অপেক্ষা করি অনন্তকাল ধরে, শুধু একটি শব্দ শোনার জন্যে…

॥ জেবুন্নেছা আফরোজ ॥
‘আমি এখন থেকে যতদিন বাচঁবো ততদিন আমার বরিশালের জন্য সময় দেবো, আমার বরিশালকে তিলোত্তমা বরিশাল গড়ে তুলবো, বরিশালের উন্নয়ন ছাড়া আমার আর কোন কাজ নেই।’ ‘পৃথিবী ছেড়ে একদিন তো চলে যেতে হবে। আমি চলে গেলে তোমার কোন সমস্যা হবে না। তুমি থাকবে আমার প্রতিবিম্ব হয়ে। সবাই তোমাকে দেখবে। ছেলে-মেয়ে যদি নাও দেখে, আমার বরিশালবাসী তোমাকে দেখে রাখবে।’ আমি জানিনা মানুষ মৃত্যুর আগে কোন কিছু বুঝে কিনা। হিরন শেষ ছয় মাস অনেক কথা বলেছে। যার অর্থ আমি খুঁজে পাইনি। তাঁরই কথার রেশ ধরে আমি বলেছিলামÑ ‘তাহলে তৃণা-সাজিদকে কে দেখবে? সহাস্য প্রত্যুত্তর তাঁরÑ তৃণা-সাজিদের জন্য তুমি আছো, আর তোমার জন্য তোমার ছেলে-মেয়ে; কিন্তু আমার বরিশালের জন্য আমি ছাড়া আর কে আছে বলো?’ এই ছিলো আমার সাথে হিরনের সর্বশেষ কথা, অর্থাৎ ২২মার্চ রাত ৯টায়। তখন আমি ছিলাম ঢাকায়, আর ও বরিশাল। তার একটু পরই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় বিপর্যয়ের খবর আসলো। আমি বুঝিনি আমার জীবনের রং ধূষর হয়ে যাবে, ভেবেছিলামÑ শরীরটা একটু খারপ, সব অপেক্ষা করি অনন্তকাল

ঠিক হয়ে যাবে। ঢাকা নিয়ে আসার পরও ভেবেছি সব ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু না। কি বলবো আমি হিরন সম্পর্কে? কোন কিছু বলার যে ভাষা নেই আমার। হিরন সম্পর্কে আমি যতদুর জানি তার চেয়ে বেশি জানেন তার প্রিয় বরিশালবাসী। সে দুনিয়ায় থেকে চলে যাবার পর অনেক কিছু জানতে পারলাম যা আমি আগে জানতাম না। তাঁর রাজনীতি, মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালনকালীন সময়, বরিশাল এবং বরিশালবাসীর প্রতি দায়বদ্ধতা, উন্নয়ন ভাবনা বা ব্যক্তি হিরণের কোন বিষয় বলে কোনটা শেষ করবো তা ভেবে পাচ্ছি না। তবে আমি বিশ্বাস করিÑ হিরনের কাজ-কর্মে ছিলো পরশপাথরের ছোঁয়া। ২০০৮সালে আমি আর হিরন সিলেট গিয়েছিলাম। সার্কিট হাউজ থেকে বেড় হই রিক্সায় ঘুরে শহরটা দেখবো বলে। খুব ভির ছিলো না রাস্তায়। তখন হিরন তার নিজের মনেই বলছিলোÑ ‘আল্লাহ যদি কোনদিন আমাকে বরিশালের খেদমত করার সুযোগ দেয় তাহলে আমি বরিশালকে বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ নগরী হিসেবে গড়ে তুলবো’। ওর এ কথা শুনে আমি হেসে ফেললাম। আমার হাসি দেখে হিরন সামান্য কষ্ট পেয়ে বলেছিলÑ ‘তুমি দেখে নিও কোন দিন যদি আমি সুযোগ পাই তাহলে আমি আমার এ কথার প্রমান দেব। আমার কাছে হিরনের ওই কথাগুলো ছিলো স্বপ্ন দেখার মতো।
