¯্রােত ও টেউয়ে উজানমুখী নৌযানের ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রা

নিজস্ব প্রতিবেদক ॥ শরতের শুরুতেই একদিকে কয়েকটি নদ-নদীতে নাব্যতা সংকটে দেশের প্রধান দুটি ফেরি সেক্টরে যানবহান পারপারে বিপর্যয় সৃষ্টির পাশাপাশি ভাটি মেঘনায় প্রবল ¯্রােত আর ঢেউ এর কারনে উজানমুখি নৌযান চলাচলে ঝুঁকি বাড়ছে। অপরদিকে চলতি বছর গত মাসেই বরিশাল অঞ্চলে স্বাভাবিকের চেয়ে প্রায় ৮১% বেশী বেশী বৃষ্টি হলেও চলতি মাসের প্রথম কুড়ি দিনের হিসেবে সে পরিমান যথেষ্ট কম। তবে আবহাওয়া বিভাগ চলতি মাসের দীর্ঘ মেয়াদী বুলেটিনে স্বাভাবিকের চেয়ে কিছুটা বেশী বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনার কথা জানিয়ে বঙ্গোপসাগরে ১-২ টি মৌসুমী নি¤œচাপ সতর্কতাও প্রকাশ করেছিল। এখনো সে ধরনের পরিস্থিতি সৃষ্টি না হলেও পটুয়খালীর কলাপাড়া সহ উপকূলের কয়েকটি এলাকায় গত কয়েকদিন ধরে প্রবল বৃষ্টি হয়েছে। যা আবার বরিশাল সহ সন্নিহিত এলাকায় যথেষ্ট কম ছিল।
এদিকে গত দিন দশক যাবতই পদ্মায় নাব্যতা সংকটে রাজধানী সহ দেশের পূর্বাংশের সাথে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১টি জেলার সংক্ষিপ্ত সড়ক পথের মাওয়াÑকাওড়াকান্দী ফেরি সেক্টরে যানবাহন পারাপারে যথেষ্ট বিঘœ ঘটছে। এমনকি গত সপ্তাহখানেক ধরে এ ফেরি সেক্টরে রাতের বেলা বড় মাপের রো-রো ফেরিগুলো পদ্মা পাড়ী দিতে গিয়ে ডুবো চড়ায় আটকা পরছে। ফলে প্রায় রাতেই এ সেক্টরে বড় ফেরিগুলো বন্ধ রাখতে হচ্ছে। মাওয়ার শিমুলিয়া ও কাওড়াকান্দী ঘাটে আটকে পড়া যানবাহনের সংখ্যাও ক্রমশ বাড়ছে। বৃহস্পতিবার মধ্যরাত থেকে গতকাল সকাল প্রায় ১০টা পর্যন্ত মাওয়া সেক্টরে বড় মাপের রো-রো ফেরি চলাচল বন্ধ রাখতে হয় পদ্মায় নাব্যতা সংকটে। ফলে গতকাল সকাল ৯টায় শিমুলিয়া ও কাওড়াকান্দী ঘাটে প্রায় ৫’শ যানবাহন আটকা পড়ে। বিআইডব্লিউটিসি’র ফেরি সেক্টরের কর্মীরা অবশ্য দিনের বেলায় যানবাহন পারপার স্বাভাবিক রাখতে আপ্রান চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। তবে মাওয়া সেক্টরে গতকাল ৩টি ফেরি সাময়িক বিকল ছিল। এসব ফেরি দ্রুত চলাচলক্ষম করতে প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা গ্রহন করা হয়েছে বলে সংস্থাটির দায়িত্বশীল সূত্রে বলা হয়েছে।
দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম এ ফেরি সেক্টরে নাব্যতা সংকট দূর করতে ইতোমধ্যেই বিআইডব্লিউটিএ ৫টি ড্রেজার কাজে লাগিয়েছে। আসন্ন ঈদ উল আজহার আগে পড়ে যাবাহনের বাড়তি চাপের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে নৌ পরিবহন মনত্রনালয় ও বিআইডব্লিউটিএ যত দ্রুত সম্ভব মাওয়া সেক্টরে সব ধরনের ফেরি চলাচল নির্বিঘœ করতে বদ্ধপরিকর বলে সংশ্লিষ্ট মহল জানিয়েছন।
অপরদিকে পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া সেক্টরে পদ্মার অবস্থা ততটা ঝুঁকিপূর্ণ না হলেও সেখানেও নাব্যতা ক্রমশ হ্রাস পাচ্ছে। সে বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহন করা হয়েছে বলে বিআইডব্লিউটিএ’র দায়িত্বশীল মহল জানিয়েছেন। তবে গতকাল পাটুরিয়াÑদৌলতদিয়া রুটের ২টি রো-রো এবং ১টি ইউটিলিটি ফেরি বিকল ছিল। এতেকরে যানবাহন পারাপারে কিছুটা সংকট সৃষ্টি হচ্ছে। মাওয়া সেক্টরে রাতের বেলা যানবাহন পারাপারে সংকটের কারনে পাটুরিয়া সেক্টরে কিছুটা বাড়তি চাপ পড়লেও সচল ফেরির অভাবে পরিস্থিতি কিছুটা নাজুক। গতকাল সকাল ৬টায় পাটুরিয়া ও দৌলতিদিয়া ঘাটেও প্রায় ৫শ যানবাহন পারাপারের অপেক্ষায় ছিল। তবে বিকেল নাগাদ দুটি প্রধান ফেরি সেক্টরেই আটকে পড়া যানবাহনের সংখ্যা কিছুটা হ্রাস পায়।
এদিকে পদ্মায় নাব্যতা সংকটের মধ্যেই চাঁদপুরের ভাটিতে মেঘনার সাগরমুখি প্রবল স্রোত অতিক্রম করে নৌযানগুলো ঢাকা সহ উজানে পৌছেতে যথেষ্ট প্রতিকুলতায় পড়ছে। চাঁদপুর থেকে বরিশালের কালীগঞ্জ পর্যন্ত মেঘনায় এখন ঘন্টায় প্রায় ৫ নটিক্যাল মাইল বেগে ভাটিমুখি স্রোত বইছে। যা ভোলার ইলিশার ভাটিতে আরো ১ নট বেশী। ফলে প্রতিদিনই বরিশাল সহ দক্ষিনাঞ্চল থেকে ঢাকামুখি যাত্রীবাহী নৌযানগুলো মেঘনা পাড়ি দিতে চরম বিড়ম্বনায় পড়ছে। পাশাপাশি উজান থেকে ভাটমুখি নৌযানগুলোও প্রবল স্রোতের অনুকূলে চললেও প্রতিকুল বাতাস অতিক্রম করে অনেক সময়ই টলামটাল অবস্থায় পড়ছে। হাজার-হাজার যাত্রী নিয়ে নৌযানগুলোর কাপ্তেনদের যথেষ্ট ঝুকি নিওয়ই মেঘনা পাড়ি দিতে হচ্ছে প্রতি রাতে।
