন আহমদ নেতৃত্বাধীন ইসির পদত্যাগ ও তার বিচার দাবি করে শাহ মোয়াজ্জেম বলেন, “আমরা এই নির্বাচন কমিশনের পদত্যাগ চাই। প্রধান নির্বাচন কমিশনার রকিবউদ্দীন আহমদের বিচার হতে হবে।
“রকিব তুই ভাবছস কী, এক মাঘে শীত যায় না। এভাবেই দিন চলবে? দীর্ঘদিন এই হাসিনার সরকার থাকবে? এটা হবে না।”