আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় আটকে আছে ৯ প্রকল্প ॥ নিদ্রাহীন ভাঙ্গন কুলে মানুষ

রুবেল খান ॥ বর্ষা কিংবা জোয়ারের পানি বাড়লেই নিদ্রাহীন রাত কাটে জেলার নদীর তীরে ভাঙ্গন কুলের মানুষের। চোখে-মুখে ভেসে উঠে ভাঙ্গনের কবলে ভিটা-মাটি ও হারানোর আতংক। বছরের পর বছর বরিশাল জেলা ও মহানগর জুড়ে বিভিন্ন নদীর ভাঙ্গন অব্যাহত থাকলেও স্থায়ী কোন সমাধান দিতে পারছে না পানি উন্নয়ন বোর্ড কর্তৃপক্ষ। নদী ভাঙ্গন প্রতিরোধে ৬/৭ বছর ধরে ৯টি প্রকল্প গ্রহন করা হলেও তা আদৌ বাস্তবে রূপ নেয়নি। আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘ সূত্রিতা আর তহবিল সংকটে আটকে আছে প্রকল্পগুলো। ফলে দিনে দিনে ভাঙ্গনের তীব্রতা ও ভাঙ্গন কবলিত এলাকার আকার বেড়েই চলেছে। ইতিমধ্যে বরিশালের মানচিত্র থেকে হারিয়ে গেছে বহু গ্রাম ও স্থাপনা।
বরিশাল পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলীর দপ্তর সূত্রে জানাগেছে, নদীমতৃক অঞ্চল বরিশাল। এই অঞ্চলের চার দিক থেকে বয়ে গেছে কীর্তনখোলা, মেঘনা, আড়িয়াল খা, সন্ধ্যা, সুগন্ধা, কয়লা ও জয়ন্তী সহ বেশ কিছু নদী। এসব নদীতে দীর্ঘ দিন ধরে ধরেই ভাঙ্গন চলছে। যা বর্তমানে আরো তীব্র আকার ধারন করেছে। ভাঙ্গনে নদী গর্ভে শেষ সম্বল ভিটামাটি, ফসলি জমি এবং ব্যবসা প্রতিষ্ঠান হারিয়ে পথে বসেছে অসংখ্য পরিবার। নদী ভাঙ্গনের থেকে উপকুলবাসীদের রক্ষায় গত ৭ বছরে এ পর্যন্ত বড় ধরনের ৯টি নদী শাসন প্রকল্প গ্রহন করেছে বরিশাল পানি উন্নয়ন বোর্ড কর্তৃপক্ষ। যার একটিও আলোর মুখ দেখেনি।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলীর দেয়া তথ্য অনুযায়ী, কীর্তনখোলার অব্যাহত ভাঙ্গনে নগরীর শহরতলী চরবাড়িয়া ও বেলতলা বেসরকারি দুটি শিপ ইয়ার্ড সহ এলাকার বহু বসতবাড়ি, বাগান, এবং ফসলী জমি বিলীন হয়েছে। ভাঙ্গনের কবলে প্রায় ১৯ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত চালুর অপেক্ষায় থাকা বিসিসি’র সার্ফেস ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্টের সিংহভাগ অংশ বিশেষ নদী গর্ভে বিলীন হয়েছে। নদী ভাঙ্গনের হাত থেকে সরকারি-বেসরকারি স্থাপনা রক্ষায় গত প্রায় চার বছর পূর্বে বেলতার ৪ দশমিক ৫১০ কিলোমিটার তীর রক্ষা বাঁধ নির্মান প্রকল্প গ্রহন করে মন্ত্রনালয়ে পাঠায় পানি উন্নয়ন বোর্ড। যার আর্থিক ব্যয় নির্ধারন করা হয় ৩৩১ কোটি ২৩ লক্ষ ৯৯ হাজার টাকা। গত চার বছরে প্রকল্পটির তেমন কোন অগ্রগতী হয়নি। পরিকল্পনা কমিশনে প্রি-একনেকের সভা শেষ করে একনেকের অনুমোদনের জন্য গত ২ বছর যাবৎ অপেক্ষমান রয়েছে।
