ড্যান্ডি নেশায় ঝুঁকছে পথশিশুরা প্রতিরোধে নেই কোন উদ্যোগ | | ajkerparibartan.com ড্যান্ডি নেশায় ঝুঁকছে পথশিশুরা প্রতিরোধে নেই কোন উদ্যোগ – ajkerparibartan.com
ড্যান্ডি নেশায় ঝুঁকছে পথশিশুরা প্রতিরোধে নেই কোন উদ্যোগ

2:59 pm , October 19, 2019

খান রুবেল ॥ কাঁধে ওপর বস্তা ফেলে হাটছে একদল শিশু। এক হাতে কাঁধের উপর বস্তা ধরা, আরেক হাতে পলিথিন। দু-চার কদম হাটছে আর কিছুক্ষণ পর পর পলিথিনে মুখ ঢুকিয়ে শুঁকে নিচ্ছে। তবে তা খেলার ছলে নয়, বরং পলিথিনে থাকা ‘ড্যান্ডি গাম’ শুঁকে নেশা করছেন তারা।
নগরীর প্রায় প্রতিটি অলিগলি, লঞ্চ এবং বাসস্ট্যান্ডে পথশিশু-কিশোরদের ভয়াবহ মরণঘাতি ‘ড্যান্ডি’ নেশা গ্রহনের এমন চিত্র এখন টপ সিক্রেট। শুধু পথশিশুরাই নয়, ড্যান্ডি নেশায় আসক্ত হচ্ছে সাধারণ পরিবার ও শ্রমজীবী শিশু-কিশোররা।
এর প্রধান কারণ ‘ডেন্ডি’ গামের সহজলভ্যতা। ড্যান্ডি গাম বিক্রিতে তেমন কোন নীতিমালা না থাকায় হাতের নাগালেই মিলছে এ নেশা দ্রব্য। এমনকি ড্যান্ডি নেশা থেকে পথশিশু-কিশোরদের রক্ষায় দেখা যাচ্ছে না প্রশাসনেরও জোড়ালো কোন ভুমিকাও।
ফলে ড্যান্ডি নেশায় আসক্ত শিশু-কিশোরের সংখ্যাও ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। এরাই এক সময় ঝুকছে গাঁজা, মদ, ফেন্সিডিল ও ইয়াবার দিকে। আর নেশার টাকার যোগান দিতে তারা জড়িয়ে পড়ছে চুরি, ছিনতাই, ডাকাতির মত নানা অপরাধে। জানাগেছে, ‘ড্যান্ডি এক ধরনের গাম। যা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ব্যবহার হয়ে থাকে গ্যারেজ বা ওয়ার্কশপে। তবে এটি জুতা তৈরীর প্রধান উপকরণ। এগুলো পাওয়ার সহজ উপায় নগরীর বিভিন্ন যানবাহনের পার্স এবং হার্ডওয়ারের দোকানে। কিন্তু ‘ড্যান্ডি’ নামক এই গামই ব্যবহার হচ্ছে নেশার কাজে। সল্প খরচে পাওয়া ‘ড্যান্ডি গাম’ পলিথিনে ঢেলে একটু ঝাঁকুনি নিয়ে তার মধ্যে মুখ ঢুকিয়ে গন্ধ শুঁকে নেশা করা হচ্ছে। ‘ড্যান্ডি গামে তীব্র গন্ধ না থাকায় শিশু-কিশোররা যে কোন জায়গায় দাড়িয়েই গ্রহন করছে এই নেশা। ড্যান্ডি নেশা গ্রহন করা চার পথশিশুর সাথে দেখা হয় নগরীর নৌ বন্দরের পন্টুনে। পন্টুনের এক কোনে বসে এক সাথে তিনজন পলিথিনে মুখ লুকিয়ে গ্রহন করছে ‘ড্যান্ডি নেশা।’ কাছে যেতেই চার শিশু লুকিয়ে ফেলে পলিথিন। জিজ্ঞাসা করতেই স্বীকার করে ডেন্ডি নেশা গ্রহনের কথা। জানতে চাইলে পথশিশু সমির জানায়, ‘বাবা-মা এবং পরিবারের সদস্যরা কোথায় কিভাবে তা তার জানা নেই। কোন দিন ঢাকা সদর ঘাটেই হারিয়ে যায় সমির। এর পর থেকে কখনো ঢাকা সদর ঘাট আবার কখনো বরিশাল লঞ্চ ঘাটে কাটে তার রাত। ভোরে যখন লঞ্চ ঘাটে আসে তখনই ঝাপিয়ে পড়েন পানির বোতল সংগ্রহ করতে। পরবর্তীতে তাতে বিশুদ্ধ পানি ঢুকিয়ে বিকেলে লঞ্চে ঘুরে ঘুরে বিক্রি করেন। ওই পানি বিক্রির টাকায় চলে তার জীবন সংগ্রাম। সমির বলেন, ‘অন্যান্য পথশিশুদের সাথে মিশতে গিয়েই ড্যান্ডি নেশায় আসক্ত হয়েছি। এখন প্রতিদিন অন্তত চারটি গামের প্রয়োজন হয়। রাতে নেশা করে পন্টুনে ঘুমাই। মাঝে মধ্যে যাত্রীরা মন্দ বলে তাই পালিয়ে ড্যান্ডি নেশা করি। সমিরের সাথে থাকা অপর শিশু রায়হান। তিনি বলেন, ‘ড্যান্ডি গামের দাম বেশি একটা না। মাত্র ৩০ থেকে ৫০ টাকায় পাওয়া যায়। লঞ্চ ঘাট এবং ভাটারখাল এলাকার মোটরসাইকেলের পার্স এবং হার্ডওয়ারের দোকান থেকে এই গাম সংগ্রহ করছি। টাকা পেলেই দোকানীরা গাম বিক্রি করে।
