ইউপি নির্বাচন অসহিষ্ণু হয়ে পড়েছে ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীসহ নেতা-কর্মীরা

রুবেল খান ॥ ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে অসহিষ্ণু হয়ে পড়েছে ক্ষমতাসীন দল আ’লীগের মনোনীত প্রার্থীসহ নেতা-কর্মীরা। প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপিসহ অন্যান্য দলের প্রার্থী ও তাদের কর্মী সমর্থকদের হুমকি দেয়াসহ হামলা ও মারধর করে আহত করা হচ্ছে। এরপর তাদের বিরুদ্ধে মামলা করে এলাকা ছাড়া করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে। নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর জেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে একের পর এক এমন ঘটনা ঘটছে। এতে সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন সম্পন্ন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে বিএনপিসহ অন্যান্য দলের নেতা-কর্মীরা।
নির্বাচন অফিস সূত্রে জানা গেছে, দেশে প্রথম দফায় ২২ মার্চ ইউপি নির্বাচনের ভোট বরিশালের ৭৪ ইউপিতেও অনুষ্ঠিত হবে। প্রথমবারের মতো দলীয় প্রতীকে চেয়ারম্যান পদের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টি, ওয়াকার্স পার্টি এবং ইসলামী আন্দোলনসহ বিভিন্ন দল থেকে প্রার্থী মনোনয়ন জমা দিয়েছে। আগামী ৩ মার্চ থেকে ভোটের জন্য আনুষ্ঠানিক প্রচারণা শুরু হবে।
নির্বাচন কমিশনের ওই আইন বাস্তবে পালন হচ্ছে না। বিএনপি এবং অন্যান্য দলের প্রার্থীরা প্রচারণা শুরুর অপেক্ষায় থাকলেও বিধি লঙ্ঘন করে নির্বাচনী প্রচারণা এবং সভা সমাবেশ করছে আ’লীগের প্রার্থীরা। বিভিন্ন স্থানে আওয়ামীলীগ প্রার্থীদের নৌকা প্রতীকের সাদা-কালো এবং রঙ্গিন পোষ্টারে ছেয়ে গেছে।
এদিকে শুধু বিধি লঙ্গন করে প্রচারণাই নয়, প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের নিস্ক্রিয় করতে সন্ত্রাসী কর্মকান্ড চালানো হচ্ছে। বিশেষ করে তাদের ষড়যন্ত্র ও হামলা মামলার শিকার হচ্ছে বিএনপি প্রার্থী, নেতা-কর্মী ও সমর্থকরা। গত কয়েকদিনে বিএনপি’র প্রার্থী এবং তাদের সমর্থকদের উপর আ’লীগের প্রার্থী এবং সমর্থকদের হামলা, উল্টো মামলা দেয়াসহ সন্ত্রাসী কর্মকান্ড সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশকে ব্যাহত করছে।
সর্বশেষ গত রবিবার রাতে সদর উপজেলার রায়পাশা-কড়াপুর ইউনিয়নে বিএনপি প্রার্থী ও বর্তমান চেয়ারম্যান নূরুল আমিনের কর্মী সমর্থকদের উপর হামলার ঘটনাটি বেশ চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে। ঐ ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের প্রার্থী এক সময়ের মুহরী হাবিবুর রহমান খোকন ধর্মাদী বাজারে অবস্থান নিয়ে তার ছেলে কায়সার আলম সোহাগ ও মেয়ের জামাতার সন্ত্রাসী বাহিনী দিয়ে বিএনপি’র চেয়ারম্যান প্রার্থী নূরুল আমিনের মোটর সাইকেল বহরে সশস্ত্র হামলা চালান। এসময় তার তিন কর্মীকে মারধর করে তিনটি মোটর সাইকেল খালে ফেলে দেয় চেয়ারম্যান প্রার্থী খোকনের সন্ত্রাসী পুত্র সোহাগ ও তার বাহিনী। শুধু এটুকুতেই থেমে নেই এক সময়ের আলোচিত এবং রায়াপাশা কড়াপুর ইউনিয়নে সন্ত্রাসের মদদ দাতা হাবিবুর রহমান খোকন। হামলার পরে ঐ রাতেই এয়ারপোর্ট থানায় উল্টো হামলার শিকার যারা হয়েছেন তাদের বিরুদ্ধে একটি অভিযোগ দেন। যে অভিযোগে নূরুল আমিন এবং তার কর্মী সমর্থকদের বিরুদ্ধে গুণধর সন্ত্রাসী পুত্র সোহাগের উপর হামলা এবং বোমা বিস্ফোরণের অভিযোগ করা হয়েছে বলে থানার এসআই খালেকুল বাদশা জানিয়েছেন। অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে গতকাল সোমবার এয়ারপোর্ট থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) ধর্মাদী বাজার সংলগ্ন ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন।
এদিকে শুধু রায়াপাশা কড়াপুর এলাকাই নয়, আতংকে দিন কাটাচ্ছেন বরিশাল সদর উপজেলার ১০টি ইউনিয়নের সকল প্রার্থীরাই। নির্বাচনকে সামনে রেখে বিএনপি’র প্রার্থীরা দোয়া চাইতে রাস্তায় নামার সাহস পাচ্ছে না। কেননা রাস্তায় নামার আগেই হুমকি, ধামকি সহ বিভিন্নভাবে হয়রানি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন বিএনপি’র প্রার্থীরা। সদর উপজেলার চরবাড়িয়া ইউনিয়নের বিএনপি মনোনিত প্রার্থী এবং বর্তমান চেয়ারম্যান জিয়াউল ইসলাম সাবু জানান, আওয়ামী লীগের প্রার্থী মাহাতাব হোসেন সুরুজ ও তার সমর্থকরা ইউনিয়নের বিভিন্ন ওয়ার্ডে মোটর সাইকেলে শোডাউন দিচ্ছে। এমনকি ওয়ার্ডের মেম্বার প্রার্থীদের জয়ী করে নেয়ার বিষয়ে গোপন বৈঠক করছে।
তিনি অভিযোগ করেন, তার পক্ষে কোন নেতা-কর্মী কিংবা সমর্থক প্রচারণায় নামতে চাইলে তাদের বিভিন্নভাবে ভয়-ভীতি প্রদর্শন করছে আওয়ামী লীগের প্রার্থী মাহাতাব হোসেন সুরুজের লোকেরা। মাঠে নামলে পুলিশ দিয়ে ধরিয়ে চুরি, ডাকাতী সহ বিভিন্ন মামলায় ঢুকিয়ে দেয়ার হুমকি দিচ্ছে বলে অভিযোগ বিএনপি প্রার্থী সাবু’র।
এদিকে বরিশাল সদরের পাশাপাশি আওয়ামী লীগ প্রার্থীদের নির্বাচনী সহিংসতা, আচরণ বিধি লঙ্গন এবং ভয়-ভীতি প্রদর্শন থেমে নেই বরিশাল জেলা সহ অন্যান্য জেলা এবং উপজেলার ইউনিয়ন গুলোতেও। জাতীয়পার্টি থেকে লিখিতভাবে অভিযোগ করা হয়েছে বাকেরগঞ্জের পাদ্রিশিবপুর ইউনিয়নের ৫নং ওয়ার্ডের মেম্বার প্রার্থী রফিক খানকে প্রার্থীতা প্রত্যাহারের জন্য মারধর ও জুতা পেটা করেছে আওয়ামীলীগ প্রার্থীর কর্মী সমর্থকরা। আগৈলঝাড়ার রতœপুর ইউনিয়নের জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান প্রার্থী শফিকুল ইসলামকে প্রার্থীতা প্রত্যাহারের জন্য হুমকি দিয়েছে আওয়ামীলীগের প্রার্থী মোস্তফা সরদার। এই ইউনিয়নে বিএনপি’র মনোনিত প্রার্থীও পালিয়ে আছেন আওয়ামীলীগ প্রার্থীর লোকজনের ভয়ে। এছাড়া খাঞ্জাপুর ইউপিতে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান প্রার্থীকে প্রার্থীতা প্রত্যাহারের জন্য অকথ্য ভাষায় গালাগাল এবং হুমকি দিয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে আওয়ামীলীগের চেয়ারম্যান প্রার্থীর বিরুদ্ধে।