এদিকে নগরীর অদুরে সদর উপজেলার চরকাউয়া ফেরীঘাট এলাকায় গত তিন থেকে চার বছর পূর্বে ভাঙ্গন শুরু হয়। সর্বশেষ চলতি বছরের মাস খানেক পূর্বে হঠাৎ ভাঙ্গনে নদী গর্ভে বিলিন হয়েছে বহু স্থাপনা। এই এলাকায় ভাঙ্গন শুরুর দিকে প্রথম পর্যায়ে আপদকালিন জরুরী প্রতিরোধের অংশ হিসেবে ২০ লাখ টাকা ব্যয়ে জিও ব্যাগ ফেলা হয়েছিলো। পাশাপাশি তখনকার সময়ে চরকাউয়ার ভাঙ্গন এলাকায় এক কিলোমিটার জুড়ে ব্লক ফেলে বাঁধ নির্মান প্রকল্প গ্রহন করে পাউবো কর্তৃপক্ষ। ৪৫ কোটি টাকার এই প্রকল্পটি বোর্ডের অনুমতি লাভ করলে তা মন্ত্রনালয়ে অনুমোদনের জন্য প্রেরন করা হয়। কিন্তু প্রি-একনেক কিংবা একনেক তো দুরের কথা গত প্রায় দেড় বছরেও মন্ত্রনালয় থেকে প্রকল্পটির অনুমোদন মেলেনি। কিন্তু থেমে থাকেনি নদীর ভাঙ্গন। প্রকল্পের অনুমোদনের অপেক্ষায় থাকতে গিয়ে সম্প্রতি চরকাউয়া এলাকায় পুনরায় ভাঙ্গনে নদী গর্ভে বিলিন হয়েছে বহু স্থাপনা।
এদিকে সুগন্ধা নদীর ভাঙ্গন রোধে নেয়া দুটি প্রকল্পের তেমন অগ্রগতি নেই। সুগন্ধা নদীর ভাঙ্গন হতে রহমতপুর এলাকাধীন বিমানবন্দর ও আবুল কালাম ডিগ্রী কলেজ, তৎসংলগ্ন আড়িয়াল খাঁ নদীর ভাঙ্গন হতে মুলাদীর মীরগঞ্জ ফেরীঘাট, মীরগঞ্জ বাজার সহ মূল্যবান সম্পদ রক্ষায় গত সাড়ে চার বছর পূর্বে প্রকল্প গ্রহন করে পাউবো কর্তৃপক্ষ। চার কিলোমিটার জুড়ে নদী শাসন ও বাঁধ প্রকল্প ব্যয় নির্ধারন করা হয় ৩৬৪ কোটি ৯২ লাখ ৬৫ হাজার টাকা। কিন্তু সাড়ে চার বছরে প্রকল্পের অগ্রগতি হয়েছে শুধুমাত্র বোর্ডের প্রকল্প যাচাই-বাচাই কমিটি পূন.গঠনের নির্দেশ পর্যন্ত। যা গত চার বছর যাবত পুনঃগঠন প্রক্রিয়া মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে। আদৌ এর বাস্তবায়ন হবে কিনা তা নিয়ে প্রশ্নের অবকাশ নেই।
মেঘনা নদীর ভাঙ্গন হতে মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলাধীন উলানিয়া-গবিন্দপুর রক্ষায় ২ কিলোমিটার স্থায়ী ব্লক বাঁধ নির্মান প্রকল্পও ঝুলে আছে। গত প্রায় দুই বছর পূর্বে পাসম-এ যাচাই বাচাই সভা হয়েছে ৩৯৫ কোটি ৯৪ লক্ষ ৩২ হাজার টাকার এই প্রকল্পটি নিয়ে। একই অবস্থানে রয়েছে কয়লা নদী (খাল) ভাঙ্গন হতে মুলাদীর বাহাদুরপুর গ্রাম ভাঙ্গন রোধ প্রকল্প। উপজেলার কাজীরচর ইউনিয়নের বাহাদুরপুর গ্রামের ভাঙ্গন রোডে ৩ দশমিক ২ কিলোমিটার বাঁধ নির্মানে ৯৯ কোটি ৯ লাখ ৫০ হাজার টাকার একটি প্রকল্প গ্রহন করে গত তিন বছর পূর্বে বোর্ডের অনুমতির জন্য প্রেরন করা হয়েছিলো।
