আগামী সপ্তাহে জমে উঠছে কোরবানীর পশুর হাট

বিশেষ প্রতিবেদক ॥ পবিত্র ঈদ-উল-আযহা ঘনিয়ে আসার সাথে সাথে দেশের দক্ষিণাঞ্চলে গরুর হাট নিয়ে নানামুখি তৎপরতাও শুরু হয়েছে। এখনো দক্ষিণাঞ্চলের কোথাও কোরবানীর পশুর হাট জমে না উঠলেও বেপারীগন বিভিন্ন এলাকা থেকে গরু সংগ্রহ করে স্থানীয়ভাবে মজুদ শুরু করেছেন। এমনকি গত বছর ভারতীয় গরু বিহীন কোরবানী পার করার অভিজ্ঞতার আলোকেই এবারো আসন্ন ঈদ উল আযহাতে দক্ষিণাঞ্চলে পশু বেচাকেনা করতে প্রস্তুত ব্যবসায়ীরা। এবছরও ভারত থেকে কোন গরু না আসার বিষয়টি নিশ্চিত হয়েই সে আলোকে পশু সংগ্রহ করছেন ব্যবসায়ীগন। ভারতীয় গরুর বৈধÑঅবৈধ আমদানী বন্ধের ফলে দক্ষিণাঞ্চলে গত দুবছরে গবাদী পশুর লালন ও বেচাকেনা কিছুটা বেড়েছে বলে দাবী পশু সম্পদ অধিদপ্তরের। তবে গতবছর এর আগের বছরের তুলনায় ২৫%-৪০% পর্যন্ত কোরবানীর গরুর দাম বাড়লেও এবার পরিস্থিতি কোন দিকে যাবে তা এখনো পরিস্কার নয়। আগামী সপ্তাহখানেকের মধ্যেই দক্ষিণাঞ্চলে কোরবানীর পশুর হাটগুলো জমতে শুরু করবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা। তখন মূল্য পরিস্থিতিও বাস্তব রূপ লাভ করবে বলে মনে করছেন বাজার পর্যবেক্ষকগন। তবে ঐ মহলটির মতে এবারো কোরবানীর পশুর দাম কমার কোন সম্ভাবনা নেই। উপরন্তু গতবছরের চেয়ে প্রকার ভেদে ১৫Ñ২৫ভাগ পর্যন্ত বাড়তে পারে বলে আগাম বার্তা
দিয়ে রেখেছেন অনেক পশু ব্যবসায়ী। বরিশাল সহ দক্ষিণাঞ্চলে ইতোমধ্যে গড়ে ওঠা ৫ সহ¯্রাধীক ক্ষুদ্র ও মাঝারী খামার থেকে এবার অন্তত এক লাখ গরু স্থানীয় হাটÑবাজারে আসতে পারে বলে আশা করছেন ব্যবসায়ীগন। পাশাপাশি কুষ্টিয়া সহ উত্তরাঞ্চল থেকেও দেশী ভাল মানের গরু বাজারে আসবে আগামী সপ্তাহেই। এজন্য স্থানীয় পাইকারদের সব তৎপরতা শুরু হয়েছে ইতোমধ্যেই । ঐসব এলাকার খামারী ও পাইকারদের আগাম অর্থ সহ দাদন দিয়ে রেখেছে দক্ষিণাঞ্চলের গরু ব্যবসায়ীরা।
অপরদিকে দক্ষিণাঞ্চল থেকে বছর জুড়েই বকনা ও বাছুর কিনে নিয়ে যায় উত্তরাঞ্চলের খামারীরা। এসব গরু বছরখানেক লালন পালনের মাধ্যমে মোটা তাজা করে তারা বিক্রী করেন। যার একটি অংশ আবার দক্ষিণাঞ্চলেই ফিরে আসছে। তবে বরিশাল সহ দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্নস্থানে গড়ে ওঠা ক্ষুদ্র ও মাঝারী পর্যায়ের খামার থেকেও ভাল মানের গরু বাজারে আসবে এবারের কোরবানীর বাজারে।
গত বছর ঈদ উল আযহায় ভারতীয় গরু নিয়ে সাধারন মানুষের মধ্যে এক ধরনের উৎকন্ঠা ছিল। ভারত সরকার গত বছরের মত এবছরও ইতোমধ্যে বাংলাদেশে বৈধ ও অবৈধভাবে গরু রপ্তানী বন্ধে সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে বলে জানা গেছে। তবে ভারত সরকারের এ নীতির কারনে সারা দেশের মত দক্ষিণাঞ্চলের ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষক সহ গরুর খামারীরা যথেষ্ট লাভবান হচ্ছেন। এতে দাম বাড়ার কারনে সাধারন মানুষের দূর্ভোগ কিছুটা বেড়ে গেলেও এখন তা সবাই মেনেও নিয়েছেন।
