আসামীদের ভয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছে বানারীপাড়ার জাসদ নেতা হুমায়ুন কবির হত্যা মামলার সাক্ষিরা

রুবেল খান আসামীদের ভয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছে বানারীপাড়ার জাসদ নেতা সৈয়দ হুমায়ুন কবির হত্যা মামলার সাক্ষিরা। ইউপি চেয়ারম্যান এবং সর্বহারা নেতা জিয়াউল হক মিন্টু ও তার সন্ত্রাসী বাহিনীর নির্দেশ উপেক্ষা করে সাক্ষি হওয়ায় তাদের ফাঁসানো হচ্ছে একের পর এক মামলায়। বিশেষ করে মামলার প্রধান সাক্ষি এবং ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী খলিল হাওলাদারকে ফাঁসিয়েছেন একাধিক নাটকিয় মামলায়। এমনকি মামলার বাদীকে প্রকাশ্যে হত্যার চেষ্টাও করেছেন বানারীপাড়ার সলিয়াবাকপুর ইউপি চেয়ারম্যান জিয়াউল হক মিন্টু ও চাখারের সাবেক চেয়ারম্যান মজিবুল হক টুকু সহ অন্যান্য আসামীরা। এসব কারনে জাসদ নেতা হত্যা মামলার সাক্ষিরা রয়েছেন আতংকে।

বানারীপাড়া উপজেলা জাসদ এর সাংগঠনিক সম্পাদক সৈয়দ হুমায়ুন কবির হত্যা মামলা সূত্রে জানা গেছে, ২০১৩ সালের ১৯ জুলাই সলিয়াবাকপুর ইউপি চেয়ারম্যান জিয়াউল হক মিন্টু ও চাখারের সাবেক চেয়ারম্যান মজিবুল হক টুকুর সন্ত্রাসী বাহিনী কর্তৃক নির্মম ভাবে খুন হয় জাসদ নেতা সৈয়দ হুমায়ুন কবির। প্রকাশ্য দিবালোকে তাকে হত্যার ঘটনা খুব কাছে থেকেই প্রত্যক্ষ করে স্থানীয় শত শত মানুষ। এসময় তারা বাধা দিতে গেলেও সন্ত্রাসী বাহিনী তাদেরকেও হত্যার হুমকি দেয়। যে কারনে পরবর্তীতে হত্যাকান্ডের ঘটনায় মামলা হলেও প্রত্যক্ষদর্শী অনেক সাক্ষিই হত্যাকারী সরকার দলীয় ক্যাডার মিন্টু এবং টুকু বাহিনীর ভয়ে আদালতে সাক্ষি দিতে রাজি হয়নি। তবে তার মধ্যে থেকে প্রত্যক্ষদর্শী সহ ৪৪ জন ব্যক্তি হত্যা মামলায় সাক্ষি দিতে আগ্রহ প্রকাশ করে। এমনকি সাক্ষির নাম লিপিবদ্ধ করা হয়েছে এজাহারেও।

এদিকে বর্তমান ক্ষমতাসীন দল এবং পূর্বে সর্বহারা দলের নেতা ও সদস্যদের বিরুদ্ধে সাাক্ষি দিয়ে বিপদে পড়তে হয়েছে ঐ ৪৪ জন সাক্ষিকেই। কেননা মামলা দায়েরের পর থেকেই সন্ত্রাসী বাহিনীর সদস্যরা অনবরত হুমকি দিয়ে আসছে তাদের। এর ফলে অনেক সাক্ষি পালিয়ে আত্মগোপনে রয়েছে। যারা সাহস দেখিয়ে প্রকাশ্যে থাকছেন তাদের ফাঁসানো হচ্ছে একের পর এক ষড়যন্ত্রমূলক মামলায়। তারই একটি বাস্তব নজির এই হত্যা মামলার প্রত্যক্ষদর্শী এবং দুই নম্বর সাক্ষি মো. খলিল হাওলাদার (৪৫)।

