বর্তমান কাউন্সিলরের ২৩ বছরের আধিপত্য কেড়ে নিতে প্রস্তুত ৬ প্রার্থী | | ajkerparibartan.com বর্তমান কাউন্সিলরের ২৩ বছরের আধিপত্য কেড়ে নিতে প্রস্তুত ৬ প্রার্থী – ajkerparibartan.com
বর্তমান কাউন্সিলরের ২৩ বছরের আধিপত্য কেড়ে নিতে প্রস্তুত ৬ প্রার্থী

6:21 pm , June 5, 2018

রুবেল খান ॥ বরিশাল সিটি কর্পোরেশনের ৮নং ওয়ার্ডে দীর্ঘ ২৩ বছর আধিপত্য ধরে রেখেছেন বর্তমান কাউন্সিলর মো. সেলিম হাওলাদার। ১৯৯৫ থেকে চলতি ২০১৮ সাল পর্যন্ত কখনো পৌর কমিশনার আবার কখনো সিটি কাউন্সিলর হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। হিন্দু অধ্যুষিত এই ওয়ার্ডটিতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে কোন প্রার্থীই তার বিপক্ষে সুবিধা করতে পারেনি। তবুও এবারের আসন্ন সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে বর্তমান কাউন্সিলরের বিরুদ্ধে একাট্টা হয়েছেন প্রায় অর্ধ ডজন সম্ভাব্য প্রার্থী। পূর্বে পরাজিত প্রার্থীদের পাশাপাশি প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন নতুন মুখও। যার কারনে দীর্ঘ ২৩ বছরের আধিপত্য ধরে রাখাটা চ্যালেঞ্জ হয়ে দাড়াচ্ছে সেলিমের কাছে। সরেজমিনে জানাগেছে, বরিশাল সিটি কর্পোরেশনের মধ্যে স্বল্প আয়তনের ৮নং ওয়ার্ড। তেমনি ভোটার সংখ্যাও তুলনামুলক কম। নগরীর অন্যতম বানিজ্যিক এলাকা খ্যাত এই ওয়ার্ডটিতে বর্তমান ভোটার সংখ্যা ছয় হাজার ৭শত’র মত। যার মধ্যে হিন্দু ভোটার ৬০ ভাগ। কোন প্রার্থীর জয়-পরাজয় ওই সংখ্যক ভোটারদের হাতে রয়েছে।

জানাগেছে, ৮নং ওয়ার্ডের বর্তমান কাউন্সিলর মো. সেলিম হাওলাদার ১৯৯৫ সালে তৎকালিন পৌরসভার আমলে প্রথম নির্বাচন করেন। প্রথমবারেই তিনি কমিশনার নির্বাচিত হন। সিটি কর্পোরেশন ঘোষনা’র পরে ২০০৩ সালেও কাউন্সিলর পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে জয় লাভ করেন তিনি। এর পর ২০১৩ সাল পর্যন্ত অনুষ্ঠিত নির্বাচনেও বিজয়ের প্রতীক তার পক্ষেই থেকে যায়। সে অনুযায়ী টানা ২৩ বছর প্রতিনিধিত্ব করে আসছেন সেলিম হাওলাদার।

নির্বাচন কার্যালয় সূত্রে জানাগেছে, ২০১৩ সালে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে ৮নং ওয়ার্ডে সাধারণ কাউন্সিলর পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন ৩ জন প্রার্থী। যার মধ্যে টিউবওয়েল প্রতীক নিয়ে প্রায় এক হাজার ৮শ’র মত ভোট পেয়ে প্রথম হন সেলিম হাওলাদার। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বি পানামা ফারুক পেয়েছিলেন এক হাজার ১৬০ ভোট।

সরেজমিনে ৮নং ওয়ার্ডের ভোটারদের সাথে আলাপকালে জানাগেছে, যে ওয়ার্ডে একজন জনপ্রতিনিধি টানা ২৩ বছর দায়িত্ব পালন করে সেই ওয়ার্ডটি অন্যান্য ওয়ার্ডের থেকে পুরোপুরি ব্যতিক্রম হওয়ার কথা। কিন্তু ৮নং ওয়ার্ডটি’র তেমন কোন পরিবর্তন হয়নি। অন্যান্য ওয়ার্ডের মতই অবহেলিত। বরং বানিজ্যিক এলাকা খ্যাত এই ওয়ার্ডের অধিকাংশ ব্যবসায়ী এলাকা থেকে চলে যেতে বাধ্য হয়েছে।

