অসম্প্রদায়িক দেশ গড়ার প্রত্যয়ে বর্ষবরন

রুবেল খান॥ ব্যাপক উৎসাহ উদ্দিপনা আর বর্নিল আয়োজনে বরন করা হলো নববর্ষ-১৪২২ বঙ্গাব্দ। গত মঙ্গলবার ১লা বৈশাখে উদীচী আয়োজিত প্রভাতী অনুষ্ঠানের মধ্যে দিয়ে বর্ষ বরন অনুষ্ঠানের শুভ সুচনা হয়। এরপর দিন ব্যাপী বৈশাখ বরনে নানা কর্মসূচিতে মেতে ছিলো বরিশালবাসী। প্রশাসনের কড়া নিরাপত্তা আর সু-শৃঙ্খল পরিবেশের মধ্যে দিয়ে আজ ৩রা বৈশাখ শেষ হচ্ছে বিভিন্ন সামাজিক. সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান আয়োজিত বৈশাখী উৎসব। বাঙালী জাতীর প্রধান সংস্কৃতি এবং নানা স্মৃতি বিজরীত বাংলা নববর্ষের ১৪২২ বঙ্গাব্দ বরনে ১লা বৈশাখ বরিশাল নাটক’র সহযোগিতকায় উদীচী আয়োজন করে প্রভাতী অনুষ্ঠান। ‘সহিংসতার বিরুদ্ধে সংস্কৃতির প্রতিবাদ’ এই শ্লোগান নিয়ে বরিশাল বিএম স্কুলের তমাল তলায় আয়োজিত প্রভাতী অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন প্রবীন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব নিখিল সেন। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনে বলেন, বাঙালির চরিত্র মাথা নোয়াবার নয়। তাই নতুন বছরে সকল প্রতিকুলতা দূর করে এবং অসম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ার দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে বাংঙালীকে এগিয়ে যাওয়ার আহবান জানান তিনি।
পরবর্তীতে উদীচী শিল্পী গোষ্ঠীর শিল্পীরা ‘এসো হে বৈশাখ এসো এসো’ এই সংগীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে প্রভাতী অনুষ্ঠান শুরু করেন। অনুষ্ঠানে জাতীর সূর্য সন্তান মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে জাতীয় পতাকা তুলে দেন চারুকলা বিদ্যালয়ের সংগঠক দ্বয়।
প্রভাতী অনুষ্ঠান শেষে কোমলমুতি শিশুদের হাতে রাখি পরিয়ে রাখি বন্ধন অনুষ্ঠানের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন ঘোষনা করেন বরিশাল জেলা প্রশাসক মো. শহীদুল আলম। রাখি উৎসবের পর পরই শুরু হয় উদীচীর ঢাক উৎসব। এই উৎসবের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন বরিশাল মহানগর পুলিশের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ও মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার শৈবাল কান্তি চৌধুরী। এর আগে বরিশাল প্রেসক্লাবের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত হয় বৈশাখী পান্তা-ইলিশ উৎসব। সকাল ৭টায় পান্তা-ইলিশ উৎসবের উদ্বোধন করেন প্রেসক্লাব সভাপতি কাজী নাসির উদ্দিন বাবুল। এসময় উপস্থিত ছিলেন প্রেসক্লাব সাধারন সম্পাদক পুলক চ্যাটার্জী ও পরিবর্তন সম্পাদক কাজী মিরাজ সহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দ।
সকাল ৭টায় জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে সার্কিট হাউজে অনুষ্ঠিত হয়েছে লোকজ সংস্কৃতি অনুষ্ঠান ও শিশু একাডেমির চিত্রাংকন প্রতিযোগিত।
এদিকে সকাল সাড়ে ৮টায় বাংলা নববর্ষ ও বাঙালী জাতীর মঙ্গল কামনায় বের করা হয় এক বর্ণাঢ্য মঙ্গল শোভাযাত্রা। চারুকলার নেতৃত্বে এবং উদীচী ও বরিশাল নাটক’র সহযোগিতায় শত শত বাঙালীর অংশগ্রহনে বিএম স্কুলের তমাল তলা থেকে মঙ্গল শোভাযাত্রাটি বের হয়। শোভাযাত্রায় অংশ নেন বরিশাল-২ আসনের সংসদ সদস্য ও জেলা আওয়ামী লীগের সাধারন সম্পাদক এ্যাড. তালুকদার মো. ইউনুস, বরিশাল জেলা প্রশাসক মো. শহীদুল ইসলাম ও বরিশাল মহানগর পুলিশ প্রধান শৈবাল কান্তি চৌধুরী সহ বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক, শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও নানা শ্রেনী-পেশার মানুষ। মঙ্গল শোভাযাত্রাটি কালিবাড়ি রোড, সদর রোড, গৃজামহল্লা, চকবাজার, বাজার রোড, স্ব-রোড, নাজিরের পুল, জেল খানার মোড়, হাসপাতাল রোড, উত্তর মল্লিক রোড ও কালিবাড়ি রোড হয়ে সিটি কলেজ প্রাঙ্গনে শেষ হয়।
