আমন আবাদের লক্ষ্যমাত্রা পূরণে শঙ্কা

নাছিম উল আলম॥ দক্ষিনাঞ্চল সহ সারা দেশে চলতি ‘খরিপ-২’ মৌসুমে প্রায় ৫২.৬০ লাখ হেক্টর জমিতে আমন আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারন করা হলেও অনা বৃষ্টির পরে অতি বৃষ্টির কারনে শ্রাবনের শেষ ভাগে এসেও লক্ষ্যমাত্রার অনেক পেছনে রয়েছে কৃষককুল। গতকাল পর্যন্ত দেশে মোট আমন আবাদের অগ্রগতি ছিল লক্ষ্যমাত্রার ২৫ ভাগের কিছু বেশী। চলতি মৌসুমে সারা দেশে স্থাণীয়, উচ্চ ফলনশীল-উফসী ও হাইব্রীড জাতের আমন আবাদের মাধ্যমে ১ কোটি ৩০ লাখ টন চাল পাবার লক্ষ্য স্থির করেছে কৃষি মন্ত্রনালয়। এরমধ্যে বরিশাল সহ দক্ষিনাঞ্চলের ১১ টি জেলায় আমন আবাদের লক্ষ্যমাত্রা স্থির করা হয়েছে ৮লাখ ১৩হাজার ৪৬৪হেক্টর। আর উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রাও প্রায় ১৭লাখ টনের কাছে বলে জানা গেছে।
সারা দেশে আমন দ্বিতীয় খাদ্য ফসল হিসেবে বিবেচিত হলেও খাদ্য উদ্বৃত এলাকা দক্ষিনাঞ্চলে তা এখনো প্রধান ফসল। বিশেষ করে বরিশাল বিভাগের ৬টি জেলার বেশিরভাগ জমিই এখনো এক ফসলী হওয়ায় আমন এঅঞ্চলের মূল ফসল হিসেবে বিবেচিত। যদিও সম্প্রতিককালে এ অঞ্চলেও বোরো আবাদ ও উৎপাদনে কিছুটা অগ্রগতি হয়েছে, তবে আবাদী জমি হিসেবে আমনের স্থান শীর্ষে। তবে এঅঞ্চলে আমনের আবাদ ও উৎপাদন এখনো সারা দেশের মতই পরিপূর্ণভাবেই প্রকৃতি নির্ভর। আর প্রকৃতি বিরূপ হলে প্রধান এ খাদ্য ফসলের বিপর্যয় কৃষকের সব আশা ভরসাকে চুর্ণ বিচুর্ণ করে দেয়।
চলতি মৌসুমে দেশে যে ৫২.৫৯লাখ হেক্টরে আমন আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারন করা হয়েছে, গতকাল পর্যন্ত তার বাস্তব অগ্রগিত ছিল ২৫%-এর মত। উত্তরাঞ্চলের কৃষকগন জ্যৈষ্ঠের শেষভাগ থেকেই আমন বীজতলা তৈরী করে আষাঢ়ের শেষভাগে তা রোপন শুরু করেন। আর দক্ষিনাঞ্চলে আষাঢ়ের মধ্য ভাগে বীজতলা তৈরী শুরু করে মধ্য শ্রাবন থেকে ভাদ্রের শেষভাগ পর্যন্ত উত্তোলিত বীজ রোপন করলেও এবার মৌসুমে শুরু থেকে বৃষ্টির অভাবে বীজতলা তৈরী কিছুটা বিলম্বিত হয়েছে। অনেক এলাকার কৃষকগন সেচ দিয়ে বীজতলা তৈরী করলেও বিলম্বিত বর্ষার কারনে তা ক্ষতিগ্রস্তও হয়েছে।
আবার গত জুনের আকষ্মিক লাগাতার বর্ষণে দক্ষিনাঞ্চল সহ অনেক এলাকার আমন বীজতলাই বিনষ্ট হয়েছে। সে ক্ষতি কাটিয়ে নতুন করে বীজতলা করার একমাসের ব্যবধানে গত ২৬জলাই থেকে ৩১জুলাই পর্যন্ত প্রথমে মৌসুমে নি¤œচাপ পরে ঘূর্ণিঝড় ‘কোমন’এর বয়ে আনা প্রবল বর্ষনের সাথে ফুসে ওঠা সাগরের জোয়ারে দক্ষিনাঞ্চলের বিপুল পরিমান বীজতলা বিনষ্ট হয়েছে। ফলে মৌসুমে অর্ধেক সময় অতিবাহিত হলেও দক্ষিনাঞ্চল সহ সারা দেশেই আমন আবাদের অগ্রগতি যথেষ্ঠ পিছিয়ে।
