আজো গভীর রাতে ঘুম ভেঙ্গে জেগে কাঁদেন নিহত হুমায়ুন কবির’র বৃদ্ধা মা

নিজস্ব প্রতিবেদক আজো শুকায়নি বানারীপাড়ার সলিয়াবাকপুর ইউনিয়নের মাদারসী গ্রামে খুন হওয়া জাসদ নেতা সৈয়দ হুমায়ুন কবিরের মায়ের চোখের জল। আদরের সন্তানের কথা ভেবে গত চারটি বছর ঘুমাতে পারেননি তিনি। প্রতি রাতেই আদরের সন্তানের স্মৃতি চারণ করে কেঁদে কেঁদে বুক ভাসাচ্ছেন প্রায় ৮০ বছর বয়সী অসহায় মা ফিরোজা বেগম। কাঁদতে কাঁদতে চোখের কোনে ঘাঁ হয়ে গেলেও তড়ান্বিত হচ্ছে না হত্যা মামলার বিচার কার্য। সাক্ষি গ্রহণের পর্যায়ে গিয়ে ঝুঁলে আছে হুমায়ুন কবির হত্যার বিচার কার্য। যে কারণে বহাল তবিয়তে ঘুরে বেড়াচ্ছেন হুমায়ুন কবিরের হত্যাকারী সাবেক ও বর্তমান দুই ইউপি চেয়ারম্যান সহ ক্ষমতাসিন দলের নেতা-কর্মীরা। শুধু তাই নয়, অর্থের বিনিময়ে মামলা ধামা চাপা দেয়ার হুমকিও দিচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে তাদের বিরুদ্ধে।

ছেলেকে হত্যার স্মৃতি চারণ করে বৃদ্ধা মা বলেন, ২০১৩ সালের ১৯ জুলাই ছিল মাহে রমজান মাস। দিনটি ছিলো শুক্রবার। দুপুরে বৃদ্ধা মায়ের হাত-পায়ের নখ কেটে দিয়ে জুমার নামাজ আদায়ের জন্য মসজিদের উদ্দেশে যাচ্ছিল হুমায়ুন। পথি মধ্যেই ওরা আমার বাবাকে নির্মমভাবে কুপিয়ে ও পিটিয়ে গুরুতর আহত করে। সন্ত্রাসীরা তার হাত-পায়ের রগ কেটে দেয়। চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে নিয়েও বাবাকে আমরা বাঁচাতে পারি নি। সাবাইকে ছেড়ে চলে গেছে আমার কবির। কিন্তু খুনিদের এখনো শান্তি হয় নাই। এখন আবার হত্যা মামলার বাদী আমার অপর ছেলে আপুকেও মেরে ফেলবে বলে হুমকি দিচ্ছে ওরা।

ঠিক এমনি ভাবেই কাঁদতে কাঁদতে কথাগুলো বলেছেন বানারীপাড়া উপজেলা জাসদ এর সাংগঠনিক সম্পাদক সৈয়দ হুমায়ুন কবিরের মা ফিরোজা বেগম।

হত্যা মামলার বাদী নিহতের ভাই সৈয়দ তরিকুল ইসলাম আপু বলেন, তার ভাই সৈয়দ হুমায়ুন কবির কখনোই অন্যায়কে প্রশ্রয় দিতেন না। কোথাও কোন অন্যায় কিংবা অপকর্মের খবর শুনলে ঝাঁপিয়ে পড়তেন তা প্রতিরোধের জন্য। যে কারণে মানুষের কাছেও প্রিয় ব্যক্তিত্ব হয়ে ওঠেন তিনি। এজন্য খুন হতে হয়েছে তাকে।

তিনি বলেন, ক্ষমতাসিন দলের নেতা ও সলিয়াবাকপুর ইউনিয়নের বর্তমান চেয়ারম্যান জিয়াউল হক মিন্টু এবং চাখার ইউপি’র সাবেক চেয়ারম্যান মজিবুল হক টুকু সহ তাদের দখলবাজ সন্ত্রাসীরা উপজেলার একটি হিন্দু পরিবারের ভিটা-মাটি কেড়ে নিয়ে তাদের দেশ ছাড়া করার পায়তারা চালায়। ক্ষমতাসিন দলের এমন সন্ত্রাসীমূলক কর্মকান্ডের প্রতিবাদ করেন উপজেলা জাসদ’র সাংগঠনিক সম্পাদক সৈয়দ হুমায়ুন কবির। এমনকি তার সহযোগিতায় হিন্দু পরিবারটি ফিরে পায় তাদের শেষ সম্বল ভিটা-মাটিও। এ কারণে সেই থেকেই তার উপর ক্ষুব্ধ হয় সাবেক ও বর্তমান দুই চেয়ারম্যান সহ তাদের সন্ত্রাসী বাহিনী।

