আইসিটি নিয়ে চরম বিপাকে দক্ষিণাঞ্চলের শিক্ষার্থীরা

নিজস্ব প্রতিবেদক ॥ সমগ্র দক্ষিণাঞ্চলে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বা আইসিটি বিষয়টি নিয়ে চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছে এইচএসসি ও আলিমের হাজার হাজার শিক্ষার্থী। শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের অধিকাংশরই আইসিটি নিয়ে সঠিক কোন ধারনা না থাকায় বিষয়টি ক্রমেই জটিল আকার ধারন করছে।
২০১৩-১৪ শিক্ষাবর্ষ থেকে মানবিক, বিজ্ঞান ও ব্যবসায় ব্যবস্থাপনাসহ সকল বিভাগের এইচএসসি ও আলিম পরীক্ষার্থীদের জন্য তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিষয়টি বাধ্যতামূলক করে দেয় সরকার। বাংলা এবং ইংরেজির মতই আবশ্যকীয় হওয়ায় বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই কোন শিক্ষার্থীর। তবে আইসিটি বিষয়টি বাধ্যতামূলক করার আগে যারা শিক্ষার্থীদের বিষয়টি পাঠদান করাবেন সেই শিক্ষকদের প্রয়োজনীয় এবং যথার্থ ট্রেনিং না করানোয় শিক্ষকরা রয়েছেন চরম বিপাকে। আর শিক্ষকরা বিপাকে থাকলে শিক্ষার্থীদের অবস্থা কি তা সহজেই অনুমেয়। বরিশাল শিক্ষাবোর্ডে এবছর অর্থাৎ ২০১৫ সালের এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফল পূর্বের বছরের তুলনায় খারাপ হওয়ার অন্যতম একটি কারণ ছিল এই আইসিটি, অধিকাংশ শিক্ষার্থী শিক্ষকদের দয়ায় আইসিটি বিষয়টি কোন রকম পাশ করে গেলেও হাতে কলমে শিখতে পারেনি সিলেবাসের অনেক বিষয়। যে কারনে সরকার আইটিতে দক্ষ জনবল তৈরীর যে উদ্দেশ্য নিয়ে আইসিটি বিষয়টি বাধ্যতামূলক করেছিল তার সুফল আসছে না।
কলেজ এবং মাদরাসাগুলোতে সরাসরি আইসিটির শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পাওয়া প্রভাষকের সংখ্যা নেই বললেই চলে। বাধ্য হয়ে প্রতিষ্ঠান প্রধানরা বিজ্ঞান বিষয়ের শিক্ষকদেরকে আইসিটি পড়ানোর অতিরিক্ত দায়িত্ব দেন। এদেরমধ্যে অনেকেই আছেন যাদের কম্পিউটার সম্পর্কে নূন্যতম ধারনা পর্যন্ত নেই। অথচ আইসিটি বিষয়টির প্রায় ৯০ ভাগ বিষয়ই সরাসরি কম্পিউটারের সাথে সংশ্লিষ্ট। ফলে একরকম হ-য-ব-র-ল অবস্থা বিরাজ করছে বরিশালসহ সমগ্র দক্ষিণাঞ্চলের আইসিটি শিক্ষায়।
বরিশাল নগরীর সরকারি সৈয়দ হাতেম আলী কলেজের শিক্ষার্থী সাকিব জানায়, আইসিটি বিষয়টি শুধু বই পড়ে তেমন কিছুই বোঝা যাচ্ছেনা, স্যাররাও ক্লাসে এবং বাসায় প্রাইভেট পড়ান শুধু বই দেখে, মাঝে মধ্যে আমাদেরকে কলেজের কম্পিটার ল্যাবে নেয়া হলেও ছাত্র-ছাত্রী বেশি হওয়ায় কম্পিউটার ভাগে পাওয়া যায় না, বিষয়টি নিয়ে জটিল অবস্থার মধ্যে রয়েছি। একই কলেজের শিক্ষার্থী হাসিব জানান, এমন জটিলতার কারণে আমরা বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থী এখন সাতরং আইটি ট্রেনিং সেন্টারে আইসিটি কোর্স করার জন্য ভর্তি হয়েছি। আর সেখানে প্রত্যেক শিক্ষার্থীর জন্য অত্যাধুনিক নেটওয়ার্কিং সমৃদ্ধ ল্যাবে আলাদা আলাদা কম্পিউটার থাকায় আইসিটি বিষয়টি হাতে কলমে শেখার সুযোগ পাচ্ছি।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বরিশাল নগরীর সাগরদী ইসলামিয়া কামিল মাদরাসার গনিত বিষয়ের প্রভাষক শফিকুল আলম, গনিতের পাশাপাশি অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে তিনি ওই মাদরাসার আলিমের শিক্ষার্থীদের আইসিটি বিষয়টি পড়াচ্ছেন। এমন একই চিত্র বরিশাল বিভাগের ৬ জেলার প্রায় প্রতিটি কলেজ ও মাদরাসায়। আইসিটি বিষয়টি আবশ্যকীয় হলেও শিক্ষার্থীদের তা পাঠদান করাচ্ছেন অবশনাল শিক্ষকরা। শহরের প্রতিষ্ঠানগুলোতেই যেখানে এমন অবস্থা সেখানে গ্রামের কলেজ মাদরাসাগুলোর অবস্থা আরো শোচনীয়। গ্রামের অনেক কলেজ ও মাদরাসায় কম্পিটার ল্যাব তো দূরের কথা কম্পিটারই নেই। তাহলে তারা শিক্ষার্থীদের হাতে কলমে আইসিটি পড়াবেন কিভাবে? এমনি নানা জটিলতায় মুখ থুবড়ে আছে দক্ষিণাঞ্চলের আইসিটি শিক্ষা।
সাতরং আইটি ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও আইটি বিশেষজ্ঞ মাহতাব মুস্তাকীম বলেন, এইচএসসি শিক্ষার্থীদর আইসিটি বিষয়টির ৬টি অধ্যায়ের মধ্যে ৪টি অধ্যায় সরাসরি কম্পিউটারের সাথে সংযুক্ত। কম্পিউটার সংশ্লিষ্ট কাজে অভিজ্ঞ না হলে কোন শিক্ষকের পক্ষে শিক্ষার্থীদের সঠিক জ্ঞান দেয়া অসম্ভব ব্যাপার। এজন্য আইসিটি শিক্ষকদেরকে সরকারের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় ট্রেনিং করানো খুবই জরুরী, তা না হলে সরকার যে উদ্দেশ্যে আইসিটি বিষয়টি বাধ্যতামূলক করেছেন তার সফলতা আসবে না। এক্ষেত্রে সাতরং আইটি ট্রেনিং শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের আইসিটি ট্রেনিং করানোর জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত রয়েছে বলে জানান তিনি।
বরিশাল শিক্ষাবোর্ডের চেয়ারম্যান প্রফেসর মু. জিয়াউল হকের কাছে আইসিটি বিষয়ে মতামত জানার জন্য ফোন করলে তিনি জানান, আইসিটি বিষয়টি নতুন হওয়ায় শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের কিছুটা সমস্যা হচ্ছে, তবে সমস্যা উত্তরন ও উন্নয়নের জন্য আমরা নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছি।