অতিমাত্রায় কোচিং নির্ভরতার কারণেই বরিশালে ফলাফল বিপর্যয়

বিশেষ প্রতিবেদক ॥ সদ্য প্রকাশিত মাধ্যমিক পরীক্ষার ফলাফলে দক্ষিণাঞ্চলে শিক্ষা ব্যবস্থার কিছু বাস্তব চিত্র ফুটে উঠেছে। পাসের হার এবং জিপিএ-৫ প্রাপ্তিতে সারা দেশের মধ্যে সর্বনি¤েœ নেমে এসেছে বরিশাল শিক্ষা বোর্ডের আওতাধীন ৬টি জেলা। আবার এ ৬টি জেলার মধ্যে বরিশাল জেলার অবস্থান পঞ্চমে। অথচ অতি নিকট অতীতেই শিক্ষা ক্ষেত্রে বরিশালের অবস্থান ছিল সারা দেশের মধ্যে শীর্ষ পর্যায়ে। এ বিভাগীয় সদরে কোচিং বাণিজ্য অন্য যেকোন জেলার চেয়েও অনেক বেশি।
নির্বাচন প্রতিরোধে আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্যে ২০১৪ ও ২০১৫ সালে মাধ্যমিক পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হওয়ায় অনেকেই রাজনৈতিক অস্থিরতাকে মাধ্যমিকের ফলাফল খারাপ হবার জন্য দায়ী করেছিলেন। চলতি বছর সম্পূর্ণ নির্বিঘœ পরিবেশে এসএসসি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হলেও বরিশাল শিক্ষা বোর্ডের ফলাফল গত তিন বছরের মধ্যে খারাপ হয়েছে। ওয়াকিবহাল মহলের মতে, এর উত্তর অনেকের জানা থাকলেও তা নিয়ে এখনো মুখ খুলছেন না কেউ।
দক্ষিণাঞ্চলের শিক্ষা ব্যবস্থা কতটুকু এগোচ্ছে তা নিয়েও মূল্যায়নের সময় এসেছে বলে মনে করছেন ওয়াকিবহাল মহল। গত তিন বছরে বরিশাল শিক্ষা বোর্ডে পাসের হার কমেছে ১১%-এর বেশি। আর জিপিএÑ৫ প্রাপ্তির হারও হ্রাস পেয়েছে প্রায় ৩৫%। অথচ এ তিন বছরে দক্ষিণাঞ্চলে কোচিং বাণিজ্যের সম্প্রসারণ ঘটেছে প্রায় দ্বিগুন। সকাল ও সন্ধ্যায় এখন আর ছাত্রÑছাত্রীরা ঘরে পড়তে বসে না। স্কুলের ক্লাসের পরে কোচিং সেন্টারে ছুটছে ছাত্রÑছাত্রীরা। সেখান থেকে বের হয়ে ছাত্ররা রাস্তায়-পার্কে আড্ডা দেয়। ছাত্রীরা ঘরে ফিরে টিভি দেখে।
বরিশাল মহানগরীর রাস্তাঘাটে অনেক রাত পর্যন্তই এখন স্কুল-কলেজের ছাত্রÑছাত্রীরা আড্ডা দিয়ে বেড়াচ্ছে। নগরীর বঙ্গবন্ধু উদ্যান (বেল’স পার্ক), বিবির পুকুর পাড়, মুক্তিযোদ্ধা পার্ক, স্বাধীনতা পার্ক, হাতেম আলী কলেজ লেকের পাড় ও বদ্ধভূমি এলাকা সন্ধ্যার আগে থেকেই উঠতি বয়সি ছেলেÑমেয়েদের পদচারণায় মুখরিত হয়ে ওঠে। বেশিরভাগ মেয়েরা সন্ধ্যার আগে ঘরে ফিরলেও ছেলেদের আড্ডা চলে অনেক রাত পর্যন্তই যাদের প্রায় সকলেই কোন না কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্র। রাস্তা ও পার্কে আড্ডা দেয়া এসব ছাত্রদের নূন্যতম কোন নৈতিকতার দায় ও বোধ নেই বলেও অভিযোগ রয়েছে। এদের অনেকেই আবার নানা নেশায় আসক্ত।
