অন্তঃসত্তা গৃহপরিচারিকা হত্যা ও কন্যা গুমের মামলায় দুইজনকে যাবজ্জীবনসহ চারজনকে দন্ড

নিজস্ব প্রতিবেদক ॥ পটুয়াখালীর গলাচিপা উপজেলার আলোচিত ঘটনা অন্তঃসত্তা গৃহপরিচারিকা অপহরণের পর ধর্ষণ করে হত্যা এবং তার কন্যা গুমের অভিযোগ প্রমানিত হওয়ায় দুই আসামিকে যাবজ্জীবনসহ ৪ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদ- দিয়েছেন আদালত। এছাড়াও যাবজ্জীবন দন্ডপ্রাপ্ত দুইজনকে ১৫ হাজার টাকা করে জরিমানা ও অনাদায়ের আরো ৬ মাস করে দন্ড দেয়া হয়েছে। অপর দন্ডপ্রাপ্ত দুই আসামীকে ৫ হাজার টাকা করে জরিমানা ও অনাদায়ে আরো ৬ মাসের দন্ড দেয়া হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার দ্রুতবিচার ট্রাইব্যুনালের বিচারক দিলীপ কুমার ভৌমিক এ রায় দেন।
দন্ড প্রাপ্তদের মধ্যে নগরীর গোরস্থান রোডের বাসিন্দা আব্দুল জব্বারের ছেলে রফিকুল ইসলাম বাদল ও তার ভাই গলাচিপার সাগরদী রোডের বাসিন্দা সুজনকে যাবজ্জীবন ছাড়াও অপর এক ধারায় আরো ৩ বছর করে কারাদন্ড ও ৫ হাজার টাকা জরিমানা অনাদায়ে আরো ৬ মাস করে দন্ডিত করা হয়েছে। অপর দুই আসামী গোলখালি এলাকার বাসিন্দা সামছু আলীর ছেলে ইছাহাক আলী ও হানিফ সরদারের ছেলে সেরাজ মিয়াতে ৩ বছরের দন্ড দেয়া হয়েছে।
অপরদিকে, মামলা দুই আসামী লায়লা বেগম ও হাকিম আলীর বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমানিত না হওয়ায় খালাস দেয়া হয়েছে।
উচ্চাদালতের নির্দেশনার কারনে গলাচিপার সাগরদী রোড এলাকার বাসিন্দা হাবিবুর রহমানের স্ত্রী লুপা বেগম, গোলখালী এলাকার কোব্বাত আলীর ছেলে আলী হোসেন, একই এলাকার মোস্তাফিজুর রহমান ও ভাই মোস্তাইনুর রহমানের বিচারকাজ স্থগিত রাখা হয়েছে। মামলা চলাকালীন সময় আসামি হাবিবুর রহমান মৃত্যুবরণ করায় তার নাম নথি থেকে বাদ দেয়া হয়েছে।
আদালত সূত্রে জানা গেছে, যাবজ্জীবন দন্ডিতরা হচ্ছেন, বাদল ও সুজন। অপর দুই আসামি ইসাহাক আলী ও সিরাজকে ৩ বছরের দন্ড দিয়েছে ট্রাইব্যুনাল। একই মামলায় অভিযোগ প্রমানিত না হওয়ায় লায়লা বেগম ও হাকিম আলীকে বেকসুর খালাস দেয়া হয়েছে। এছাড়া মামলার অপর আসামি নাজনীন আক্তার লুপা তালুকদার, মোস্তাফিজুর রহমান লিটন, লিখন ও আলী হোসেনের মামলার কার্যক্রম উচ্চ আদালতের নির্দেশে স্থগিত রয়েছে। আর মামলার আসামী হাবিবুর রহমান তালুকদার মামলার বিচারকাজ চলাকালীন সময়ে ইন্তেকাল করায় নথি থেকে বাদ গেছে।
ট্রাইব্যুনালের বিশেষ পিপি এ্যাড. একেএম জাহাঙ্গীর হোসেন মামলার নথির বরাত দিয়ে জানান, পটুয়াখালী গলাচিপার বন্দরের হাবিবুর রহমানের বাড়িতে গৃহপরিচারিকা হিসেবে কর্মরত ছিলেন একই উপজেলার সাগরদী রোড এলাকার বাসিন্দা জালাল আহমেদের কন্যা শাহিনুর আক্তার। গৃহকর্তা হাবিবুর রহমানের পুত্র লিটন তালুকদারের সহযোগীতায় প্রতিবেশী সিরাজ উদ্দিন গৃহপরিচারিকা শাহিনুরকে একাধিকবার ধর্ষণ করে মোবাইলে ছবি তুলে রাখে। এতে শাহিনুর গর্ভবর্তী হলে সিরাজের বিরুদ্ধে শাহিনুরের মা নিলুফা বেগম বাদি হয়ে মামলা দায়ের করেন। সিরাজ মামলা থেকে রেহাই পেতে শাহিনুরকে বিয়ে করে। ওই ঘরে তার একটি কন্যা সন্তান জন্মগ্রহণ করে। পরবর্তীতে সুযোগ বুঝে শাহিনুরকে তালাক দেয় সিরাজ। এরপর পারিবারিকভাবে শাহিনুরের সাথে আরেক ব্যক্তির বিয়ে হয়। এরপর মোবাইলে ধারণ করা ছবি ছড়িয়ে দেয়ার ভয় দেখিয়ে লিটন তালুকদার ও হাকিম আলী শাহিনুরকে ধর্ষণ করত। বিষয়টি জানাজানি হলে ২০০৩ সালের ২৪ মে ৭ মাসের অন্তঃস্বত্তা শাহিনুর ও তার শিশু সন্তান সেলিনাকে ট্রলারযোগে নিয়ে যায় আসামিরা। এরপর তিন দিন নিখোঁজ থাকার পর পটুয়াখালীর রমনাবাদ নদী থেকে অন্তঃস্বত্তা শাহিনুরের লাশ পুলিশ উদ্ধার করলেও শিশু সেলিনার সন্ধ্যান এখনও মেলেনি।
এ ঘটনায় ২০০৩ সালের ১ জুন শাহিনুরের মা নিলুফা বেগম বাদি হয়ে ৯ জনকে আসামি করে মামলা দায়ের করেন। একই বছরের ১৪ জুলাই মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই মো. হেমায়েত ১১ আসামিকে অভিযুক্ত করে আদালতে চার্জশীট দেয়। মামলায় ২০ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ শেষে বিচারক রায় ঘোষণা করেন।