জণগনের মুখোমুখি ৬ মেয়র প্রার্থী ॥ পরিকল্পিত নগরী গড়ে তোলার প্রত্যয় | | ajkerparibartan.com জণগনের মুখোমুখি ৬ মেয়র প্রার্থী ॥ পরিকল্পিত নগরী গড়ে তোলার প্রত্যয় – ajkerparibartan.com
জণগনের মুখোমুখি ৬ মেয়র প্রার্থী ॥ পরিকল্পিত নগরী গড়ে তোলার প্রত্যয়

5:52 pm , July 13, 2018

নিজস্ব প্রতিবেদক ॥ আসন্ন ৩০ জুলাই বরিশাল সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনকে সামনে রেখে জনতার মুখোমুখি হয়েছেন ৬ মেয়র প্রার্থী। এসময় তারা সাধারণ জগণের প্রশ্নের উত্তর দেয়ার পাশাপাশি অনিয়ম, দুর্নীতি, সন্ত্রাস ও মাদক মুক্ত পরিকল্পিত নগরী গড়ে তোলার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। গতকাল শুক্রবার সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) আয়োজিত ‘অবাধ, নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ন নির্বাচনের লক্ষ্যে প্রতিদ্বন্দ্বী মেয়র প্রার্থীদের নিয়ে জনগনের মুখোমুখি অনুষ্ঠানে তারা ওই প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।

এদিকে ‘জনগনের মুখোমুখি অনুষ্ঠানে বিএনপি’ জাতীয় পার্টি, ইসলামী আন্দোলন, বাসদ, সিপিবি ও জাতীয় পার্টির বিদ্রোহী প্রার্থী উপস্থিত অংশগ্রহন করলেও জনগনের মুখোমুখি হননি আওয়ামী লীগ মনোনিত নৌকা প্রতীকের মেয়র প্রার্থী সেরনিয়াবাদ সাদিক আবদুল্লাহ।

এর পূর্বে সকাল পৌনে ১১টায় নগরীর সদর রোড অশ্বিনী কুমার হলে জাতীয় সংগীত পরিবেশের মধ্যে দিয়ে শুরু হয় সুজন’র জনতার মুখোমুখি অনুষ্ঠান। পরবর্তীতে স্বাগত বক্তব্য রাখেন সুজন বরিশাল জেলার সাধারণ সম্পাদক রনজিৎ দত্ত এবং সংগঠনটির কার্যক্রম সম্পর্কে বক্তব্য তুলে ধরেন সুজন’র কেন্দ্রীয় নির্বাহী সদস্য মুক্তিযোদ্ধা আক্কাস হোসেন।

এর পর সুজন কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদারের পরিচালনায় অনুষ্ঠানের প্রথম অংশে অংশগ্রহনকারী ৬ মেয়র প্রার্থী সুজন’র নির্বাচনী অঙ্গিকারনামায় স্বাাক্ষর এবং শপথ করেন। এর পর অনুষ্ঠানে অংশগ্রহনকারী সাধারণ নাগরিকরা বক্তব্যের মাধ্যমে মেয়র প্রার্থীদের কাছে মাদক ও সন্ত্রাস মুক্ত নারী ও শিশু বান্ধব একটি পরিকল্পিত নগরী গড়ে তোলার দাবী জানান।

এদিকে অনুষ্ঠানের তৃতীয় অংশে অংশগ্রহনকারী ছয় মেয়র প্রার্থী নির্বাচন পরবর্তী মেয়র হয়ে তাদের উন্নয়ন ও কর্মপরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন। নির্ধারিত ৫ মিনিটের বক্তৃতায় সিটি নির্বাচনে বিএনপি মনোনিত ধানের শীষের প্রার্থী আলহাজ্ব এ্যাড. মজিবর রহমান সরওয়ার বলেন, নির্বাচন হচ্ছে জণগনের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগের একটি অংশ। অথচ আমরা নির্বাচন করছি কিন্তু জণগনের উপর ভরসা রাখতে রাখতে পারছি না। তারা ভোট দিবেন কিনা সে নিয়ে মানুষকে সন্দেহ করছি। এর কারন দেশের মানুষ আজ তার গণতান্ত্রিক অধিকার পাচ্ছে না। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় নির্বাচন না হলে কোন উন্নয়নই জণকল্যানমুখী হবে না।