গতকাল পর্যন্ত উত্তরাঞ্চলের জেলাগুলোতে লক্ষ্যমাত্রার ৫০ভাগের মত আমন আবাদ সম্পন্ন হলেও বরিশাল সহ দক্ষিনাঞ্চলের ৬টি জেলায় অগ্রগতি শতকরা মাত্র ৩ ভাগের মত। ফরিদপুর অঞ্চলের ৫টি জেলায় গতকাল পর্যন্ত আবাদকৃত জমির পরিমান ছিল ৩৫%-এর মত। কৃষি সসম্প্রসারন অধিদপ্তরের দায়িত্বশীল সূত্রের মতে সারা দেশে ৫২লাখ ৫৯হাজার হেক্টর জমিতে আমন আবাদ লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে গতকাল পর্যন্ত অর্জিত সাফল্য ছিল ২৫%-এর মত।
তবে কৃষি সম্প্রসারন অধিদপ্তরের সরেজমিন উইং-এর দায়িত্বশীল সূত্রগুলোর আমন আবাদ নিয়ে এখনো তেমন কোন সমস্যার কথা বলছেন না। তাদের মতে, জুন ও জুলই-এর শেষ ভাগে দুদফার অতিবর্ষনের কারনে কিছু বীজতলা ও আগাম রোপা আমন ক্ষতিগ্রস্ত হলেও কৃষকরা নতুন করে বীজ রোপন সহ দক্ষিনাঞ্চলে এখনো নতুন বীজতলা তৈরীরও সময় ও সুযোগ রয়েছে । কৃষকরা ইতোমধ্যে সব ক্ষতি পেছনে ফেলে নতুন করে কোমড় বেঁধে মাঠে নেমে পরেছেন বলে গতকাল বরিশাল ও ফরিদপুর কৃষি অঞ্চলের অতিরিক্ত পরিচালকগন জানিয়েছেন।
তবে সরেজমিনে ঘুরে গতকাল পর্যন্ত দক্ষিনাঞ্চল সহ উপকূলভাগ জুড়ে আমনের জমিতে সম্প্রতিক অতিবর্ষন ও জোয়ারের প্লাবনের চিত্র লক্ষ্য করা গেছে। এসব এলাকার পানি বিপদ সীমার নিচে নেমে যেতে আরো এক সপ্তাহ থেকে দশদিনও লাগতে পারে বলে বিভিন্ন এলাকার কৃষকগন জানিয়েছেন। ততদিনে রোপা আমনের অস্তিত্ব ধরে রাখা সম্ভব নাও হতে পারে। এমনকি প্লাবন কবলিত বীজতলাও বিনষ্ট হবার সম্ভবনা বেশী বলে কৃষকগন জানিয়েছন। ফলে নতুন করে বীজতলা তৈরী সহ রোপনের প্রয়োজনীয়তাও দেখা দেবে বলে জানিয়েছেন বরিশাল, ভোলা, ঝালকাঠী, পটুয়াখালী, পিরোজপুর ও বরগুনার কৃষকগন। এতেকরে এবার আমনের আবাদ সম্পন্ন এবার যথেষ্ঠ বিলম্বিত হওয়াও অস্বাভাবিক নয় বলে মনে করছেন কৃষিবীদগন। এতে উৎপাদনের কাঙ্খিত লক্ষ্য অর্জন সম্ভব হবে কিনা, ‘এমন প্রশ্নের জবাব এখনই দেয়া সম্ভব নয়’ বলেও জানিয়েছেন মাঠ পর্যায়ের কৃষিবীদগন। তবে কৃষকগন অনেক আশা নিয়েই আবার মাঠে ছুটছেন।
আবহাওয়া বিভাগের মতে, গতমাসে সারাদেশে স্বাভাবিক অপেক্ষা ৬৫বেশী বৃষ্টিপাত হয়েছে। এসময় বরিশাল, খুলনা ঢাকা ও চট্রগ্রাম বিভাগে স্বাভাবিক অপেক্ষা বেশী বৃষ্টি হয়েছে। এমনকি বরিশাল বিভাগে স্বাভাবিক ৫১৯মিলিমিটারের স্থলে জুলাই মাসে ৮৬১বৃষ্টিপাতের রেকর্ড করা হয়। যা ছিল স্বাভাবিকের চেয়ে প্রায় ৮১% বেশী। তবে রাজশাহী ও সিলেট বিভাগে গতমাসে প্রায় স্বাভাবিক বৃষ্টিপাত হয়েছে বলে জানিয়েছে আবহাওয়া বিভাগ।