এই কথা বলার ঠিক ৪৫দিন পরেই আল্লার অশেষ কৃপায় হিরণ মেয়র হলেন। মেয়র হিসেবে যখন ভোররাতে হিরনের নাম টিভিতে ঘোষণা করা হলো। এর কিছুক্ষণ পরেই আমার সাথে হিরনের কথা হলো। আমাকে বললোÑ আমি তোমাকে সিলেট বসে বলেছিলাম, বরিশালকে আমি নতুন করে সাজাবো, যারা অনেক দিন যাবৎ বরিশালের বাইরে আছে আর যারা কোনদিন বরিশালে আসেনি তারাও যেন আমার বরিশালকে দেখে অবাক হয়। সকলেই আবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলবেÑ ‘বরিশাল এত সুন্দর’। হিরনের ওই কথা শুনেও আমি কিন্তু হেসেছিলাম। কিন্তু না, হিরন তার কথা রেখেছে অক্ষরে অক্ষরে। ওই সময়ের মাত্র ৪বছরের ব্যবধানে বরিশাল নগরী ছাড়িয়ে গোটা বরিশালকে এক নান্দনিক রূপ দিতে সক্ষম হয়েছিল সে।
হিরনের বরিশাল আমার গর্বের বরিশাল। মাত্র ২৮বৎসর বয়সে হিরন উপজেলা চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছিল। তখন থেকেই জনসেবা করার সুযোগ পেয়েছিল। মাত্র ১৮মাস অর্থাৎ দেড় বছর তার পরে অনেক লম্বা সময়। রাজনীতির মাঠে ও ছিল একজন কর্মী। অনেক ঘাত-প্রতিঘাতও সহ্য করতে হয়েছে। ও যখন মাঝে মাঝে মন খারাপ করতো আমি ওর পাশে থেকে সবসময় সাহস দিয়েছি। হিরন মাঝে মাঝে বন্ধু-বান্ধবদের বলতোÑ জেবু পাশে না থাকলে আমি মনে হয় রাজনীতিতে এমনিভাবে আসতে পারতাম না। ২০০১সালে যখন বিএনপি জোট সরকার ক্ষমতায় আসলো। তখন হিরনের সামনে ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। বরিশালে বিএনপি-জামায়াত জোট অবর্ণনীয় নির্যাতন চালিয়েছে। সব কিছুতেই বাধার সৃষ্টি করেছে। কিন্তু ও কোনদিন ভেঙ্গে পরেনি। হিরন প্রতিপক্ষের দলের রাজনীতিকে সব সময় চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছে। ওর একটাই কথা ছিলÑ ‘আমার নেত্রী শেখ হাসিনার দোয়া আছে আমার সাথে।’
শুধু রাজনীতি নয়। ওর সব সময়ই প্রচেষ্টা ছিলো বরিশালের আগ্রগতি। তাই দেশের বাইরে যেখানেই যেত সেখানেই ভালোটুকুর ছবি তুলতো আর বিভিন্ন স্পটের দৃশ্য দেখে আসতো। আর ওই অনুকরণে কিভাবে তার বরিশালের ভিন্ন ভিন্ন সেক্টরে আধুনিক হিসেবে গড়ে তোলা যায় তা নিয়ে ভাবতো আর বাস্তবায়ন করতো। তার অন্যতম নিদর্শনা হচ্ছে বরিশাল ক্লাবসহ বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান।
হিরন তাঁর রাজনীতি আর সামাজিক কাজে নিয়ে সব সময় মননিবেশ করতো। কিন্তু তাঁর যে পরিবার আছে, সে যে একজন বাবা, একজন স্বামী তাও ভুলে যেত। সংসারে সময় দেয়া ভুলে গিয়েছিল। আমি একদিন একটু অভিমান করে বলেছিলামÑ ‘বলতো, তোমার ছেলে সাজিদ এখন কোন ক্লাসে পড়ছে।’ ও উত্তর দিতে পারেনি। ওর সব দিকে খেয়াল ছিল। কিন্তু সংসারের ব্যাপারে ছিল উদাসীন। এক্ষেত্রে হিরনের একটাই কথা ছিলÑ ‘তুমি তো আছ’। আত্মীয়-স্বজনদেরকে বলে বেড়াতোÑ ‘জেবু সব সামলে নেবে।’