ভোটাররা বলেন, বর্তমান কাউন্সিলর সেলিম হাওলাদার এর কথার সাথে কাজের মিল খুঁজে পাওয়া যাবে না। জনগন কিংবা ওয়ার্ডবাসীর উন্নয়নের দিকে গুরুত্ব নেই তার। সে মিথ্যাচার করে সর্বদাই ওয়ার্ডবাসীকে ধোকা দিয়ে আসছে। ভোটারদের এমন অভিযোগের প্রমানও মিলেছে। গতকাল মঙ্গলবার নির্বাচনের বিষয়ে আলাপচারিতার জন্য মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হয় কাউন্সিলর সেলিম হাওলাদারের সাথে। এসময় তার অবস্থান জানতে চাওয়া হলে সে সাগরদী এলাকায় আছেন বলে সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদকের কাছে দাবী জানান। এমনকি সন্ধ্যার পরে ইফতার না করে ফিরবেন না বলেও জানান। কিন্তু এর এক মিনিট না যেতেই পরিবর্তনের কাছে ধরা পড়ে যায় সেলিম এর মিথ্যাচার। কেননা কাউন্সিলর কার্যালয়ের একটু সামনে যেতেই সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদক এর সামনা-সামনি হন কাউন্সিলর সেলিম।

নির্বাচনে অংশগ্রহন এবং প্রস্তুতির বিষয়ে আলাপকালে কাউন্সিলর সেলিম হাওলাদার বলেন, আমি দায়িত্ব পালন করে রাস্তা, ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন ও সংস্কার করেছি। মানুষের পাশে থাকার চেষ্টা করেছি। কিন্তু নির্বাচনের প্রতি এখন আর মন নেই। মানুষের উপদ্রপ আর ভালো লাগছে না। তাই ভেবেছিলাম আর নির্বাচন করবো না। কিন্তু নির্বাচন না করলে অন্য কেউ কাউন্সিলর হয়ে যাবে। সে জন্যই আবার নির্বাচনের প্রস্তুতি নিয়েছি।

এদিকে ওয়ার্ডটিতে ঘুরে জানাগেছে, সেলিম হাওলাদার ছাড়াও এবারের নির্বাচনে আরো ৬ জন সম্ভাব্য প্রার্থীর নাম উঠে এসেছে। যার মধ্যে একজন বিএনপি’র এবং অপরজন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী। বাকি ৬ জন আওয়ামী লীগ’র সম্ভাব্য প্রার্থী। যার মধ্যে দু’জন দলের সমর্থনের আশা করলেও বাকি দু’জন দলের সমর্থন না পেলেও শেষ পর্যন্ত নির্বাচনের মাঠে থাকার আশা প্রকাশ করেছেন।

ওয়ার্ডটিতে বিএনপি’র হয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতার প্রস্তুতি নেয়া ব্যক্তি হলেন মো. আল আমিন। তিনি ৮নং ওয়ার্ড বিএনপি’র সভাপতি ও মহানগর বিএনপি’র বিশেষ সম্পাদক পদের দায়িত্বে রয়েছেন। গত ২০১৩ সালের নির্বাচনে প্রথম কাউন্সিলর পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন তিনি। ওই নির্বাচনে তিনি বৈদ্যুতিক পাখা প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে সাড়ে ৮শত’র মত ভোট পেয়ে তৃতীয় অবস্থানে ছিলেন। দ্বিতীয় বারেরমত নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার প্রস্তুতি নিয়েছেন মো. আল আমিন।

