অস্বাভাবিক হাড়ে বেড়েছে আত্মহত্যা

রুবেল খান॥ অস্বাভাবিক হাড়ে আত্মহত্যার প্রবনতা বেড়েছে। শিশু থেকে বৃদ্ধ-বৃদ্ধারাও তুচ্ছ ঘটনায় অভিমানে আত্মহত্যার মতো ভয়ংকর পথ বেছে নিচ্ছে। গত কয়েকদিনে যে পরিমান আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে। বিগত সময়ে আত্মহত্যার সংখ্যা বছরে পরিসংখ্যান ছিল। সেই সংখ্যাকে ছাড়িয়ে গেছে চলতি মাস। আশংকাজনকহারে চলতি মাসে আত্মহত্যার ঘটনাকে সংশ্লিষ্টরা রেকর্ড হিসেবে অভিহীত করেছে।
অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী চলতি আগষ্ট মাস এখনও শেষ হয়নি। শেবাচিম হাসপাতালের পরিসংখ্যান খতিয়ানে ২৬ আগষ্ট পর্যন্ত হিসেবের সংখ্যায় ৩৫ মৃতদেহের ময়না তদন্ত সম্পন্নের কথা উল্লেখ রয়েছে। এর মধ্যে বরিশাল জেলা সহ আশপাশের এলাকায় ২৫ জনের বেশি মানুষ আত্মহত্যা করেছে। আত্মহত্যাকারীদের মধ্যে স্কুল কলেজের শিক্ষার্থীর সংখ্যাই বেশি বলে পাওয়া গেছে।
বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগ থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী চলতি মাসের ১ থেকে ২৬ আগস্ট পর্যন্ত ৩৫ জনের মৃত দেহের ময়না তদন্ত করা হয়েছে। যার মধ্যে বেশিরভাগ ঘটনাই মৃত্যুর কারন হিসেবে আত্মহত্যা উল্লেখ রয়েছে। এর সুনির্দিষ্ট সংখ্যা জানা না গেলেও আত্মহত্যা করা ১৫টির বেশি মরহেদের ময়না তদন্ত করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ও সহকারী অধ্যাপক ডা. আক্তারুজ্জামান তালুকদার। তবে এর কোনটির চূড়ান্ত প্রতিবেদন তৈরি না হওয়ায় এগুলো সব আত্মহত্যা নাকি তা পুরোপুরি ভাবে নিশ্চিত করেননি তিনি।
এদিকে শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওয়ার্ড মাষ্টার অফিস থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী গত ৬ আগস্ট থেকে ২৩ আগস্ট পর্যন্ত আত্মহত্যা করা ১০টি পেয়েছেন। এর মধ্যে বেশিরভাগ গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেছে। যার মধ্যে স্কুল এবং কলেজ শিক্ষার্থীর সংখ্যাই বেশি।
তাদের হিসাব অনুযায়ী ৬ আগস্ট বানারীপাড়ার কড়পাড়া গ্রামের সজিব হাওলাদার (২০), ৮ আগস্ট নগরীর কাউনিয়ায় এলাকার লামিয়া আক্তার (১৪), ১৩ আগস্ট রাজাপুরের পিংকি (১৭), ১৫ আগস্ট লালমোহন রায়চাদ গ্রামের সুখি আক্তার (১৪), ১৬ আগস্ট নগরীর ৯নং ওয়ার্ড রসুলপুর কলোনীর রিয়াজ হাওলাদার (১৪), ১৭ আগস্ট নগরীর ১৩ নং ওয়ার্ড খান সড়ক বাড়ান বাড়ির বাসিন্দা এবং টিটিসি’র ১০ম শ্রেনীর ছাত্র আল-আমিন (১৭), ২০ আগস্ট কালিবাড়ি রোডের বাসিন্দা এবং বরিশাল মহিলা কলেজ দ্বাদশ শ্রেণীর ছাত্রী পূজা দাস (১৭), ২৩ আগস্ট বাউফলের মো. জাহিদুল ইসলাম (২৮), একই দিন সদর উপজেলার হরিনাফুলিয়া গ্রামের ভানু বেগম (৩০), গৌরনদীর সাবিনা আক্তার (১৭), কাউনিয়া মুকন্দপট্টির সুচনা আক্তার (২০) ও ২৬ আগস্ট উজিরপুর মহিলা কলেজের ছাত্রী মনি হালদার পদ্মা (১৭) আত্মহত্যা করেছে। এদের মধ্যে বেশিরভাগ আত্মহত্যাই ঘটেছে গলায় ফাঁস দিয়ে।
এদিকে প্রতিটি ঘটনায় পরিবারের পক্ষ থেকে পারিবারিক কলহ দাবী করেছেন। তবে স্থানীয়দের ভাষ্যমতে বেশির ভাগ ঘটনা প্রেম সংক্রান্ত বিরোধের জের এবং স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে কলহের কারনে ঘটেছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ডা. আক্তারুজ্জামান তালুকদার জানান, গত এক মাসে যে পরিমান আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে তাতে গত কয়েক বছরের রেকর্ড অতিক্রম করেছে। তবে এখনো মাস শেষ হয়নি চলতি মাসের শেষ কদিনের মধ্যে এর সংখ্যা বাড়লেও বাড়তে পারে।
আত্মহত্যার প্রবণত হঠাৎ করে বৃদ্ধির কারন বিশ্লেষন করে এই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক তার মতপ্রকাশ করে বলেন, বর্তমান সময়ে বেশিরভাগ মেয়েরাই আত্মহত্যা করছে। কিছু মেয়েরা রয়েছে যাদের উগ্র মেজাজ এবং কিছুটা ভীত স্বভাবের হয়ে থাকে। তার মধ্যে আবার বেশি অভিমানি। যে কারনে হঠাৎ করেই যেকোন সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে। তাছাড়া তারা একটু আবেগ প্রবণ হওয়ায় সামান্য আঘাতেই আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়। এর বাইরেও কিছু বিষয় থাকে যা মানুষ খুব সহযে মেনে নিতে না পেরে আত্মহত্যার পথ বেছে নিচ্ছে।
এদিকে বরিশাল সরকারী বিএম কলেজের সমাজ বিজ্ঞান বিভাগের এক অধ্যাপক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, সামাজিক অবক্ষয় এবং অভিভাবকদের বেখেয়ালের কারনে আত্মহত্যার প্রবণতা বাড়তে পারে। বিশেষ করে বাংলাদেশের সাথে বিদেশি কালচার এবং বিদেশী বিভিন্ন চ্যানেলের সিরিয়াল দেখেও আত্মহত্যার পথ বেছে নিচ্ছে। এ জন্য পরিবারের অভিভাবকদের কিছু দায়িত্ব রয়েছে। ছেলে মেয়েদের দিকে নজর রাখার পাশাপাশি তার ইচ্ছা অনিচ্ছাকে প্রাধান্য দিলে আত্মহত্যার প্রবণতা কমে যাবে বলেও মতামত ব্যক্ত করেন এই সমাজ বিজ্ঞানী।