পরবর্তীতে সরকার দলীয় দুই চেয়ারম্যান ও তাদের বাহিনীর সদস্যরা ক্ষমতায় থাকাবস্থায় রাস্তার সরকারি গাছ কেঁটে নিয়ে যায়। এতে বাধা দেয় হুমায়ুন কবির। যে কারণে চেয়ারম্যান জিয়াউল হক মিন্টু এবং সাবেক চেয়ারম্যান মজিবুল হক টুকু’র ক্ষোভ সৃষ্টি হয়।

এরই ধারাবাহিকতায় ২০১৩ সালের ১৯ জুলাই শুক্রবার রোযা অবস্থায় বেলা ১২টার দিকে জুমআর নামাজ আদায় করতে যান জাসদ নেতা সৈয়দ হুমায়ুন কবির। পথিমধ্যে এ.রব সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পূর্ব পাশে রাস্তার উপর হুমায়ুন কবিরকে একা পেয়ে তার উপর হামলা চালায় সরকার দলীয় সলিয়াবাকপুর ইউপি চেয়ারম্যান জিয়াউল হক মিন্টু এবং চাখার ইউপি’র সাবেক চেয়ারম্যান মজিবুল হক টুকু কাজী ও তাদের সন্ত্রাসী বাহিনী।

অন্যায়ের প্রতিবাদী নেতা সৈয়দ হুমায়ুন কবির হত্যার মিশনে জনপ্রতিনিধি নামের সন্ত্রাসী দুই চেয়ারম্যানের সঙ্গে সেদিন যোগ দিয়েছিলো চার সন্ত্রাসী সহোদর আব্দুস ছালাম হাওলাদার, আ. হাকিম হাওলাদার, কালাম হাওলাদার ও আ. হালিম হাওলাদার। এছাড়াও ছিলো সিরাজুল ইসলাম ফিরোজ, মো. রনজু হাওলাদার, মো. মাসুদ ও আফজাল।

এদিকে হত্যাকান্ডের ঘটনায় নিহতের ছোট ভাই সৈয়দ তরিকুল ইসলাম আপু বাদী হয়ে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে বানারীপাড়া থানার এসআই ও মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা সনজিৎ চন্দ্র শীল প্রায় তিন মাসের মাথায় অর্থাৎ ২০১৩ সালের ২৩ অক্টোবর আদালতের কাছে ১০ জনকে অভিযুক্ত করে চার্জশীট দাখিল করেন। এতে মামলার ১নং আসামি বেতাল গ্রামের রজ্জব আলী রাজ্জাক এর ছেলে সালিয়াবাকপুর ইউপি’র বর্তমান চেয়ারম্যান জিয়াউল হক মিন্টুকে ১০ নম্বর এবং চাখার ইউপি’র সাবেক চেয়ারম্যান ও চাখারের মৃত আ. গনি’র ছেলে মজিবুল হক টুকুকে প্রধান হত্যাকারী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

অপরদিকে মামলা দায়েরের পরে গ্রেপ্তার হওয়া আসামিরা জামিন নিয়ে জেল থেকে বেড়িয়ে আসে। আবার অনেক আসামি উচ্চ আদালত থেকে আগাম জামিন নিয়ে প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ায়। এমনকি মামলা তুলে নিতে বাদী ও তার পরিবারকে অর্থের প্রলোভন এবং এতে রাজি না হওয়ায় বড় ভাই এর মত মামলার বাদী ছোট ভাইকেও হত্যার হুমকি দিয়ে আসছে। যে কারণে অনেকটা জীবনহানীর শংকায় ভুগছেন বাদী ও তার পরিবার। পরিবারের দাবি যে কোন সময় হুমায়ুন কবিরের মতো অন্যান্য ভাইদেরও একই অবস্থা হতে পারে। বিশেষ বরে সলিয়াবাকপুর ইউপি চেয়ারম্যান জিয়াউল হক মিন্টু এক সময় দুর্ধর্ষ সর্বহারা (ক্রসফায়ারে নিহত) মোয়াজ্জেম হোসেন রিপনের সেকেন্ড ইন কমান্ড হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছে। একারণেই সর্বদা আতংকে রয়েছে হুমায়ূনের পরিবারের সদস্যরা।