মজিবর রহমান সরওয়ার বলেন, সিটি নির্বাচন এখন একটি রাজনৈতিক পদ। তবে আমি মনে করি রাজনৈতিক প্রতীকে নির্বাচন হলেও নির্বাচিত হওয়ার পরে আমি একজন শতভাগ জণগনের প্রতিনিধি। জণগনের ভালো-মন্দ এবং নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত এবং তাদের ভাগ্যের উন্নয়নই হওয়া উচিৎ জনপ্রতিনিধিদের একমাত্র কাজ।

তিনি বলেন, বরিশাল সিটি কর্পোরেশনের প্রথম নির্বাচিত মেয়র ছিলাম আমি। যেটুকু সময় দায়িত্ব পালন করার সুযোগ পেয়েছি ততটুকু সময় জণগনের উন্নয়ন ও পরিকল্পিত নগরী গড়ে তোলার জন্য কাজ করেছি। সিটি কর্পোরেশনকে অর্থনৈতিক ভাবে স্ব-নির্ভর করে তুলতে বিভিন্ন দপ্তরের কাছ থেকে জমি নিয়ে ১১টি মার্কেট নির্মান করে দিয়েছি। এ দিয়ে যে আয় হত তা দিয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা দিয়েছি। আমার আমলে কাউকে এক টুকরো জমিও লিজ দেইনি। নিজ উদ্যোগে নগরীর খাল এবং পুকুর দখলমুক্ত করেছি। কিন্তু আজ অপরিকল্পিত উন্নয়নের জন্য খাল ড্রেনে পরিনত হয়েছে। যার ফলে সৃষ্টি হচ্ছে জলাবদ্ধতা। আমি মেয়র থাকাবস্থায় ৩টি মন্দির দখল মুক্ত করেছি, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজ এবং দখলবাজদের কাছ থেকে বাড়ি মালিক এবং ব্যবসা প্রতিষ্ঠান রক্ষা করেছি। বরিশালে শহর রক্ষা বাঁদের কাজ আমিই শুরু করেছিলাম। একমাত্র আমিই বরিশাল নগরীকে সন্ত্রাস মুক্ত ঘোষনা করেছিলাম।

সরওয়ার বলেন, বরিশালের কাঁদা-মাটির সাথে মিশে আছে আমার জীবন। তাই জণগনের প্রানের দাবী কি তা আমিই ভালো জানবো। আমি নির্বাচিত হলে মাদক, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজী এবং ইভটিজিং মুক্ত নারী ও শিশু বান্ধব পরিকল্পিত নগরী হিসেবে গড়ে তুলব। পাশাপাশি যারা জণগনের ভোট বিলিন করে নির্বাচিত হতে চান তাদের বর্জন করার আহ্বান জানান বিএনপি’র প্রার্থী মজিবর রহমান সরওয়ার।

জাতীয় পার্টি মনোনিত মেয়র প্রার্থী ইকবাল হোসেন তাপস বলেন, আমি অঙ্গিকার করেছি জণগনকে দেয়া আশ্বাস বাস্তবায়ন করব। তবে তার আগে জণগনের কাছে আমি একটি অঙ্গিকার চাই। তা হলো একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ ভোটের অঙ্গিকার। জণগন আমাকে সেই ব্যবস্থা করে দিবেন।

তিনি বলেন, একজন নাগরিক হিসেবে আমি দেখেছি আমার নাগরিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছি। সেই অধিকারের স্থান থেকেই আমি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছি। উন্নয়ন বঞ্চিত নগরীর উদাহরন তুলে ধরে জাতীয় পার্টির মেয়র প্রার্থী তাপস বলেন, আজ জরাজির্ন অশ্বিনী কুমার হলে সুজন অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে। ঐতিহ্যবাহী এই অশ্বিনী কুমার হলটিও উন্নয়ন বঞ্চিত। আমি অধিকার, আশা-আকাংখা থেকেই নির্বাচনে এসেছি। মন ও মানষিকতা থাকলেই পরিকল্পিত উন্নয়ন সম্ভব।

