অপরাধের স্বর্গরাজ্য আবাসিক হোটেল

রুবেল খান॥ নিরাপদ ক্রাইম জোনে পরিনত হয়েছে নগরীর আবাসীক হোটেলগুলো। প্রতিনিয়তই এসব আবাসীক হোটেলে মাদকের হাট বসছে। আইন কানুনের তোয়াক্কা না করে পরিচালিত হোটেল মালিক এবং সংশ্লিষ্টদের সহযোগিতায় আবাসীক হোটেল গুলোতে অপরাদ মূলক কর্মকান্ড সংঘঠিত হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। যে কারনে নিরবে নিবৃতে ঘটে চলা আবাসীক হোটেলের অপরাধ থামাতে পারছে না প্রশাসন।
খোঁজ নিয়ে জানাগেছে, বরিশাল নগরীতে শতাধিক আবাসীক হোটেল রয়েছে। যার মধ্যে কয়েকটি নামি-দামী ছাড়া বাকিগুলোর তেমন পরিচিত নেই বোর্ডারদের কাছে। তবে এসব আবাসীক হোটেল গুলোই অপরাধীদের কাছে বেশি জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। কেননা নগরীর মধ্যে হলেও এসব আবাসীক হোটেল গুলো এমন চিপা-চাপা স্থানে অবস্থিত যা একজন সাধারন মানুষের জন্য খুঁজে পাওয়াটাই দুঃষ্কর। এসব আবাসীক হোটেলে বোর্ডাররা সিট ভাড়া না নেয়ায় লোকসান গুনতে হয় মালিকদের। তার পরেও যুগের পর যুগ রহস্যজনক ভাবেই বহাল তবিয়তে চালিয়ে যাচ্ছে হোটেল ব্যবসা। কেননা বোর্ডার দিয়ে ব্যবসা না হওয়ায় আবাসীক হোটেল সাইনবোর্ড ব্যবহার করে অপরাধ মূলক কর্মকান্ড পরিচালনা করছে। বিশেষ করে ঐসব আবাসীক হোটেলে পতিতা ব্যবসাটাই বেশি হচ্ছে। তার সাথে রয়েছে মাদকের রমরমা বাণিজ্য।
তবে এ দিক থেকে শুধু মাত্র অপরিচিত আবাসীক হোটেল গুলোই নয়, নামি-দামী হোটেল গুলোতেও মাদক ব্যবসা হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। যার প্রামণ সম্প্রতি নগরীর আলি ইন্টারন্যাশনাল হোটেলে পুলিশের অভিযান। এসময় ঐ হোটেল থেকে ইয়াবা সহ এক মাদক বিক্রেতাকে আটক করে কোতয়ালী মডেল থানার এসআই দেলোয়ার হোসেন। এর পূর্বে নগরীর সাগরদী আমতলার মোড় আবাসীক হোটেল ইস্টার্ন থেকে ইয়াবা সহ মাদক ব্যবসায়ীকে আটক করে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের সাবেক সহকারী কমিশনার আজাদ রহমান। এর আগে মহাগর পুলিশ নগরীর পোর্ট রোডের একটি আবাসীক হোটেল থেকে অজ্ঞান পার্টির বেশ কয়েকজন সদস্যকে গ্রেফতার করে।
সূত্রে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, মাদক ব্যবসায়ীরা তাদের মাদক ব্যবসা পরিচালনার জন্য নিরাপদ স্থান হিসেবে নগরীর আবাসীক হোটেল গুলোকেই বেছে নিচ্ছে। বিশেষ করে নামি-দামী হোটেল গুলোতে বোর্ডার বেশে সিট ভাড়া নিচ্ছে। পরবর্তীতে খুচরা বিক্রেতাদের খবর দিয়ে হোটেলে ডেকে এনে মাদকের চালান পৌছে দিচ্ছে। এসব মাদক বিক্রেতারা প্রায়ই সাধারন মানুষের ভূমিকায় হোটেলের সিট ভাড়া নিচ্ছে। কোন কোন ক্ষেত্রে ভদ্রবেশেও হোটেলে অবস্থান নিচ্ছেন মাদক বিক্রেতারা। হোটেল গুলোতে মাদক ব্যবসায়ীদের ঘন ঘন আসা যাওয়ার কারনে মালিক এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সাথে