আজ থেকে ইলিশ শিকার উৎপাদন বৃদ্ধির আশাবাদ

নিজস্ব প্রতিবেদক ॥ সুষ্ঠু প্রজনন নিশ্চিত করে জাতীয় মাছ ইলিশ-এর বংশ বিস্তারে মৎস বিজ্ঞানীদের সুপারিশ অনুযায়ী টানা ১৫ দিনের নিষেধাজ্ঞা উঠে গেল গত মধ্যরাত থেকে। আজ সকাল থেকেই জেলেরা দেশের উপকূলভাগ সহ দেশের যেকোন অভ্যন্তরীন জলাশয়ে জাল ফেলতে পারবে। বাজারেও আজ বিকেল থেকে নদ-নদীসমূহের মাছের সরবরাহ শুরু হবে বলে আশা করছেন মৎসজীবীগণ। তবে গত কয়েকদিনে গোপনে যেসব ইলিশ আহরণ করা হয়েছে, তা আজ সকাল থেকেই বাজারে আসতে শুরু করবে বলেও মনে করছেন ওয়াকিবাহাল মহল। গত ১৫দিন দেশের দক্ষিণাঞ্চল সহ প্রায় সারা দেশের বাজারেই নদ-নদীর মাছের তেমন কোন সরবরাহ ছিলনা। বেকার ছিল দেশের কয়েক লাখ জেলে ও মৎসজীবী।
মৎস বিভাগের মতে, কর্মসংস্থানে ইলিশের ব্যাপক অবদান রয়েছে। দেশের ৪০ টি জেলার ১৪৫ টি উপজেলার দেড় হাজার ইউনিয়নের প্রায় সাড়ে ৪ লাখ জেলে ইলিশ মাছ আহরণের সাথে জড়িত। যার ৩২% সার্বক্ষণিক ও ৬৮% খন্ডকালীন এ পেশার সাথে জড়িত বলে মৎস অধিদফতর জানিয়েছে। এছাড়াও ইলিশ বিপণন, পরিবহন, প্রক্রিয়াজাতকরন, রপ্তানী, জাল ও নৌকা তৈরী এবং মেরামত কাজেও আরো প্রায় ২০Ñ২৫ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হচ্ছে।
তবে দেশের ৭টি বিভাগের মধ্যে শুধুমাত্র বরিশাল বিভাগেরই প্রায় দেড় লাখ জেলে এ পেশার সাথে জড়িত। যার ৬৫% সার্বক্ষণিকভাবে ইলিশ মাছ আহরণে জড়িত বলে মৎস অধিদফতরের এক জরিপে বলা হয়েছে। এমনকি দেশের অভ্যন্তরীন ও উপকূলীয় এলাকায় গত বছর যে ৩ লাখ ৮৫ হাজার টনের মত ইলিশ আহরণ হয়, তার প্রায় ৫৫-৬০ ভাগই আহরিত হয়েছে বরিশাল অঞ্চলে। জাতীয় অর্থনীতিতেও ইলিশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। জিডিপিতে ইলিশের একক অবদান ১%-এরও বেশী। একক প্রজাতি হিসেবে এ মাছের অবদান প্রায় ১২Ñ১৩%।
মৎস বিজ্ঞানীদের গবেষণা অনুযায়ী আশ্বিনের বড় পূর্ণিমার আগে-পরের ১৫দিন গভীর সমুদ্র থেকে সাগর উপকূলের মেঘনা মোহনা ও এর সন্নিহিত প্রায় ৭ হাজার বর্গ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে মা ইলিশ ডিম ছেড়ে থাকে। সে আলোকেই এবার গত ২৫ সেপ্টেম্বর থেকে ৯ অক্টোবর পর্যন্ত দেশের উপকূলীয় ভাটি মেঘনার ভোলা ও লক্ষ্মীপুর জেলার মধ্যবর্তি ঢালচর, মনপুরা, মৌলভীর চর ও কালির চর এলাকার ৭ হাজার বর্গ কিলোমিটার এলাকার প্রজনন ক্ষেত্রে সব ধরনের মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। পাশাপাশি সারা দেশেই ইলিশ আহরণ, পরিবহন ও বিপণনে নিষোধাজ্ঞা বলবত ছিল এসময়ে।