তিনি অঙ্গিকার বলে বলেন, আমি নগর পিতা হতে আসিনি। আমি নগরবাসির সেবক হিসেবে কাজ করতে চাই। নির্বাচিত হলে আমার প্রথম কাজ হবে বরিশাল নগর ভবনের নাম পরিবর্তন করে সেবক ভবন ও নগর পিতার নাম পরিবর্তন করে নগর সেবক করা। এর মাধ্যমেই আমি আমার যাত্রা শুরু করব। আমার বিশ্বাস সুুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ ভোট হলে জনগন আমাকে নগর সেবক হিসেবে বিজয়ী করবেন।

ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ’র মেয়র প্রার্থী মাওলানা ওবায়দুর রহমান মাহবুব বলেন, ভোটের আগে প্রার্থীরা অনেক আশ্বাসই দিয়ে থাকে। সবাই বলছে চাঁদাবাজী, অনিয়ম এবং দুর্নীতি মুক্ত সিটি কর্পোরেশন গড়ে তুলবেন। কিন্তু যতক্ষন পর্যন্ত আমল ঠিক না হবে, আল্লাহ এবং আখেরাতের ভয় সৃষ্টি না হবে ততক্ষনে অনিয়ম-দুর্নীতি বন্ধ হবে না।

তিনি বলেন, আমি নির্বাচিত হলে সিটি কর্পোরেশনকে পার্সেন্টেজ বানিজ্য থেকে মুক্ত করব। সিটি কর্পোরেশনের আয় থেকে সবার আগে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ন্যায্য অধিকার বেতন-ভাতা পরিশোধের ব্যবস্থা করব। জনগনকে সাথে নিয়ে একটি পরিকল্পিত নগরী গড়ে তোলার অঙ্গিকার করে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের এই প্রার্থী বলেন, সবাই বলেন আমার ভোট আমি দেব যাকে খুশি তাকে দিব। আর আমি বলি ‘আমার ভোট আমি দেব সৎ ভোট বেছে দিবো।

বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ) মনোনিত ‘মই’ প্রতীকের প্রার্থী ডা. মনীষা চক্রবর্তী বলেন, নির্বাচনে সময় জনগণকে যুক্ত করে যে আশ্বাস দেয়া হয়, নির্বাচনের পরে সেই আশ্বাস বাস্তবায়নে জণগনকে যুক্ত করা হচ্ছে না। তাদের বাদ দিয়েই অপরিকল্পিত উন্নয়ন করা হয়। বাসদ নির্বাচিত হলে আমরা ভোটের পরে আমরা জণগনের মতামত নিয়েই উন্নয়ন করব।

তিনি বলেন, নগর উন্নয়ন এবং জণগন নিয়ে আমাদের পরিকল্পনা রয়েছে। নগরীতে বেকারত্বের সমস্যা রয়েছে। সম্ভাবনাময় নগরীতে লোকাল ইন্ডাস্ট্রি এবং উদ্ভাবনশীল শিল্প গড়ে তোলার মাধ্যমে বেকারত্ব দুর করার প্রতিশ্রতি দিয়ে ডা. মণীষা চক্রবর্তী বলেন, অপরিকল্পিত উন্নয়নের কারনে আজ নগরীতে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হচ্ছে। খাল ভরাট করে ড্রেন নির্মান করা হয়েছে। খালের উপরে বক্স কালভার্ট নির্মান করা হয়েছে। যার ফলে পানির অবাধ প্রবাহ বন্ধ হয়ে গেছে। বৃষ্টির পানি নামতে না পেরে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হচ্ছে। আমরা নির্বাচিত হলে এসব সমস্যা সমাধান করে নগরীর খালগুলোর অবাধ প্রবাহ ফিরিয়ে আনব।

এর পাশাপাশি নারীদের জন্য পাবলিক টয়লেট, শ্রমজীবী নারীদের হোস্টেল নির্মান সহ নারী ও শিশু বান্ধব একটি পরিকল্পিত নগরী গড়ে তোলার প্রত্যয় ব্যক্ত করে ডা. মনীষা চক্রবর্তী বলেন, আমরাই শ্রমজীবী ও অসহায় মানুষের কথা বলেছি। আন্দোলন করেছি তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য। তাই পূর্বের ইতিহাস এবং কার্যক্রম বিবেচনা করে সৎ ও যোগ্য প্রার্থীকে নির্বাচিত করার আহ্বান জানান তিনি।

