আলহাজ্ব গোলাম মাওলা এক বর্নাঢ্য জ্বলন্ত ইতিহাসের নাম

মহসিন উল ইসলাম হাবুল॥ ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ করে বরিশাল শহরে নতুন আঙ্গিকে প্রথম পা রাখার সাথে যে মানুষটির সাথে আমার পরিচয় হয়েছিল তিনিই গোলাম মাওলা। মুুক্তিযুদ্ধের রণাঙ্গনের বেইজ কমান্ডার রফিকুল ইসলাম জাফর আমাদের ক’জন যুবককে গোলাম মাওলা সাহেবের বাসায় তার হাতে দিয়ে বললেন ওরা আপনার বাসায় থাকবে। তিনি সাদরে বেশ কয়েকদিন আমাদের তার বাসায় থাকার ব্যবস্থা করলেন। সন্তানের মত ¯েœহ দিয়ে যে দিনগুলি তার বাসায় রাখলেন সেই স্মৃতির কথা আজও ভুলতে পারছি না। সেই থেকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত আমারা গভির থেকে গভীরতর পরামর্শ পেয়েছি। তা আজও আমার চলার পথের পাথেয়। মাঝপথে দীর্ঘসময় রাজনীতির পথ পরিক্রমায় প্রকাশ্যে চলাফেরা না করতে পারায় গোলাম মাওলা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিলাম। এরপর
আবার আশির দশক থেকে একদম এক আত্মা এক প্রান হয়ে দেশের কল্যানে মানুষের উপকারে রাজনীতি করা এবং বরিশালের মানুষের বিভিন্ন অধিকার ও দাবী প্রতিষ্ঠায় তার সুমহান নেতৃত্বে অনেক কাজ করেছি। যা লিখতে হলে হাজারো পৃষ্ঠার ইতিহাস হয়ে যাবে। সে লেখার ইচ্ছা আমার আছে। ১৯৮৪ সালে তিনি বরিশাল পৌরসভার নির্বাচিত চেয়ারম্যান হিসাবে কাজ করে গেছেন। পরবর্তীতে তার উপর ভিত্তি করে বরিশাল পৌরসভা, সিটি কর্পোরেশনের কাজ হয়েছে। অর্থাৎ আধুনিক বরিশালের রূপকারই গোলাম মাওলা আজকের নগর ভবন, কেন্দ্রীয় বাস টারমিনাল, পোর্ট রোডের বড় ব্রীজ, পলাশপুরের গুচ্ছগ্রাম, ষোল শহর পানি প্রকল্পসহ অগণিত কাজের উদাহরণ দেয়া যায়, যা গোলাম মাওলার সুমহান নেতৃত্বে হয়েছে। আলহাজ্ব গোলাম মাওলা তার রাজনৈতিক দর্শনের জন্য কারো কাছে মাথা নত করেনি। আমার দেখা ও জানামতে, গোলাম মাওলার দরজা দলমত ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকলের কাছে খোলা ছিল। বিরক্তি কাকে বলে তিনি জানতেন না। ধৈর্যশীল ব্যক্তিত্বের উদাহরণ দিলে তার নামটা এক নম্বরে এসে যাবে সকলের কাছে। যে তার একবার সান্নিধ্য পেয়েছে সে আর তার কাছ থেকে অন্যত্র যেতে পারেনি। গোলাম মাওলা ম্যাগনেটের মত ছিল। সকলেই কেমন যেন আকর্ষিত হয়ে যেত। এক অনন্য ব্যক্তি ছিলেন তিনি। শিষ্যের জন্য তিনি যা করেছেন তা এক বিরল দৃষ্টান্ত। বরিশাল ইসলামিয়া কলেজ, দলিল উদ্দীন মাধ্যমিক বিদ্যালয়সহ অগণিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ার ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন মূল রূপকার। ধর্মপরায়ন এই মানুষটি নিবেদিতভাবে