এলাকায় খোঁজ নিয়ে জানাগেছে, দলীয় ব্যানারে নির্বাচন করলেও ভদ্র হিসেবে এলাকার মানুষের কাছে সুনাম রয়েছে আল আমিনের। শিক্ষার দিক থেকেও এগিয়ে আছেন তিনি। নির্বাচনের জন্য হলেও এলাকার মানুষের পাশে থাকার চেষ্টা করে আসছেন। এলাকার সকল ধরনের সামাজিক আন্দোলন ও উন্নয়নে তার সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করছেন স্বয়ং অন্যান্য প্রতিদ্বন্দ্বি প্রার্থীরাও।

আলাপকালে মো. আল আমিন বলেন, আমাদের ওয়ার্ডটি দীর্ঘ দিন থেকেই অবহেলিত। ওয়ার্ডটির বিভিন্ন জায়গায় নোংরা পরিবেশ সৃষ্টি হয়ে আছে। বাজার রোডের ঐতিহ্যবাহি পুরান বাজার। কিন্তু এই বাজারটির তেমন উন্নয়ন হয়নি। অপরিকল্পিত উন্নয়নের কারনে এখানকার ব্যবসায়ীরা অন্যান্য বাজারে চলে গেছে। ঐতিহ্য হারাতে বসেছি বাজারটির। আর এজন্য বর্তমান কাউন্সিলরের দায়িত্ব অবহেলা এবং অসহযোগিতার অভিযোগও তোলেন তিনি।

আল আমিন বলেন, নির্বাচন থেকে আমার কোন চাওয়া পাওয়া নেই। জনগনের স্বার্থেই নির্বাচন করছি। আগে থেকেই এলাকার মানুষের পাশে থাকার চেষ্টা করছি। কিন্তু জনপ্রতিনিধি হলে আরো ভালো ভাবে জনগনের সেবা করার সুযোগ পাওয়া যায়। সে জন্যই আমি দ্বিতীয়বার নির্বাচনের প্রস্তুতি নিয়েছি। জনগন আমাকে সুযোগ দিলে আমি তাদের সেবা করব। ওয়ার্ডটি একটি মডেল হিসেবে রূপান্তর করবো।

এদিকে ৮নং ওয়ার্ডে আওয়ামী লীগ থেকে দলীয় সমর্থনের অপেক্ষায় রয়েছেন ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি মরহুম শেখ নূর মোহাম্মদ নূর এর ছেলে আব্দুল্লাহ আল ইউসুফ মনি। যিনি ২০০৮ সালে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিল। মাত্র এক মাসের প্রস্তুতিতে এক হাজারের বেশি ভোট পেয়েছিলেন। তবে এবারের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য গত ৫ বছর ধরেই প্রচার প্রচারনা চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি।

আব্দুল্লাহ আল ইউসুফ মনি বলেন, ইতিপূর্বে ওয়ার্ডের সকল সামাজিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক এবং উন্নয়নমুলক কর্মকান্ডে অংশগ্রহন করেছি। দান-সদগা দিয়েছি। তবে কিছুর বিনিময়ে কিছু পাওয়ার আশা করিনি। তাই নিজের ঢোল নিজে পিটাননি দাবী করে তিনি বলেন, জনপ্রতিনিধি হয়ে জনগনের সেবা করার অনেক সুযোগ থাকে। তাই জনগনের স্বার্থেই কাউন্সিলর পদে নির্বাচন করতে চাই। তবে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগের মৌন সমর্থনের আশা করছি। আমার বিশ্বাস দল আমাকে সুযোগ দিবে এবং আমিই প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবো। স্থানীয় একটি সূত্র জানিয়েছে, মনির বাবা শেখ নূর মোহাম্মদ নূর ৮নং ওয়ার্ডের আওয়ামী লীগের সভাপতি ছিলেন। এলাকায় একজন সজ্জন ব্যক্তি হিসেবে তার পরিচিতি ছিল। সেই হিসেবে মনির অবস্থান গতবারের চেয়ে এবার একটু ভালো।