তবে বিঅইডব্লিউটিএ’র দায়িত্বশীল মহলের মতে মেঘনায় ‘স্পেরিকেল বয়া’ সহ সব ধরনের লাইটেড বয়া রয়েছে। কর্তৃপক্ষের নির্দেশিত পথে নৌযানগুলো পরিচালনা করলে স্বাভাবিক অবস্থায় কোন সংকটের কারন নেই। কর্তৃপক্ষ রাতের বেলা সব ধরনের পণ্যবাহী নৌযান চলাচল বন্ধ রাখা সহ যাত্রীবাহী নৌযানগুলোকে নির্দেশিত পথ অনুসরনেরও তাগিদ দিয়েছেন। পাশাপাশি যেকোন নৌ বিপদ সংকেত অনুযায়ী নৌযানের চলাচল সীমিত রাখারও পরামর্শ দেয়া হয়েছে।
অপরদিকে গত কুড়ি দিনের হিসেবে অনুযায়ী চলতি মাসে বরিশাল অঞ্চলে গড় বৃষ্টিপাতের পরিমান স্বাভাবিকের চেয়ে কিছুটা কম থাকায় দক্ষিনাঞ্চলের প্রধান খাদ্য ফসল আমনের রোপন ও রোপা আমনের বাড়ন্ত পরিস্থিতি কিছুটা ব্যাহত হবারও আশংকা রয়েছে বলে জানা গেছে।
আবহাওয়া বিভাগের মতে, গতমাসে সারাদেশে স্বাভাবিক অপেক্ষা ৬৫ ভাগবেশী বৃষ্টিপাত হলেও বরিশাল বিভাগে স্বাভাবিক ৫১৯ মিলিমিটারের স্থলে ৮৬১ বৃষ্টিপাতের রেকর্ড করা হয়। যা ছিল স্বাভাবিকের চেয়ে প্রায় ৮১% বেশী।
গত মাসে উত্তর বঙ্গোপসাগর সৃষ্ট দুটি লঘুচাপের মধ্যে ২৫ জুলাই উত্তর বঙ্গোপসাগর ও তৎসংলগ্ন উপকূলীয় এলাকায় মৌসুমী লঘুচাপটি ২৬ জুলাই দুপুরে ঘণীভূত হয়ে একই এলাকায় মৌসুমী নি¤œবচাপে পরিণত হয়। এটি আরও উত্তর দিকে সরে গিয়ে ২৯ জুলাই দুপুর নাগাদ গভীর নি¤œচাপে পরিণত হয়। নি¤œচাপটি ঐদিন রাত ৯টায় আরও ঘণীভূত হয়ে ঘূর্ণিঝড় ‘‘কোমেন”-এ রুপ নেয়। কোমেন ৩১ জুলাই ভোর রাতে সন্দ্বীপের কাছ দিয়ে চট্টগ্রাম উপকূল অতিক্রম করে এবং দূর্বল হয়ে নোয়াখালী ও তৎসংলগ্ন এলাকায় স্থল নি¤œচাপ হিসাবে অবস্থান করে। পরে এটি চাঁদপুরÑফরিদপুরÑখুলনা অঞ্চল হয়ে ভারেতর পশ্চিমবঙ্গ ও বিহারে গিয়ে দূর্বল হয়ে মিলিয়ে যায়।
ঘূর্ণিঝড় ও স্থল নি¤œচাপের প্রভাবে বরিশাল সহ সমগ্র দক্ষিনাঞ্চল এবং উপকূলীয় এলাকা ছাড়াও দেশের অনেক স্থানেই অস্থায়ী দমকা ও ঝড়ো হাওয়াসহ ভারী বর্ষণে ফসলের মাঠ সয়লাব হয়ে যায়। অনেক জমির ফসল লন্ডভন্ডও হয়ে গেছে। গ্রীষ্মকালীন সবজির প্রায় পুরোটাই বিনষ্ট হয়েছে। এসময় উপকূলীয় এলাকার কোথাও কোথাও ৩-৫ ফুট উচ্চতার বায়ু তাড়িত জলোচ্ছ্বাসে প্লাবিত হয়। অতি বর্ষনের সাথে ফুসে ওঠা সাগরের জোয়ারের পানিতে দক্ষিনাঞ্চলের অনেক ফসলী জমি প্রায় এক সপ্তাহ পানির তলায় ছিল। ফলে দ্বিতীয় দফায় আমন বীজতলা ও রোপা আমনের ক্ষতি হয়।
কিন্তু চলতি মাসে স্বাভাবিকের চেয়ে কম বৃষ্টিপাত নতুন সংকট সৃষ্টি করতে পারে বলে শংকা প্রকাশ করেছেন মাঠ পর্যায়ের কৃষিবীদগণ।