গত মাসে উত্তর বঙ্গোপসাগর সৃষ্ট দুটি লঘুচাপের মধ্যে ২৫ জুলাই উত্তর বঙ্গোপসাগর ও তৎসংলগ্ন উপকূলীয় এলাকায় মৌসুমী লঘুচাপটি ২৬ জুলাই দুপুরে ঘণীভূত হয়ে একই এলাকায় মৌসুমী নি¤œবচাপে পরিণত হয়। এটি আরও উত্তর দিকে সরে গিয়ে ২৯ জুলাই দুপুর নাগাদ গভীর নি¤œচাপে পরিণত হয়। নি¤œচাপটি ঐদিন রাত ৯টায় আরও ঘণীভূত হয়ে ঘূর্ণিঝড় ‘‘কোমেন”-এ রুপ নেয়। ঘূর্ণিঝড়টি ৩১জুলাই ভোর রাতে সন্দ্বীপের কাছ দিয়ে চট্টগ্রাম উপকূল অতিক্রম করে এবং দূর্বল হয়ে নোয়াখালী ও তৎসংলগ্ন এলাকায় স্থল নি¤œচাপ হিসাবে অবস্থান করে। পরে এটি চাঁদপুরÑফরিদপুরÑখুলনা অঞ্চল হয়ে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ ও বিহারে গিয়ে দূর্বল হয়ে মিলিয়ে যায়।
ঘূর্ণিঝড় ও স্থল নি¤œচাপের প্রভাবে বরিশাল সহ সমগ্র দক্ষিনাঞ্চল এবং উপকূলীয় এলাকা ছাড়াও দেশের অনেক স্থানেই অস্থায়ী দমকা ও ঝড়ো হাওয়াসহ ভারী বর্ষনে ফসলের মাঠ সয়লাব হয়ে যায়। অনেক জমির ফসল লন্ডভন্ডও হয়ে গেছে। গ্রীষ্মকালীন সবজির প্রায় পুরোটাই বিনষ্ট হয়েছে। এসময় উপকূলীয় এলাকার কোথাও কোথাও ৩-৫ফুট উচ্চতার বায়ু তাড়িত জলোচ্ছ্বাসে প্লাবিত হয়। অতি বর্ষনের সাথে ফুসে ওঠা সাগরের জোয়ারের পানিতে এখনো দক্ষিনাঞ্চলের অনেক ফসলী জমি পানির তলায় রয়েছে।
এবারের এ অতি বর্ষনে পটুূয়াখালীর কলাপাড়া ও ভোলায় তিন দিনে ৩শ মিলিমিটারের বেশী বৃষ্টি হয়েছে। বরিশালেও বৃষ্টিপাতের পরিমান ছিল দু শতাধীক মিলিমিটার তিন দিনে।
চলতি মাসেও দক্ষিনাঞ্চল সহ সারা দেশে স্বাভাবিকের চেয়ে কিছুটা বেশী বৃষ্টিপাতের কথা জানিয়ে বঙ্গোপসাগরে ১-২ টি মৌসুমী নি¤œচাপ সৃষ্টি হতে পারে বলে জানিয়েছে আবহাওয়া বিভাগ। পাশাপাশি চলতি মাসের দ্বিতীয়ার্ধে ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনা অববাহিকায় স্বাভাবিক বন্যার আশংকার কথা বলা হয়েছে। ফলে উত্তরাঞ্চলের রোপা আমন আরেক দফা ক্ষতির কবলে পড়ার সম্ভবনাও রয়েছে। তবে এ মাসে দেশের দৈনিক গড় বাষ্পীভবন সাড়ে ৩ মিলিমিটার থেকে সাড়ে ৪মিলিমিটার এবং গড় সূর্য কিরণকাল ৪ থেকে ৫ ঘন্টা কাল হতে পারে বলেও জানানো হয়েছে। যা আমন সহ গ্রীষ্মকালীন সবজি সহ অন্যান্য ফসলের জন্য যথেষ্ট অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করবে বলে জানা গেছে।