ইউনিয়নের মাদারকাঠি গ্রামের বাসিন্দা এবং মৃত আ. ওয়াজেদ হাওলাদারের ছেলে হত্যা মামলার সাক্ষি ভ্যান চালক মো. খলিল হাওলাদারের বিরুদ্ধে করা হচ্ছে মাদক সহ বিভিন্ন আইনে একের পর এক মামলা। এ পর্যন্ত তিনি কয়টি মামলার আসামী হয়েছেন তা হয়তো তিনি নিজেও ভালোভাবে বলতে পারবেন না। সব থেকে বড় আশ্চর্য জনক বিষয় হচ্ছে বানারীপাড়া উপজেলার সলিয়াবাকপুর ইউপি’র ছোট একটি গ্রামের বাসিন্দা খলিল নিজ জেলা বরিশালকেই ভালো ভাবে চেনেন না। অথচ পঞ্চগর থানায় নাটকিয় ভাবে এজাহার নামিও আসামী হয়েছেন তিনি।

খলিল ছাড়াও মামলার ৩ নম্বর সাক্ষি এবং ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী কৃষ্ণপুর গ্রামের মৃত ছোমেদ তালুকদারের ছেলে জাফর তালুকদার (৪৫) এবং মাদারকাঠি গ্রামের মৃত শেখ আ. হাকিম এর ছেলে শেখ আনোয়ার হোসেন (৪৫) সহ অন্যান্য সাক্ষিরাও একই ভাবে ষড়যন্ত্রমূলক মিথ্যা অভিযোগের মামলায় ফেঁসেছেন। তারা অজানা অভিযোগে আসামী হওয়ার তেমন কোন কারন খুঁজে পাচ্ছে না। যে কারনে সাক্ষিদের বিরুদ্ধে একের পর এক হওয়া মামলার পেছনে সলিয়াবাকপুর ইউপি চেয়ারম্যান জিয়াউল হক মিন্টু ও চাখারের সাবেক চেয়ারম্যান মজিবুল হক টুকু’র হাত রয়েছে এবং তারাই ষড়যন্ত্রমূলক ভাবে এসব মামলা করিয়েছে বলে অভিযোগ সাক্ষিদের।

সরেজমিনে মামলার আসামীর খোঁজ করতে গেলে অধিকাংশ সাক্ষিদেরকেই তাদের নিজ গ্রামে খুঁজে পাওয়া যায়নি। তারা সবাই মিন্টু এবং টুকু বাহিনীর হুমকিতে ঢাকা সহ দেশের বিভিন্ন স্থানে আত্মগোপনে রয়েছে বলে দাবী করেছে পরিবারের স্বজনরা। তাছাড়া সাক্ষির স্বজনরা গ্রামে থাকলেও তাদের উপরেও চলছে অনবরত হত্যা এবং গুমের হুমকি। এমনকি মাদক দিয়ে প্রশাসনের মাধ্যমে তাদের গ্রেপ্তারের ভয় ভীতিও দেখানো হচ্ছে তাদের।

অপরদিকে মামলার বাদী নিহত জাসদ নেতার ভাই সৈয়দ তরিকুল ইসলাম আপুকেও বেশ কয়েকবার হত্যা চেষ্টা চালিয়েছে সাবেক ও বর্তমান দুই ইউপি সদস্য এবং তাদের ক্যাডার বাহিনী। এই ঘটনায় ২০১৩ সালের পর এ পর্যন্ত দুই সন্ত্রাসী সহ তাদের বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে জীবনের নিরাপত্তা চেয়ে থানায় সাধারন ডায়েরীও করা হয়েছে একাধিক। কিন্তু তার পরেও বহাল তবিয়তে রয়েছে এক সময়ের সর্বহারা বাহিনীর অন্যতম সদস্য সলিয়াবাকপুরের ইউপি চেয়ারম্যান জিয়াউল হক মিন্টু ও সাবেক চেয়ারম্যান মজিবুল হক টুকু।

এদিকে বানারীপাড়ার জাসদ নেতা সৈয়দ হুমায়ুন কবির এর হত্যা মামলা নিয়ে আজকের পরিবর্তনে ধারাবাহিক প্রতিবেদন প্রকাশের পরে এলাকা জুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। সুদূর বানারীপাড়া থেকে পত্রিকা সংগ্রহের জন্য পরিবর্তন কার্যালয়ে এসেছে অনেক মানুষ। সন্ত্রাসী ও সর্বহারা নেতাদের বিরুদ্ধে সাহসি প্রতিবেদন প্রকাশের জন্য সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদককে মোবাইল ফোনের মাধ্যমে ধন্যবাদও জানিয়েছেন অনেকে। এমনকি সন্ত্রাসী বাহিনীর গড ফাদার জিয়াউল হক মিন্টুর বিরুদ্ধে দিয়েছেন আরো গুরুত্বপূর্ণ তথ্য। যা পর্যায়ক্রমে তুলে ধরা হবে পরিবর্তনের পাতায়।

অপরদিকে সন্ত্রাসীদের গড ফাদার ইউপি চেয়ারম্যান জিয়াউল হক মিন্টু’র অপরাধ জগতের ফিরিস্তি প্রকাশিত হলেও টনক নড়েনি প্রশাসনের। রহস্যজনক কারনে নিরব দর্শকের ভূমিকা পালন করছে তারা। তবে অভিযোগ উঠেছে সরকার দলীয় চেয়ারম্যান হওয়ায় মিন্টু কিংবা তার বাহিনীর বিরুদ্ধে এ্যাকশনে যেতে পারছে না প্রশাসন।

এদিকে পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশের পরে এলাকাবাসির মাধ্যমে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী চার্জশীটভূক্ত আসামী জিয়াউল হক মিন্টু সহ অন্যান্য আসামীরা শুধু জাসদ নেতা হুমায়ুন কবিরকেই হত্যা করেনি। এর পূর্বে মিন্টু ও টুকুর সন্ত্রাসী বাহিনী হত্যা করে বানারীপাড়ার অপর হুমায়ুন কবির ওরফে সিকদার হুমায়ুন নামের এক ছাত্রদল নেতাকেও। কিন্তু ঐ ঘটনাটি খুন হওয়া ছাত্রদল নেতার সৎ মায়ের সহযোগিতায় নামে মাত্র ক্ষতিপূরণের বিনিময়ে হত্যা মামলা ধামা চাপা পড়ে যায়।

সূত্রগুলো তাদের নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বানারীপাড়ার সন্ত্রাসী জগদের আতংক জিয়াউল হক মিন্টু’র সেকেন্ড ইন কমান্ড হিসেবে কাজ করছে সলিয়াবাকপুরের বাসিন্দা সন্ত্রাসী সোহাগ হাওলাদার। মিন্টুর হয়ে তার সকল অপরাধমূলক কর্মকান্ড নিয়ন্ত্রন করছে সে। এলাকায় যাত্রা-জুয়া, মাদক ও অস্ত্র ব্যবসা, চাঁদাবাজী এবং টেন্ডারবাজী থেকে শুরু করে মিন্টুর সকল অপকর্ম নিয়ন্ত্রন করে অবৈধ টাকায় কোটিপতি বনে গেছে সোহাগও। মিন্টু এবং তার বাহিনীর সদস্যরা যে অপরাধই করছে তা ক্ষমতাসিন দলের নাম ভাঙ্গিয়ে করছে। অবশ্য চেয়ারম্যান মিন্টু বাহিনীকে প্রশাসনের একটি অসাধু চক্র আড়ালে থেকে সহযোগিতা করছে বলেও সূত্রগুলো অভিযোগ করেছে। যে কারনে হত্যা সহ একের পর এক অপরাধমূলক কর্মকান্ড পরিচালনা করেও বহাল তবিয়তে রয়ে গেছে সলিয়াবাকপুর ইউপি’র চেয়ারম্যানের আড়ালে ভয়ঙ্কর সন্ত্রাসী জিয়াউল হক মিন্টু ও তার ক্যাডার বাহিনী।