একই ওয়ার্ডে কাউন্সিলর পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতার প্রস্তুতি নিয়েছেন ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সুরঞ্জিৎ দত্ত লিটু। বাংলাদেশ হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ বরিশাল মহানগর কমিটি, পুজা উদযাপন কমিটির মহানগরের সাধারণ সম্পাদক ও বঙ্গবন্ধু শিশু কিশোর মেলা বরিশাল জেলার সভাপতি সুরঞ্জিৎ দত্ত লিটু বলেন, এবারের নির্বাচনে দলের হয়ে ওয়ার্ডে প্রতিদ্বন্দ্বিতার ইচ্ছা রয়েছে। তবে সেটা নির্ভর করবে দলের সমর্থনের উপর। দল সমর্থন দিলে আমি নির্বাচন করবে। আর না দিলে নয়।

এদিকে দলীয় সূত্র বলছে, সুরঞ্জিৎ দত্ত লিটু’র দলীয় সমর্থনে বাধ্য হচ্ছে সম্প্রতি মহানগর আওয়ামী লীগের নেয়া এক সিদ্ধান্ত। ওই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক নির্বাচন করতে পারবে না। নির্বাচন করতে হলে তাকে পদত্যাগ করে নিতে হবে। তাই সুরঞ্জিৎ দত্ত লিটু’র দলীয় সমর্থন পাওয়ার বিষয়টি অনেকটাই অনিশ্চিত হয়ে দাড়িয়েছে।

এছাড়া ওয়ার্ডটিতে প্রতিদ্বন্দ্বিতার প্রস্তুতি নিয়েছেন ওয়ার্ড শ্রমিক লীগের সভাপতি মো. বশির আহমেদ। যিনি আওয়ামী লীগের নিবেদিত প্রান। ১৯৯০ সালের গন আন্দোলনে তার ভুমিকা রয়েছে। ওই সময় তিনি তৎকালীন ৩নং হাটখোলা ইউনিয়ন ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। বিগত জোট সরকারের আমলে বহু হামলা-মামলা এবং বহুবার জেলে যেতে হয়েছে তাকে।

বাজার রোডের ব্যবসায়ী মো. বশির আহমেদ বলেন, দলের জন্য আমি অনেক ত্যাগ স্বীকার করেছি। বিনিময়ে কিছুই পাইনি। বিগত ২০১৩ সালের নির্বাচনে আমি প্রার্থী হতে চেয়েছিলাম। দল থেকে পরবর্তীতে নির্বাচনের সুযোগ দেয়ার কথা বলে আমাকে নির্বাচন থেকে সরিয়ে দেয়া হয়েছিলো। সে অনুযায়ী আমি এবারের নির্বাচনে দলের সমর্থনের দাবীদার। দল সমর্থন দিলে আমি নির্বাচন করবো। আর না দিলে বিষয়টি ভেবে দেখতে হবে। তবে আমার বিশ্বাস সার্বিক দিক বিবেচনা করে দল আমাকে সমর্থন জানাবে।

এর বাইরেই বাজার রোডের মুরগী ব্যবসায়ী মো. মনির হোসেন এর নাম শোনা যাচ্ছে ৮নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর প্রার্থী হিসেবে। ইতিপূর্বে তিনি আরো একবার নির্বাচন করেছেন বলে শোনা জানা গেছে। তবে তার প্রার্থী হওয়ার বিষয়টি এখন পর্যন্ত চূড়ান্ত হয়নি বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

অপরদিকে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের হয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন মাওলানা মো. আব্দুস সামাদ। তিনি ইসলামী আন্দোলন ৮সং ওয়ার্ড শাখার সভাপতি। বিগত দিনে তার নির্বাচনের অভিজ্ঞতা না থাকলে দলের সিদ্ধান্তের কারনেই তিনি কাউন্সিলর পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

এই বিভাগের আরও খবর

আর্কাইভ

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০
১১১২১৩১৪১৫১৬১৭
১৮১৯২০২১২২২৩২৪
২৫২৬২৭২৮২৯৩০  
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন    
সম্পাদক ও প্রকাশক: কাজী মিরাজ মাহমুদ
 
বার্তা ও বানিজ্যিক কার্যালয়ঃ কুশলা হাউজ, ১৩৮ বীরশ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর সড়ক,
সদর রোড (শহীদ মিনারের বিপরীতে), বরিশাল-৮২০০।
© প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
: SYSTEM DEVELOPMENT :
SPIDYSOFT IT GROUP