অতীতের মত ভারত সরকারও বাংলাদেশের বর্তমান সরকারকে ‘যথেষ্ট বন্ধু প্রতিম’ বলে অভিহিত করে ‘দু দেশের জনগনের পারস্পরিক স্বার্থে সব কিছু করা’র কথা বললেও গরু রপ্তানীর ক্ষেত্রে তাদের সাম্প্রদায়িক ও সংরক্ষিত মনোভাব থেকে বের হতে পারেনি বলে মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহল। এমনকি গত বছর কোরবানীর আগে বরিশালে ভারতীয় ভিসা আবেদন কেন্দ্রের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনকালে বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের তৎকালীন হাই কমিশনার পংকজ শরণ সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে জানিয়েছিলেন, ‘ঈদুল আযহার প্রাক্কালে ভারত থেকে বাংলাদেশে গরু রপ্তানী কার্যক্রম শুরু হবে কি হবে না তা নির্ভর করে দু’দেশের বাণিজ্যিক রীতি-নীতির ওপর’। তবে তিনি ‘বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক অত্যন্ত নিবিড়’ বলে মন্তব্য করে ‘দুটি দেশই শান্তি ও সমৃদ্ধির জন্য এক সঙ্গে পথ চলছে’ বলেও জানিয়েছিলেন । তিনি ‘এ সম্পর্ক আরও দীর্ঘস্থায়ী ও আন্তরিক করতে উভয় দেশ কাজ করছে’ বলে দাবী করলেও বাস্তবে তা শুধুমাত্র ভারতের স্বার্থে বলে মনে করছেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহল। তৎকালীন ভারতীয় হাই কমিশনারের কৌশলী ঐ মন্তব্য ভারত থেকে বাংলাদেশে গরু রপ্তানীর বিষয়ে তাদের নেতিবাচক মনোভাবের বহিঃ প্রকাশ ছিল বলেও সেসময় রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকগন মন্তব্য করেছিলেন। পঙ্কজ স্মরনের স্থলে ঢাকায় নতুন ভারতীয় হাই কমিশনার আসলেও তাদের নীতির কোন পরিবর্তন হয়নি। বরং অতি সম্প্রতি ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার আসন্ন ঈদ উল আযহাতে সেদেশে পশু জবাই সহ এর চলাচলেও নতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। এর ফলে বাংলাদেশে গরুর রপ্তানী বন্ধের বিষয়টি বর্তমান বিজেপি সরকারের আমলে আর কোন পরিবর্তন ঘটবে না বলেই মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহল।
তবে দক্ষিণাঞ্চলের সাধারন মানুষ ভারতীয় গরুর আশা বাদ দিয়েই গতবছর থেকে কোরবানীর যে প্রস্তুতি নিয়েছিলেন এবারো তার পরিবর্তন ঘটছে না। উপরন্তু ভারতীয় গরুর অবাধ আমদানীকালেও দক্ষিণাঞ্চলে পশু কোরবানীতে সে দেশের গরুর খুব একটা প্রভাব ছিল না। কারন দক্ষিণাঞ্চলের সাধারন মানুষের মধ্যে ভারতীয় গরুর কখনোই গ্রহনযোগ্যতা ছিলনা। কৃষি নির্ভর দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনীতিতে অনাদীকাল থেকেই পশু পালন একটি অবিচ্ছেদ্য বিষয় হয়ে আছে। কোরবানীর ক্ষেত্রেও তাই ভারতীয় গরু নির্ভরতা দক্ষিণাঞ্চলে এবারো থাকছে না। ফলে আসন্ন ঈদ উল আযহায় পশু কোরবানীতে কোন দেশের গরু আসা না আসায় দক্ষিণাঞ্চলে তেমন কোন প্রভাব পড়বে না বলেই মনে করছেন পশু ব্যবসায়ীগন।