গত ২২ ফেব্রুয়ারি মঠবাড়িয়া উপজেলার টিকিকাটা ইউনিয়নের স্বতন্ত্র চেয়ারম্যান প্রার্থী হোসাইন মোশারফ সাকুকে অপরহণ করে ক্ষমতাসীন আওয়ামীলীগের প্রার্থী রফিকুল ইসলাম রিপন জমাদ্দার এবং তার সমর্থকরা। নির্বাচন থেকে সরে দাড়াতে বাধ্য করতেই তাকে অপহরণ করা হয় বলে অভিযোগ স্বতন্ত্র প্রার্থীর। একই দিন আওরাবুনিয়া ইউনিয়নে চেয়ারম্যান প্রার্থীর সমর্থক ছাত্রলীগ নেতা সিব্বিরকে কুপিয়ে জখম করে প্রতিপক্ষরা।
২৩ ফেব্রুয়ারি পটুয়াখালীর বাউফলের ধুলিয়া ইউনিয়নে আওয়ামীলীগ এবং বিএনপির চেয়ারম্যান প্রার্থীর মাঝে সংঘর্ষ হয়। এসময় আওয়ামীলীগ প্রার্থীর সমর্থকরা বিএনপি প্রার্থীর সমর্থক ইউনিয়ন বিএনপি ও যুবদলের ১০ নেতা কর্মীকে কুপিয়ে ও পিটিয়ে গুরুতর আহত করে।
এছাড়া ভোলার উত্তর দীঘলদী ইউনিয়নের আওয়ামীলীগ এবং বিএনপির দুই চেয়ারম্যান প্রার্থীর সমর্থকদের মাঝে তুমুল সংঘর্ষ হয়। এতে উভয় পক্ষের কমপক্ষে ২৫ জন আহত হয়। তবে আহতদের মধ্যে বিএনপি নেতা-কর্মীদের সংখ্যাই ছিলো বেশি।
গত ২৪ ফেব্রুয়ারি মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলার ভাষানচর ইউনিয়নের ৮নং ওয়ার্ডে আওয়ামী লীগ সমর্থিত মেম্বার প্রার্থী কবির হোসেনকে হাতুড়ি পেটা করে দলের বিদ্রোহী প্রার্থী সাহাবুদ্দিন ফকিরের সমর্থকরা। ইউনিয়নের বর্তমান চেয়ারম্যানের সামনে উপজেলা নির্বাচন অফিসে এই ঘটনার সময় চেয়ারম্যান প্রার্থীকেও লাঞ্ছিত করেন ইউনিয়ন আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক ও ওয়ার্ড মেম্বার প্রার্থী সাহাবুদ্দিন।
এদিকে বিএনপি’র একাধিক প্রার্থী আশংকা করে বলেন, নির্বাচন যতই ঘনিয়ে আসছে আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা ততটাই বেপরোয়া হয়ে উঠছে। যে কারণে মানুষের কাছে গিয়ে কি ভাবে ভোট চাইবো তাই বুঝতে পারছি না।
তারা আরো বলেন, শুধুমাত্র আওয়ামীলীগের প্রার্থী এবং তাদের সমর্থকরাই নয়, নাশকতা মামলার পরিকল্পনার অভিযোগ সহ বিভিন্ন কথা বলে হয়রানি করছে পুলিশও। শেষ পর্যন্ত নির্বাচন গ্রহণ যোগ্য হবে না দাবী করে বিএনপি এবং জাতীয় পার্টির বরিশাল সদরের ১০ ইউনিয়নের প্রার্থীরা বলেন, আওয়ামীলীগের প্রার্থী এবং তাদের সমর্থকরা যে ভাবে সন্ত্রাসী কর্মকান্ড শুরু করেছে তাতে সাধারণ ভোটাররাও কেন্দ্রে যেতে সাহস পাবে না। তাই ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে সেনা এবং বিজিবি মোতায়েনের দাবীও তোলেন প্রার্থীরা।