মৎস বিভাগ থেকে এবারের নিষেধাজ্ঞা কালীন সময়ে বরিশাল সহ দেশের উপকূলীয় এলাকায় লাগাতার অভিযানের মাধ্যমে মা ইলিশ রক্ষায় ব্যাপক সাফল্যের কথা বলা হয়েছে। মৎস অধিদপ্তরের বরিশাল বিভাগীয় অফিসের দায়িত্বশীল সূত্র মতে, গত ১৫ দিনে দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন জেলা প্রশাসনের সহায়তায় ১৩শতাধীক অভিযান পরিচালনা করা হয়। এসময় মৎস আইন অমান্যের অভিযোগে ৫ শতাধীক জেলেকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদন্ডাদেশ প্রদান সহ প্রায় ১৫ লাখ টাকা জরিমানও করা হয়েছে। ৮০৭ টি মামলা দায়ের সহ প্রায় ১০ টন ইলিশ মাছ আটক করা হয় এসময়। পাশাপাশি বিভিন্ন নদী থেকে ৪৭ লাখ মিটার বিভিন্ন ধরনের জাল আটক করে বাজেয়াপ্ত করে ভ্রাম্যমান আদালত। যার মূল্য প্রায় ১০ কোটি টাকা। এবারের মৎস আহরণে নিষিদ্ধকালীন সময়ে জেলেদের প্রায় ৫০টি নৌকা সহ বেশ কিছু মাছ ধরার সরঞ্জামও আটক এবং বাজেয়াপ্ত করা হয় বলে জানা গেছে।
মৎস বিজ্ঞানীদের মতে অভিপ্রায়নী মাছ ইলিশ প্রতিদিন ¯্রােতের বিপরীতে গড়ে প্রায় ৭১ কিলোমিটার নদ-নদী অতিক্রম করে থাকে। এরা বছর জুড়েই ডিম ছাড়লেও আশ্বিনের বড় পূর্ণিমার আগে-পরেই বেশীরভাগ ডিম ছেড়ে থাকে। ইলিশ গভীর সমুদ্র থেকে দেশের উপকূলীয় এলাকা হয়ে ভাটি মেঘনা জুড়ে ডিম ছেড়ে আবার পুরনো আবাসস্থলেই ফিরে যায়। তবে সম্প্রতিক জরিপে পূর্ণিমার আগের চেয়ে পরের পুরো দশ দিন জুড়েই প্রজননাক্ষম ইলিশের ডিম ছাড়ার প্রবণতা বেশী লক্ষ্য করা গেছে। ফলে ইতোপূর্বে পূর্ণিমার দিন সহ আগে পরের ৫দিন করে মোট ১১দিন মাছ ধরায় নিষেধজ্ঞা থাকলেও চলতি বছরই তা ১৫দিনে সম্প্রসারিত করা হয়েছে।
মৎস বিভাগের মতে, গতবছর প্রজনন মৌসুমের ১১দিনে নিষিদ্ধকালীন সময়ে ১ কোটি ৬৩লাখ মা ইলিশ আহরণ থেকে রক্ষা পায়। আহরণ থেকে রক্ষা পাওয়া এসব ইলিশ থেকে ১ কোটি ১৮লাখ কেজি ডিম উৎপাদিত হয় বলে অধিদফতর থেকে বলা হয়েছে। ঐসময় সব ধরনের মৎস আহরণ নিষিদ্ধ থাকায় ডিমের ৫০ ভাগ পরিস্ফুটনের সুযোগ লাভ করলেও ২ লাখ ৬১ হাজার ১০ কোটি রেনু উৎপাদিত হয়েছে বলে মনে করেন মৎস বিজ্ঞানীগণ। যার মাত্র ১০ ভাগও বাঁচার সুযোগ পেলে ২৬ হাজার ১শ কোটি নতুন ইলিশ পোনা বা জাটকা দেশের ইলিশ সম্পদে যুক্ত হয়েছে বলে মৎস বিজ্ঞানীগণ মনে করেন। যা ২০০৫ সালের তুলনায় ২০০৮, ২০০৯, ২০১০, ২০১১, ২০১২, ২০১৩ ও ২০১৪সালে যথাক্রমে ১৬৩%, ১৪৫%, ১৬০%, ১৮৯%, ১৯১%, ১৯৫% ও ২২৩% বেশী ছিল। গতবছর নি¤œ মেঘনায় জরিপকালে কারেন্ট জালে ঘন্টায় প্রতি ১শ মিটারে ৩.