এছাড়া কমিউনিস্ট পার্টি মনোনীত ‘কাস্তে’ প্রতীকের মেয়র প্রার্থী এ্যাড. আবুল কালাম আজাদ বলেন, বরিশাল সিটি কর্পোরেশনকে একটি দৃষ্টিনন্দন নগরী হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে আমাদের। বর্তমান নগরীতে নির্বিঘেœ চলাচল করার জন্য একটি রাস্তা পাওয়া যাবে না। প্রতিটি রাস্তায় চলাচলের ক্ষেত্রে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। বেকারত্ব দুরীকরনে নেই শিল্প প্রতিষ্ঠান। আমাদের দল নির্বাচিত হলে শিল্প ভিত্তিক নগরী গড়ে তুলে বেকারত্ব দুর করব। বস্তিবাসীদের পুনর্বাসনের চেষ্টা করব। ভোটারদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, মাদক ও সন্ত্রাস প্রতিরোধ এবং নারী ও শিশু বান্ধব নগরী গড়তে ‘কাস্তে’ প্রতীকে ভোট দিন। আমরা আপনাদের একটি সুন্দর নগরী উপহার দিব।

আদালতের মাধ্যমে মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বৈধতা ফিরে পাওয়া স্বতন্ত্র মেয়র প্রার্থী বশির আহমেদ ঝুনু বলেন, ছোট বেলা থেকেই দেখছি বরিশালবাসি অবহেলিত। একমাত্র শওকত হোসেন হিরন বরিশালের উন্নয়নে কাজ করেছে। এর বাইরে যারা মেয়র ছিলেন তারা কেউ উন্নয়নে কাজ করেনি।

তিনি বলেন, আগে নিজেদের দুর্নীতি মুক্ত হতে হবে। নির্বাচনের আগে ভোটারদের আশ্বাস দিয়ে নির্বাচিত হন। কিন্তু পরে সেই আশ্বাস বাস্তবায়ন না করে মিস্টার টেন পার্সেন্ট উপাধী পান। ভোটারদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বশির আহমেদ ঝুনু বলেন, নির্বাচনে যারা মিস্টার টেন পার্সেন্ট আছেন তাদের ঝেড়ে ফেলুন। আমি বরিশালবাসি উন্নয়নের দিলে আমি তাদের উন্নয়নে কাজ করব।

তিনি বলেন, আমি নির্বাচিত হলে মসজিদের ইমাম ও মন্দিরের পুরোহিতদের জন্য ভাতার ব্যবস্থা করব। কাউন্সিলরদের বসার জন্য নির্দিষ্ট অফিসের ব্যবস্থা করব। এর পাশাপাশি শিশু বান্ধব নগরী গড়ে তুলতে শিশু পার্ক সহ বিভিন্ন উন্নয়নমুলক কর্মকান্ড পরিচালনার আশ্বাস দেন বশির আহমেদ ঝুনু।

মেয়র প্রার্থীদের জনকল্যানমুখি বক্তৃতা শেষে শুরু হয় প্রশ্ন পর্ব। ৬ জন মেয়র প্রার্থীর প্রতিজনকে ২টি করে প্রশ্ন করার সুযোগ পান উপস্থিত সাধারণ নাগরিকরা। তাদের কাছ থেকে প্রশ্ন শুনে তার উত্তর দেন বরিশাল সিটি নির্বাচনের ৬ মেয়র প্রার্থী। প্রশ্ন এবং উত্তর পর্বের মধ্যে দিয়ে শেষ হয় সুজন’র ‘জনগনের মুখোমুখি অনুষ্ঠান।

এদিকে সুষ্ঠু নির্বাচনের পাশাপাশি প্রতিদ্বন্ধি প্রার্থী এবং ভোটাররা তাদের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করবেন বলে আশা আয়োজক সুজনের সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদারের।

এই বিভাগের আরও খবর

আর্কাইভ

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১১২১৩১৪১৫
১৬১৭১৮১৯২০২১২২
২৩২৪২৫২৬২৭২৮২৯
৩০৩১  
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন    
সম্পাদক ও প্রকাশক: কাজী মিরাজ মাহমুদ
 
বার্তা ও বানিজ্যিক কার্যালয়ঃ কুশলা হাউজ, ১৩৮ বীরশ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর সড়ক,
সদর রোড (শহীদ মিনারের বিপরীতে), বরিশাল-৮২০০।
© প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
Developed by NEXTZEN-IT