হিরন বেঁচে থাকতে আমি অনুভব করতাম সবাই হিরনকে ভালবাসে। কিন্তু কতটা ভালবাসে তার প্রমান পেলাম ২২ শে মার্চ যেদিন হিরন অসুস্থ হয়ে পড়ল। আর সে দিন থেকে ৯ এপ্রিল ওর দুনিয়া থেকে চলে যাবার পর লাখো মানুষের আহাজারি প্রমান করে দেয়Ñ ‘মানুষ চলে যায় রেখে যায় তার কর্মকা-।’ হিরন এত অল্প সময়ের মধ্যে যে কত বিস্তার কর্মকা- রেখে গেছে তা তার প্রিয় বরিশালবাসীর আজানা নয়। যেদিকে তাকাই সব দিকেই পাই ওর ষ্পর্শ। আমি যখন একা থাকি বা কোন সংসদীয় কাজের জন্য বাইরে যাই তখন মানুষের কাছে এমপি জেবুন্নেছা আফরোজের চেয়ে হিরনের স্ত্রী হিসেবে পরিচয় পরিচয় পেয়ে আমার বুকটা গর্বে ভরে ওঠে।
অনেকে হয়তো তাকে কোনদিন দেখেনি, কিন্তু হিরনের কর্মকা-ের বর্ণনা শুনেছেন, তারা আমাকে দেখতে আসেন হিরণের প্রতিচ্ছবি হিসেবে। তখন অনুভব করিÑ হিরণ মানুষের কতটা আদরের। কতটা শ্রদ্ধার।
তৃনা আর সাজিদ সম্পর্কে ও সব সময় বলতÑ ‘ছেলে মেয়ে ২জনকে লেখাপড়ার শেষে রাজনীতিতে নিয়ে আসব, যখন আমি দুনিয়াতে থাকব না তখন ভাই-বোন আমার নাম রাখবে।’
হিরন অসুস্থ হবার দিন পনের আগে ঢাকাতে আমার সাথে দেখা হয়। আমি সাধারণত লাল শাড়ি পড়ি না। ওই দিন সখের বসে লাল শাড়ি পড়েছিলাম। ওই অবস্থায় আমাকে দেখে হিরন বলে উঠলোÑ ‘তোমাকে নতুন বউয়ের মত লাগছে।’ ওই দেখাই ছিল সুস্থাবস্থায় শেষ দেখা। তবে দেখা হয়েছে, তখন হিরন সাদা কাপর জড়িয়ে ছিল।
হিরনের কলিজার টুকরো সাজিদ, তৃণা। হিরন সব সময়ই ওদের সাথে নিয়ে আমার বিরুদ্ধে লেগতো। ও প্রায়ই তৃণাকে বলতোÑ ‘তৃণা তোমার মা আমার সব দখল করে নিচ্ছে।’ তৃণা হাসতো। এখন ভাবি ঠিকই তো আমি তো হিরনের সব দখল করে নিয়েছি। শেষ পর্যন্ত হিরনের সংসদ সদস্য পথটাও দখল করে নিয়েছি।
৯ই এপ্রিল মোয়াজ্জিনের কণ্ঠে ফজরের আজান ভেসে আসে ঠিক তখন এ্যাপোলোর ডাক্তার তৃণাকে কল দেয়। তখন ওযু করতে গিয়েছি। তৃণা মা বলে ডাকার সাথে সাথে আমি বলে উঠেছিলামÑ ‘তোমার বাবা আমাদের ডাকছে, চল তাঁর কাছে যাই।’ আমি, তৃণা, লোপা (আমার বোনের মেয়ে) সবাই ওর মাথার কাছে দাঁড়িয়ে দোয়া-দুরুদ পরছি। তৃণা ওর বাবার বুকের ওপর মাথা রেখে করুনভাবে বলেÑ ‘বাবা তুমি একটু আদর কর, কত দিন তুমি আমাকে আদর করনা, কতদিন বাবা তুমি আমাকে তিয়া বলে ডাক না, কতদিন তুমি আমাকে বুকে জড়িয়ে নাওনা, আমার বুকটা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে বাবা।’ লেপো বলে বুবু কলেমা শাহাদাত পড়। ডাক্তারা বলেনÑ ‘ম্যাডাম একটু সহযোগিতা করতে হয় অপনার। আমার একটু খেয়াল হলো, অস্ফুটে বলিÑ ‘আমার সাজিদকে কাছে আন’। ১মিনিটের মধ্যে সাজিদকে তুলে আনা হলো। সাজিদ লোপাকে জড়িয়ে ধরে বলে, আমার বাবাকি আমাকে ডেকেছে বুবু? আজ আমি সারাদিন বাবার কাছে থাকব, আজ তো আমার পরীক্ষা নাই। আমি, তৃণা, সাজিদ তিন জনে জড়িয়ে ধরে হিরণের হাত ধরে থাকি। ডাক্তার শুধু বলে ম্যাডাম এখন স্যারকে বিদায় দেবার পালা আপনারা স্যারকে বিদায় দিন। কিছু বুঝে উঠতে পারিনি।