মজজিদ, মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠায় সাহসী ভূমিকা রেখে তা প্রতিষ্ঠা করেছে। সদালাপী গোলাম মাওলার মধ্যে কোন দিন দেমাগ, হিংসা, পরশ্রীকাতরতা দেখিনি। কিন্তু তিনি যে মাপের মানুষ ছিলেন তাতে তিনি দেমাগ করতে পারতেন। বাংলাদেশে ক্ষমতাধর রাজনৈতিক নেতা, আমলা, পুলিশ, সেনাবাহিনীসহ সকল উর্ধ্বতনদের সাথে তার ছিল ঘনিষ্টতা। আর এর সুবাদে তিনি বরিশালে জনহিতকর অনেক কাজ করেছেন যা দৃশ্যমান। প্রয়াত মেয়র শওকত হোসেন হিরন, বর্তমান মেয়র আহসান হাবিব কামাল গোলাম মাওলার ¯েœহধন্য এবং তার কাছ থেকেই জনকল্যান মূলক কাজ শিখেছেন। গোলাম মাওলা ছিলেন একজন সফল ব্যবসায়ী, রাজনীতিবিদ, শিক্ষানুরাগী ও সমাজসেবক। যার তুলনা শুধু তিনিই।
বরিশালের মানুষের অধিকার, দাবী প্রতিষ্ঠার বড় বড় আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছেন তিনি। বরিশাল বিভাগ ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার অগ্নিঝড়া আন্দোলনের আহবায়ক ছিলেন আলহাজ্ব গোলাম মাওলা। মাওয়ায় পদ্মা সেতু প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের আহবায়ক ছিলেন তিনি। বরিশাল-ঢাকা, ঢাকা-বরিশাল বাংলাদেশ বিমান চলাচলের আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছেন তিনি। তিনি একজন সফল লঞ্চ ব্যবসায়ী ও শিল্পপতি ছিলেন। এটা আমাদের গর্ব। তিনি মানুষের যে আর্থিক সহযোগীতা করে গেছেন তা প্রশংসার দাবী রাখে। বরিশালের মানুষের আকাঙ্খা, স্বপ্ন কি। সবার আগে সেই স্বপ্ন আকাঙ্খাকে সূর্যের আলোতে নিয়ে এসে তা বাস্তবায়নের জন্য কাজ শুরু করে দিতেন। গোলাম মাওলা যা করতেন তা একা করতেন না। সকলের সাথে পরামর্শ করে করতেন। গৃর্জ্জামহল্লা হযরত লেচুশাহ মাজারকে কেন্দ্র করে আজ যে প্রতিষ্ঠান ও কল্যানমূলক কাজ চলছে ও হয়েছে তা গোলাম মাওলার অবদান। হৃদয় দিয়ে তিনি মানুষকে ভালবাসতেন। রাগ শব্দটি মনে হয় তার জানাই ছিল না। তিনি খুব বই পড়তেন। নানা লেখকের বই তিনি পড়েছেন। জ্ঞানী মানুষ ছিলেন তিনি। তার স্বপ্ন ছিল ভোলার শাহবাজপুর থেকে বরিশালে গ্যাস আনা। স্বপ্ন ছিল বরিশালে সর্ব প্রকার আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা। তার আশা ছিল বরিশালে রেলপথ আসুক। লেবার কোর্ট প্রতিষ্ঠা হোক। মাথা গোজার যারা ঠাই পাচ্ছে না, তাদের মাথা গোজার ঠাঁই করার স্বপ্ন ছিল তার। বাস্তবায়িত করতে চেয়েছিল বরিশালের সাধারন যাত্রীদের সুবিধার জন্য লঞ্চে রোটেশন প্রথা বাতিল করতে। তার এ স্বপ্ন থেকে গেছে। তিনি আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন না ফেরার দেশে। আমরা গোলাম মাওলার স্বপ্ন বাস্তবায়নে এগিয়ে যাই। এই প্রত্যাশা থাকল।