নানা নৈতিকস্খলনের পাশাপাশি শিক্ষা ব্যবস্থা বাণিজ্যিকি করনের কারণে দক্ষিণাঞ্চলে শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে একসময়ের গর্ব ম্লান হতে শুরু করেছে বলে মনে করছেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধীক শিক্ষাবীদ। ২০১৪ সালে বরিশাল শিক্ষা বোর্ডে মাধ্যমিকে পাসের হার ছিল যেখানে ৯০.৬৬%, সেখানে গতবছর তা ৮৪.৩৭%এ হ্রাস পায়। আর চলতি বছরে এ শিক্ষা বোর্ডে পাসের হার ৭৯.৪১-এ নেমে এসেছে। অনুরূপভাবে জিপিএÑ৫ প্রাপ্তির হারও গত তিন বছরের সর্বনি¤েœ এবারের এসএসসির ফলাফলে। ২০১৪ ও ২০১৫-এর রাজনৈতিক অস্থিরতায় যেখানে বরিশাল শিক্ষা বোর্ডে জিপিএ-৫ প্রাপ্তির সংখ্যা ছিল যথাক্রমে ৪,৭৬২ ও ৩,১৭২, সেখানে চলতি বছর তা ৩,১১৩’তে নেমে এসেছে। তবে গত তিনটি বছরের ফলাফল বিশ্লেষনেই ছেলেদের তুলনায় মেয়েদের ফলাফল ভাল বলে দেখা গেছে।
এর কারণ হিসেবে অনেক শিক্ষাবীদ ছেলেদের তুলনায় মেয়েদের পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ বেশী বলে মন্তব্য করেছেন। পাশাপাশি ছেলেদের তুলনায় মেয়েরা ঘরে পড়ার টেবিলে বেশী সময় দিচ্ছে বলেও মনে করছেন একাধীক শিক্ষাবীদগন। তাদের মতে, স্কুলের শ্রেণি কক্ষে শিক্ষকগণ ছাত্রদের যেখানে এক মিনিট সময়ও দিচ্ছেন না, সেখানে বর্তমান কোচিং বাণিজ্যের যুগে কোচিং সেন্টার নামের ঐসব প্রতিষ্ঠানে লেখাপড়া গুলে খাওয়ানো হলেও বেশিরভাগ ছাত্র-ছাত্রীর লেখা পড়ার মান বাড়ছে না। উপরন্তু সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত স্কুলের শ্রেণি কক্ষে থাকার পরে দুপুর গড়ানোর আগেই কোচিং সেন্টারে ছুটতে হচ্ছে ছাত্রÑছাত্রীদের। সেখানে সন্ধ্যা পর্যন্ত কোচিং করার পরে বাড়ী ফিরে আর বই নিয়ে বসতে চাচ্ছে না বেশিরভাগ ছেলে মেয়ে। তবে বেশিরভাগ স্কুল-কলেজগামী ছাত্রই এখন সন্ধ্যার আগে ঘরে ফিরছে না।
এবারের এসএসসি’র ফলাফল বিশ্লেষনে একাধীক শিক্ষাবীদদের বক্তব্য, বর্তমান কোচিং নির্ভর পড়াশোনা ফলাফল বিপর্যয়ের জন্য অনেকাংশে দায়ী। উপরন্তু ছেলেমেয়েরা আগের মত ঘরে পড়তে না বসা সহ মোবাইল ফোন ও ইন্টারনেট নিয়ে অপ্রয়োজনীয় এবং অতিরিক্ত সময় ব্যয় করার কারণেও এবারের ফলাফল বিপর্যয়ের জন্য অনেকাংশে দায়ী বলে মনে করছেন শিক্ষা ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট একাধীক ব্যক্তি।