অমর সুরের অবিনাশী গান একুশের গান

মুকুল দাস
আবার এসেছে একুশ। তবে এখনকার একুশ অন্যান্যবারের চেয়ে অন্যমাত্রা নিয়ে আসে। কারণ একটাই। একুশে ফেব্রুয়ারি বিশ্বভাষা দিবস হিসেবে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেয়েছে। তাই এখন শুধু বাঙালীর একুশ নয়। যে একুশ ছড়িয়ে গেল সবখানে। সবার সাথে রঙ মেশাবে বলে। একুশ এলেই যে গান আমাদের আলোড়িত করে, উদ্দীপিত করে সেই প্রভাত ফেরীর গান “আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো” আমরা আজো কন্ঠে নিয়ে নেমে পড়ি ভোরের মিছিলে। সালাম বরকতের ভাই বলেই। এই অমর গানের সুরকার শহীদ আলতাফ মাহমুদ আমাদের ঘরের ছেলে। বরিশালের গৌরব। শহীদ আলতাফ মাহমুদ একুশের গানের কিংবদন্তী সুর¯্রষ্টা। বরিশালের কীর্তিমান আলতাফ মাহমুদ এই বরিশালে বসেই “আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো” অমর গানটিতে সুরারোপ করেছিলেন। সুরের প্রাথমিক খসড়া করেছিলেন শ্রীনাথ চ্যাটার্জী লেনের এক বাড়িতে। পরবর্তীতে আর,সি, দাশগুপ্তের বিল্ডিং এর তেতলায় শিল্পী সংসদে বসে গানটি নবজন্ম লাভ করে। সুর রচনা করতে গিয়ে শহীদ আলতাফ মাহমুদ তাল, লয় নির্ধারণের ব্যাপারে প্রয়াত সঙ্গীত গুরু নারায়ন সাহা মাস্টার মশাই এর সহায়তা পেয়েছিলেন এবং এই গানের সাথে নারায়ন সাহা মাস্টার মশাই তবলায় সঙ্গত করেছিলেন। প্রয়াত নারায়ন সাহার কাছ থেকে জানা যায়, রবীন্দ্রনাথের ‘আনন্দলোকে, মঙ্গলালোকে’ গানটির সুরের প্রভাব একুশের এই গানে কিছু পড়েছে। সত্তর সালে বংশীবাদক বন্ধু বরুণ সেনের সাথে শহীদ আলতাফ মাহমুদের বাসায় যাই। তখন তিনি থাকতেন সিদ্ধেশ্বরী তে। প্রাথমিক পরিচয়েই আলাপ জমে উঠেছিল। তার স্বকন্ঠে গাওয়া ‘তানহা’ ছবির ‘ও রাহী নাদান’ এবং কখগঘঞ ছবিতে ‘পাগলা তুই ভবের রীতি’ গানটার প্রসঙ্গ তুলেছিলাম। সেদিন ফিল্মী গান নিয়ে যতো আলোচনা করেছিলাম, একুশের গান নিয়ে ততোটা নয়। কিন্তু আজ ফিল্মী গানের সুর ভুলে গিয়ে বাঙালি “আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো” কেই আপন করে নিয়েছে। “ওরা আমার মুখের কথা কাইড়া নিতে চায়” সকল সাংস্কৃতিক সংগঠনের শিল্পীরা পরিবেশন করে থাকে সমবেতকন্ঠে। এই গানটি যখন পরিবেশিত হয় তখন একুশের চেতনায় উদ্দীপিত হয় প্রতিটি বাঙালী শ্রোতা-জনতা। এই অবিনাশী গানের গীতিকার ও সুরকার বরিশালের অহঙ্কার আবদুল লতিফ। একুশের গান বললে অনেক গানের মধ্যে আবদুল গাফফার চৌধুরী রচিত “আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো” গানটি শ্রেষ্ঠ বলে বিবেচিত হয় সর্বত্র। এই গানটির প্রথম সুরকার ছিলেন আবদুল লতিফ। এই গান প্রসঙ্গে একটি কথা বলতেই হয় শহীদ সুরকার আলতাফ মাহমুদ আবদুল লতিফের সুরের কাঠামো অবিকৃত রেখেই চার্চ মিউজিকের আবহে সুরটি কম্পোজ করেন। আবদুল লতিফের কথা ও সুরে আরো একটি একুশের বিখ্যাত গান ‘ও আমার এই বাংলা ভাষা’। এছাড়া আবদুল লতিফের ‘রফিক, শফিক, বরকত নামে’ গানটি এক সময় গাওয়া হত একুশের কথা মনে রেখে। সামসুদ্দীন আহমেদের ‘রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন করিলিরে’ এই গানটির সুরকার হিসেবে আলতাফ মাহমুদের নাম এসেছে সেলিম রেজা সম্পাদিত ‘মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি ও গান’ গ্রন্থে। কিন্তু সতের বছর আগে প্রথম আলোয় আবদুল লতিফের সাক্ষাৎকারে লতিফ ভাই সুরকার হিসেবেও সামসুদ্দীন আহমেদের নাম করেছেন। পঞ্চাশের দশকে বরিশালে সে সময়ের বিখ্যাত গণসঙ্গীত শিল্পী মামুনুর রশীদ এই গানটি গেয়ে সবাইকে কাঁদাতেন। পরে সেলিম বিন আযম এই গানটিকে পরিবেশনাগুণে আরো হৃদয়স্পর্শী করে তোলে। বরিশালে ষাটের দশকে মহিলা কলেজের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক সানাউল মাহমুদ অনেক দেশের গান লিখেছিলেন। কিন্তু এর মধ্যে একুশের পটভূমিতে “রক্তের অক্ষরে স্বাক্ষর দিলাম” গানটি তখন বরিশালে খুব চলত। এই গানে সুর দিয়েছিলেন অরুণ সেন এবং একটা সময় রবীন্দ্র সঙ্গীত শিল্পী তপন মাহমুদ এই গানটি গেয়ে জনপ্রিয়তা পেয়ে যায়। চট্টগ্রামের বিখ্যাত কবিয়াল রমেশ শীল একুশের উপর দু’খানি মর্মস্পর্শী গান রচনা করেছিলেন। তার একটি “একুশে ফেব্রুয়ারি আবার দেখি ফিরে এল” এবং অপরটি “ভাষার জন্য জীবন হারালি”। এই সময়ে বদরুল হাসান লিখলেন ‘ঘুমের দেশে ঘুম ভাঙাতে” এবং তাতে সুরারোপ করলেন আলতাফ মাহমুদ। এই গানটি জনপ্রিয়তা পেয়ে যায় ভীষণভাবে। একুশের গানের আরেক গীতিকার মোশাররফ উদ্দীন আহমেদকে আমরা পেয়ে যাই তার “মৃত্যুকে যারা তুচ্ছ করিল ভাষা বাঁচাবার তরে” গানের মাধ্যমে। এই গানটিতেও সুর সংযোজন করেছিলেন আমার মতো আরো অনেকের ঝিলু ভাই নামে খ্যাত আলতাফ মাহমুদ। সম্ভবত একুশের গানের প্রথম রচয়িতা ভাষা সৈনিক গাজীউল হক। গাজীউল হকের লেখা এবং নিজাম-উল-হকের সুরে ‘ভুলবনা ভুলবনা একুশে ফেব্রুয়ারি ভুলবনা”। এই গানটির কথা শিল্পীদের মধ্যে ক’জনে জানে। এরকম আরেকটি ভুলে যাওয়া একুশের গান “একুশ আসে জানাতে বিশ্বে ভাষার কতটা মূল্য”। গানটির কথা ও সুর লোকমান হোসেন ফকির এর। ষাট দশকের প্রথম দিকে খুলনার সন্দীপন গোষ্ঠীর কাছ থেকে অনেক গণসঙ্গীত পেয়েছি আমরা। এই গণসঙ্গীত রচয়িতাদের মধ্যে প্রথমেই নাম আসে নাজিম মাহমুদের। নাজিম মাহমুদ গণসঙ্গীত ছাড়াও একুশের গানের গীতিকার হিসেবে সুপরিচিত। তার রচিত “আমাদের চেতনার সৈকতে একুশের ঢেউ মাথা কুটলো” গানটিতে সুর করেছিলেন সাধন সরকার। এই মুহুর্তে খুলনা ভিত্তিক একুশের গান “একুশের সীমাহীন পিপাসা” মনে দোলা দেয়। একুশের গানের অনুষ্ঠানে “রক্ত শিমুল তপ্ত পলাশ ছিল ডাক” গানটি এখন অহরহ শোনা যায়। বলতে দ্বিধা নেই, বাংলাদেশে যত একুশের গান রচিত হয়েছে তার সুরকার হিসেবে হয় দেখবো আলতাফ মাহমুদকে নয়তোবা আবদুল লতিফকে। বলা যায়, একুশের গানের সফল এবং সার্থক সুরকার হিসেবে এ দু’জনের কথা বাঙালি কখনো ভুলে যাবেনা। এবং তাদের নাম চিরদিন শ্রদ্ধার সাথে উচ্চারিত হবে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে। কিন্তু একটা কথা থেকেই যায়। স্বাধীনতার আগে একুশের গানের যে বাণী ও সুর প্রাণিত করতো শ্রোতা-জনতাকে, স্বাধীনতার এত বছর পরেও আর কোন গীতিকারের হাতে তেমনভাবে একুশের গানতো আমরা পেলাম না। নাকি গীতিকারেরা এখন একুশের চেতনা থেকে দূরে সরে গিয়েছেন। মুখ রেখেছেন বটে একজন। স্বাধীনতার পরপর বরিশালের সে সময়ের তরুণ গীতিকার সদ্যপ্রয়াত অসিত দাস একুশের চেতনাকে বুকে ধরে বেশ কয়েকটি একুশের গান লিখেছিলেন। তার মধ্যে “ওগো একুশে ফেব্রুয়ারি রুদ্ধ প্রাণের” এবং “এ আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো পলাশ দিন” গান দুটিতে সুর দিয়েছিলেন প্রয়াত বশিরুল হক বাদল। এছাড়া অসিত দাসের আরো একটি গান “শহীদ দিবসে মৃত্যুঞ্জয়ী শহীদের গান গাই” এ গানটির সুরকার ছিলেন সঙ্গীত শিক্ষক শান্তিরঞ্জন কর্মকার। তবুও বলতে হয় একুশের চেতনাকে ধরে রাখতে আবার একজন আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী ও আবদুল লতিফের মতো একুশের গানের কালজয়ী গীতিকার আমরা কবে পাবো।