শোভাযাত্রা শেষে চারুকলা বিদ্যালয়ের উদ্যোগে ১০ জন বাংলার সূর্ষ সন্তান বীর মুক্তিযোদ্ধাদের উত্তোরিও এবং ফুলেল শুভেচ্ছা প্রদান করা হয়।
এছাড়া ‘অনেক আলো জ্বালাতে হবে মনের অন্ধকারে’ এই প্রত্যয় নিয়ে খেলাঘর সংগঠনের আয়োজনে সকাল ৭টায় থেকে অশ্বিনী কুমার হল চত্ত্বরে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। প্রান্তিক সংগীত বিদ্যালয়ের উদ্যোগে সকাল ১০টায় অনুষ্ঠিত হয় প্রীতি সম্মেলন। সকাল ১০টায় বান্দ রোডের ব্যাপ্টিস্ট মিশন বালিকা বিদ্যালয়ে বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত হয় পান্তা-ইলিশ ও বর্ষবরণ উৎসব। নববর্ষ দুর্নীতি মুক্তের প্রত্যয় নিয়ে দুর্নীতি বিরোধী কার্টুন প্রদর্শন করে টিআইবি।
এছাড়া ১লা বৈশাখ বিকাল চারটায় শব্দাবলীর আয়োজনে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে তিনদিন ব্যাপী বর্ষবরন অনুষ্ঠান শুরু হয়। লাঠি খেলার মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন বরিশাল-২ আসনের সাংসদ এ্যাড. তালুকদার মো. ইউনুস। পরবর্তীতে সেখানে আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়েছে। এসব ছাড়াও উদীচীর উদ্যোগে অনুষ্ঠিত হয়েছে আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। প্রথম দিনের আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সাংস্কৃতিক সংগঠক শাহান আরা বেগম।
এর পাশাপাশি বরিশাল বিএম স্কুল মাঠে শুরু হয় তিন দিন ব্যাপী বৈশাখী মেলা। উদীচী শিল্পগোষ্ঠির আয়োজনে অনুষ্ঠিত বৈশখ মেলার দ্বিতীয় দিন গতকাল বিকালে ঐতিহ্যবাহী লাঠি খেলা অনুষ্ঠিত হয়। এছাড়া চারুকলার উদ্যোগে পহেলা বৈশাখ সকাল ৯টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হয় লোকজ সংস্কৃতি প্রদর্শন অনুষ্ঠান। চারুকলার দ্বিতীয় দিনের অনুষ্ঠান কর্মসূচির অংশ হিসেবে গতকাল সিটি কলেজ প্রাঙ্গনে অনুষ্ঠিত হয় লোকজ অনুষ্ঠান জারি ও কবি গান।
ধনী গরিবের পাশাপাশি বরিশালে এ উৎসবে আনন্দের কমতি ছিলোনা পথশিশু অর্থাৎ পথকলিদের। বরিশাল পথকলি বিদ্যানিকেতন নামে পথশিশুদের হাতেখরি দেয়া ব্যক্তি ফিরোজ মোস্তফা’র উদ্যোগে তৈরি স্কুল থেকেই দিনব্যপি বরিশাল লঞ্চঘাট এলাকার পথশিশুকে দেয়া হয় নববর্ষের স্বাদ। সকালে ফকিরবাড়ি রোডের ক্লাব (অস্থায়ী স্কুল) থেকে স্কুলের ২৭ জন পথশিশুকে নিয়ে র‌্যালি বের করা হয়। র‌্যালিটি নগরীর বিভিন্ন সড়ক হয়ে বান্দরোডের ব্যপ্টিষ্ট মিশন বালিকা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে শেষ হয়। সেখানে শিশুদের নতুন পোশাক দেয়ার পাশাপাশি খাওয়ানো হয় বাঙালীর ঐতিহ্য পান্তা-ইলিশ। পরবর্তীতে তাদের ঘুরতে নেয়া হয় নগরীর ত্রিশ গোডাউনের কীর্তনখোলা নদীর পারে।
ফুলকুঁড়ি আসরের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত হয়েছে শিশুদের বর্ণাঢ্য র‌্যালী। এই র‌্যালীটি নগরীর বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে।
এ ছাড়াও নগরীর আমানতগঞ্জে ঐতিহ্যবাহী চাঁদের হাট বৈশাখী মেলা, বান্দ রোডের প্লানেট পার্কে তিন দিন ব্যাপী বৈশাখী মেলা, রূপাতলী এ ওয়াহেদ মাদ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের মাঠে এবং বরিশাল বিশ্ব বিদ্যালয় সংলগ্নে বৈশাখী মেলা অনুষ্ঠিত হয়েছে। প্লানেট পার্কে তিন দিন ব্যাপী বৈশাখী মেলার পাশপাশি রয়েছে কনসার্ট।
এদিকে বৈশাখের প্রথম এবং গতকাল দ্বিতীয় দিনে নগরীর প্রতিটি মেলা ও বিনোদন কেন্দ্রগুলোতে ছিলো ব্যাপক ভির। দর্শণার্থীদের ভিরে এসব বিনোদন কেন্দ্র গুলোতে তিল ধরানো ঠাই ছিলোনা। সকাল থেকে রাত পার্যন্ত বাঙালী ছেলে- মেয়ে সহ সকল বয়সের মানুষের উপস্থিতি ছিলো দেখার মত।