হাসপাতালের জানালার গ্লাসের ফাঁক দিয়ে হালকা রোদ এসে হিরনের গালে পরছিল। রোদে কষ্ট হবে দেখে তৃণা- সাজিদ ওদের বাবাকে আড়াল করে দাঁড়ায়। তৃণা বাবার বুকের উপর মাথা রেখে জড়িয়ে ধরে থাকে যাতে করে ওদের বাবার কোন কষ্ট না হয়। তৃণা চিৎকার করে আল্লাহকে ডাকে। ওর বাবাকে ওদের কাছে ফেরত দেবার জন্য। এ্যাপোলোর ডাক্তাররা দাঁড়িয়ে কলেমা শাহাদাত পড়ছে। স্তব্দ এ্যাপোলো হাসপাতাল। সাজিদ চিৎকার করে বলে আমাকে ২মিনিট আগে কেনো ডাকনি। আমি ছেলের প্রশ্নর উত্তর দিতে পারিনি। সাজিদকে বুকে নিয়ে মনে মনে বলি তোমার মা’কে মাফ করে দাও। বলি ওকে সারাজীবনের জন্য তোমার বাবা তোমার উপর বোন আর মাকে দেখার দায়িত্ব দিয়ে গেছে। এখন থেকে তুমিই তো সব দেখবে। মনে করতে পারছিনা সব এলোমেলো, টুকরা টুকরা কথা। সব সময়ই চার জনের একটা ছোট সংসার, সুখের সংসার আমার। হঠাৎ করে দেখি আমাদের সামনে ট্রলিতে হিরন শুয়ে আছে কি শান্তির ঘুম…। সাদা কাপর দিয়ে ঢেকে আছে ওর শরীর। আমার ছোট্ট সুখের সংসার তৃণা, সাজিদ হিরন আর আমি। এই চারজন একটা রুমে, তারপরে লিফটে। শুধুই চারজন সুখের সংসার আমারা জড়াজড়ি করে দাঁড়িয়ে আছি। হিরন সাদা চাদরে জড়িয়ে শান্তির ঘুম ঘুমাচ্ছে। রুমের বাইরে চলছে আহাজারি-আর্তনাদ। ভেতরে আমরা, এরপর জানিনা কিছুই।
৯ এপ্রিল সকাল ১০টায় গাড়িতে হিরনকে নিয়ে ঢাকার বাসায় আনা হয়। পেছনের গাড়িতে আমরা। কি যে করুন দৃশ্য। গুলশান-১ এর সব রাস্তা বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। বাসার নিচে হিরনকে শুইয়ে রাখা হয়েছে। জানি না, মনে করতে পারছি না এরপর কিছুই আর। এটুকুই জানিÑ তৃণা তার ভাইকে নিয়ে ওর বাবার পাশে বসে ‘বাবা বাবা বলে ডাকছে।’
এখন শুধুই স্মৃতি রোমন্থন করি হিরন পয়েন্টে বসে। কল্পনার রাজ্য তৈরি করে তার প্রতিটি স্থানে হিরনের স্পর্শ অনুভব করি। দেখতে দেখতে ৩৬৫দিন পার হয়ে গেলো। এরপরে আরো ১০-২০বছর কেটে যাবে। যতদিন বেঁচে থাকবো ততদিন পাহাড়া দেবো এই হিরন পয়েন্ট।
রাতে বারান্দায় দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করি কখন কালিংবেল বেজে উঠবে। কলিংবেল বাজে কিনা শোনার চেষ্টা করি। অপেক্ষা করি আনন্তকাল ধরে শুধু একটা শব্দ শোনার জন্যেÑ ‘জেবু চলো ভাত খাই।’…