এদিকে নগরীতে টোকাই এর কাজ করা চাঁদমারী বস্তির বাসিন্দা এক শিশু আরমান বলেন, ‘রাত হলে পথশিশু আশ্রয় কেন্দ্রে থাকি। দিনে বেরিয়ে পরি টাকার উপার্জনের জন্য। ময়লা-আর্জনার মধ্যে থেকে বিভিন্ন ভাঙারী মালামাল সংগ্রহ করে তা বিক্রি করে টাকা পাই। তা দিয়েই ‘ড্যান্ডি’ নেশা করছি। এ নেশা পেটের ক্ষুদা মেটায়। এ নেশা করলে বেশি ক্ষুদা লাগে না। তবে যেখানে রাত কাটাই সেখানকার কেউ বিষয়টি জানে না।
নগরীর বান্দ রোডস্থ ভাটারখালে মোটরযানের পার্টস ব্যবসায়ী শাহিন বলেন, ‘আমরা এই গাম বিক্রি করি গ্যারেজে। গ্যারেজ থেকে আসা ব্যক্তিরাই তাদের প্রয়োজনে কিনে নেয়। কিন্তু সেটা পথশিশুদের হাতে কিভাবে যায় তা বলা সম্ভব না। হতে পারে গ্যারেজের লোক পরিচয় দিয়ে শিশু-কিশোররা এটি সংগ্রহ করছে।
এদিকে ড্যান্ডি নেশার ভয়াবহতা সম্পর্কে বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ ( শেবাচিম) হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের মেডিকেল অফিসার ডা. মোস্তফা কামাল বলেন, ‘ড্যান্ডি’ অন্যান্য নেশার থেকেও খুব ভয়াবহ। এগুলো গ্রহনের ফলে মানব দেশের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ, ব্রেন, কিডনি, লিভার ধীরে ধীরে নষ্ট হয়ে যায়। শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়া এবং ক্ষুদা মন্দাসহ নানান রোগে আক্রান্ত হয়।
তিনি বলেন, ‘মুলত ছিন্নমুল শিশু এবং বিভিন্ন কল কারখানার শিশুরাই এই নেশার প্রতি বেশি আসক্ত। এজন্য তাদের কাউন্সিলিং করা উচিৎ। যেসব শিশুর বাবা-মা রয়েছে তারা তাদের সন্তান কি করে কোথায় যায়, কি খায় সে দিকে নজর রাখবে। ড্যান্ডি নেশা গ্রহন করা শিশু-কিশোরদের এ নেশার খারাপ দিক গুলো ভালোভাবে বোঝাতে হবে। পাশাপাশি এ নেশা নিয়ন্ত্রন করতে প্রথমত যারা শিশুদের কাছে ড্যান্ডি গাম বিক্রি করছে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহন করা উচিৎ।
বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার প্রলয় চিসিম বলেন, ‘ড্যান্ডি নেশা’ খুব খারাপ একটি নেশা। এটি প্রতিরোধে পুলিশ কাজ করছে। খুব শিঘ্রই বিষয়টি নিয়ে কার্যকরি পদক্ষেপ গ্রহন করা হবে।

এই বিভাগের আরও খবর

আর্কাইভ




মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন    
সম্পাদক ও প্রকাশক: কাজী মিরাজ মাহমুদ
 
বার্তা ও বানিজ্যিক কার্যালয়ঃ কুশলা হাউজ, ১৩৮ বীরশ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর সড়ক,
সদর রোড (শহীদ মিনারের বিপরীতে), বরিশাল-৮২০০।
© প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
Developed by NEXTZEN-IT