সু-সম্পর্ক তৈরী হয় মাদক ব্যবসায়ীদের। যে কারনে খুব সহজে এবং নিরাপদেই হোটেল কক্ষে মাদকের হাট বসছে। তবে মাদক ব্যবসার সাথে কিছু হোটেল মালিক এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের হাত রয়েছে বলেও সূত্র নিশ্চিত করেন। শুধু মাত্র মাদক ব্যবসাই নয়, চুরি, ছিনতাই, ডাকাতি, লুটপাট, নাশকতামূলক কর্মকান্ড সহ বিভিন্ন অপরাধের প্লান পরিকল্পনা করছেন আবাসীকে হোটেলেই।
এদিকে মাদক ব্যবসা নিয়ে অনেক সময় হোটেল কক্ষেই সহযোগিদের হত্যার ঘটনাও রয়েছে। তবে এসব হত্যার ক্লু আদৌ পুলিশের কাছে অনুদঘাটিত রয়ে গেছে। বিশেষ করে নগরীর হাসপাতাল রোডে হোটেল প্যারাডাইস, চক বাজার হোটেল বরিশাল থেকে বিএম কলেজ ছাত্রের লাশ উদ্ধার, আগরপুর রোডে হোটেল ম্যালোডি, ভাটারখাল মেট্রো বোডিং এর ম্যানেজারের হাত পা বাধা লাশ, বান্দ রোডে হোটেল খান আবাসীক থেকে এক ব্যক্তির লাশ উদ্ধার এবং সর্বশেষ আবাসীক হোটেল এরিনা থেকে ফেলে দিয়ে এক ব্যবসায়ীকে হত্যা করা হয়। এছাড়াও নগরীর আরো বেশ কয়েকটি আবাসীক হোটেল থেকে বহু বোর্ডারের লাশ উদ্ধারের ঘটনা রয়েছে। যা বিভিন্ন সময় বিভিন্ন পত্রিকায় এ নিয়ে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। তবে বেশিরভাগ ঘটনার সুনির্দিষ্ট কোন কারন হত্যা, আত্মহত্যা নাকি স্বাভাবিক মৃত্যু তার তেমন প্রমান মেলেনি। এসব ঘটনার পেছনে মাদক ব্যবসা বা অপরাধ মূলক কর্মকান্ড থাকতে পারে বলে ধারনা স্থানীয়দের।
অপরদিকে বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশ সূত্রে জানাগেছে, নগরীর আবাসীক হোটেল গুলোতে অপরাধ প্রবনা কমাতে প্রতিটি হোটেলে সিটি ক্যামেরা স্থাপনের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। বহু আগে থেকে বিএমপি পুলিশ এ বিষয়ে হোটেল মালিক এবং কর্তৃপক্ষের সাথে দফায় দফায় সভা করে সিসি ক্যামেরা স্থাপনের সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিলেও সেই সিদ্ধান্ত এখনো বাস্তবায়ন হয়নি অধিকাংশ আবাসীক হোটেলে। হোটেল ব্যবসার স্বার্থে কোটি কোটি টাকা ব্যয় করলেও অদৃশ্য কারনে হোটেল মালিক কর্তৃপক্ষ অল্প কিছু টাকা ব্যয়ে সিসি ক্যামেরা স্থাপন করছে না। যে কারনে মাদক ব্যবসা এবং খুন সহ অপরাধ মূলক কর্মকান্ড ঘটে আসলেও অভিযুক্তদের চিহ্নিত করতে পারছে না পুলিশ। এটা হোটেল কর্তৃপক্ষের এক প্রকার পুলিশকে আইন শৃংখলা রক্ষায় অসহযোগিতা এবং সরকারী কাজে বাধা দেয়ার সামিল বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে এ নিয়ে পুলিশ প্রশাসন জোড়ালো পদক্ষেপ নিলে আবাসীক হোটেলে অপরাধ প্রবনতা কমবে বলে মনে করছেন সুশিল সমাজের নেতৃবৃন্দ। এ নিয়ে মতামত জানতে মহানগর পুলিশ প্রধান শৈবাল কান্তি চৌধুরীর মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।