এর আগে গত ছয় বছর পূর্বে বরিশাল-ঢাকা মহাসড়কের বাবুগঞ্জে বীর শ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টিন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গী (দোয়ারিকা) সেতু’র বরিশাল প্রান্ত রক্ষায় শূণ্য দশমিক ৭৬০ কিলোমিটার বাঁধ এবং তৎ সংলগ্ন নদীতে ড্রেজিং প্রকল্প গ্রহন করা হয়। সড়ক ও জনপদের পক্ষে ১১ কোটি ১৫ লাখ টাকার এই প্রকল্পটি বাস্তবায়নের লক্ষে স্টাডি, ডিজাইন এর কাজ সম্পন্ন হয়েছে। এখানে ব্লক বাঁধ ছাড়াও ৪৭ হাজার জিও ব্যাগ ফেলার কথা ছিলো সওজ কর্তৃপক্ষের। কিন্তু আদৌ তা হয়নি। তবে এই প্রকল্পের অগ্রগতীর অংশ হিসেবে সওজ এর পক্ষে ডিপোজিট ওয়ার্ড হিসেবে বাস্তবায়নের লক্ষ্যে প্রকল্প প্রনয়ন করে প্রকল্পটি সওজ অধিদপ্তরে প্রেরন করেছে পানি উন্নয়ন বোর্ড।
অপরদিকে সন্ধ্যা নদীর ভাঙ্গন হতে বাবুগঞ্জ উপজেলার দেহরগতি ইউনিয়নের অন্তর্গত উত্তর বাহেরচর বাজার ও তৎসংলগ্ন এলাকা রক্ষায় ১৩ কোটি ৬২ লাখ ৮৩ হাজার ব্যয় সাপেক্ষে এক কিলোমিটার বাঁধ নির্মান প্রকল্প গ্রহন করা হয়েছি। যা বোর্ডের সভা এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রনালয়ের অনুমোদন শেষে প্রেরন করা হয়েছে বন ও পরিবেশ মন্ত্রনালয়ে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলায় মেঘনা নদীর ভাঙ্গন হতে হিজলা উপজেলার হরিনাথপুর ইউনিয়ন কমপ্লেক্স, বাজার, লঞ্চঘাট ও তৎসংলগ্ন এলাকা রক্ষায় দ্বিতীয় পর্যায়ে একটি একটি প্রকল্প গ্রহন করা হয়। ৯ কোটি ৮৮ লাখ ৭২ হাজার টাকা ব্যয় সাপেক্ষে শূণ্য দশমিক ৫৬০ কিলোমিটার নদীর তীর রক্ষা বাঁধ প্রকল্পটি বোর্ডেই আটকে আছে। বোর্ডের যাচাই বাচাই কমিটির নির্দেশনা অনুযায়ী প্রকল্প পুন.গঠন কাজ প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। এছাড়া জলবায়ু পরিবর্তন প্রভাব মাকাবেলায় জয়ন্তী নদীর ভাঙ্গন হতে মুলাদী উপজেলাধীন নাজিরপুর ইউনিয়নের দক্ষিণ নাজিরপুর থেকে ঘোষের চর খেয়াঘাট পর্যন্ত শূণ্য দশমিক ৬০০ কিলোমিটার এলাকা রক্ষায় বাঁধ নির্মান প্রকল্পটিও বোর্ডের যাচাই বাচাই কমিটির নির্দেশনা অনুযায়ী প্রকল্প পুন.গঠন পূর্বক প্রকল্প প্রস্তাবনা বোর্ডে দাখিল করা হয়েছে। কিন্তু ওই প্রস্তাবনা এখনো বোর্ডের যাচাই বাচাই কমিটিতে উত্থাপন হয়নি।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের পওর বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ আবু সাঈদ জানান, অন্যান্য দপ্তরের থেকে পানি উন্নয়ন বোর্ডের কার্যক্রম অনেকটাই আলাদা। একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে হলে বিভিন্ন ধাপ পেরিয়ে আসতে হয়। বোর্ড, মন্ত্রনালয়, প্রি-একনেক এবং একনেকের অনুমোদন শেষে দরপত্র এবং সর্ব শেষে কার্যাদেশ। এসব প্রক্রিয়া বাস্তবায়ন করতে গিয়ে দীর্ঘ সময় লেগে যাচ্ছে।
তিনি বলেন, যেসব প্রকল্পগ্রহন করা হয়েছে সেখানে আপদকালীন প্রটেকশন ছাড়া স্থানীয় ভাবে কোন কাজ এই মহুর্তে সম্ভব নয়। প্রকল্পগুলো অনুমোদন হয়ে আসলে স্থায়ী ভাবে বাঁধ নির্মান করা হবে। কবে নাগাদ হবে সে সম্পর্কে কোন মন্তব্য করতে রাজি হননি পানি উন্নয়ন বোর্ডের এই কর্মকর্তা।