০৪ কেজি পর্যন্ত জাটকা ধরা পরে। যা আগের যেকোন সময়ের তুলনায় অনেক বেশী ছিল।
এদিকে আজ থেকে ইলিশ আহরণ, পরিবহন ও বিপণনে সব নিষেধাজ্ঞা উঠে গেলেও আগামী ১ নভেম্বর থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত সারা দেশে জাটাকা আহরণে নিষেধজ্ঞা বলবত হবে। কারন গত ১৫ দিনে মা ইলিশ যে ডিম ছেড়েছে তা নভেম্বরের শুরু থেকেই পূর্ণাঙ্গ ইলিশ পোনা-জাটকায় রূপান্তরিত হতে থাকবে। ছ মাসের মধ্যেই তা পূর্ণাঙ্গ ইলিশে পরিণত হবে। ফলে মৎস বিজ্ঞানীদের গবেষণার আলোকে এসময়কালে জাটকা আহরণ নিষিদ্ধ করেছে সরকার। উপরন্তু দেশের কয়েকটি এলাকাকে ইলিশের জন্য অভয়াশ্রম ঘোষণা করে সেসব এলাকাতেও নির্দিষ্ট সময়গুলোতে সব ধরনের মৎস আহরণ নিষিদ্ধ থাকবে।
মৎস বিজ্ঞানীদের সুপারিশ অনুযায়ী পটুয়াখালীর আন্ধারমানিক নদীতে নভেম্বর থেকে জানুয়ারী এবং নিম্ন মেঘনা, শাহবাজপুর চ্যানেল ও তেতুলিয়া নদীতে মার্চ থেকে এপ্রিল মাসের সময়কালকে অভয়াশ্রম হিসেবে ঘোষণা করে ইলিশ সহ সব ধরনের মাছ ধরা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। একই সুপারিশের আলোকে শরিয়তপুর জেলার নড়িয়া ও ভেদরগঞ্জ উপজেলা এবং দক্ষিণে চাঁদপুর জেলার মতলব উপজেলার মধ্যেবর্তি পদ্মা নদীর ২০ কিলোমিটার এলাকায়ও মার্চÑএপ্রিল মাসকে অভয়াশ্রম ঘোষণা করে সব ধরনের মৎস আহরণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এছাড়াও বরিশালের হিজলা উপজেলার নাছকাটি পয়েন্ট, হরিনাথপুর পয়েন্ট, ধুল খোলা পয়েন্ট এবং মেহেদিগঞ্জ উপজেলার ভাষান চর পয়েন্ট এলাকা মেঘনার শাখা নদী, হিজলা উপজেলার ধর্মগঞ্জ ও নয়া ভাঙনী নদী এবং মেহেদিগঞ্জ উপজেলার লতা নদীর ৬০কিলোমিটার এলাকায় ইলিশ ও জাটকার ষষ্ঠ অভয়াশ্রম ঘোষণার নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে বলে জানা গেছে। এসব এলাকায় জাটকা আহরণ নিষিদ্ধকালীন সময়ের নির্দিষ্ট কিছু দিনে সব ধরনের মৎস আহরণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হচ্ছে। মৎস বিজ্ঞানীদের দাবী এর ফলে দেশে ইলিশের উৎপাদন আরো বাড়বে।